প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। দেশের অর্থনীতি যখন নানা চাপে বিপর্যস্ত, তখন রেমিট্যান্সের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ নিয়ে এসেছে এক স্বস্তির বার্তা। আর এ কৃতিত্বের হিরো প্রবাসীরাই। অর্থাৎ দেশের ডলার সংকট সমাধানে প্রবাসী বাংলাদেশীরা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীরা চলতি অর্থবছরে প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ১০১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ লাখ ২৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে), যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথম চার মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৯৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী অক্টোবরে রেমিট্যান্স এসেছে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলার বেশি। হুন্ডি প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, প্রণোদনা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নতির কারণেই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের এ উচ্চধারা অব্যাহত রয়েছে। প্রবাসী আয়ের এ ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোয় সহায়তা করাসহ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তনের পর সরকার যেসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা প্রবাসীদের অবৈধ পন্থা পরিহার করে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বড় পরিসরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েই চলেছে, যা সাম্প্রতিক তথ্যেই প্রতিফলিত হচ্ছে।
গত ১১ মাসে রিজার্ভ বেড়েছে ১১ বিলিয়নেরও বেশি। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য হলো রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা ও রেমিট্যান্সে উন্নতি। ২০২৫-এর অক্টোবর শেষে রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগের চেয়ে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার বেশি। রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ৬-৮ শতাংশ, যা ডলারের চাহিদা কমিয়ে বাজারে স্বস্তি দিয়েছে। এ দুটি অর্জন অর্থনীতির জন্য ‘অক্সিজেন সিলিন্ডার’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
অথচ মাত্র এক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রিজার্ভ নেমে গিয়েছিল ২০ বিলিয়নের নিচে। তখন বাজারে ছড়িয়ে পড়েছিল চরম অনিশ্চয়তা। ডলার–সংকট, আমদানি জট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় দেশের অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। মূল্যস্ফীতি দুই ডিজিটে ঘোরাঘুরি করছিল। পণ্য আমদানি বন্ধের মুখে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন স্থগিত করেছিল। বিদেশী ঋণ পরিশোধ ও খাদ্যশস্য আমদানির জন্যও সরকারকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকার কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ঘুরে দাঁড়ায়। অর্থাৎ নতুন সরকার ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি প্রবাসীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সফল হয়, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রতিদিন ১ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে এখন অন্যতম।
সাধারণত দেখা যায় রোজার মাস ও ঈদ উৎসবকে সামনে রেখে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য বেশি পরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে থাকেন, যাতে দেশে তাদের প্রিয়জনেরা উৎসব আনন্দে অংশ নিতে পারেন। এ উৎসবকালীন প্রেরণায় প্রবাসী আয় অনেক সময় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর রোজা শুরু হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময়ে রোজা ও ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স প্রেরণের এক নতুন ইতিহাস গড়বেন।
দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ভালো থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে আবার ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে।
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আজকের বিশ্বে উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য এক চালিকাশক্তি। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় যখন আর্থিক সংকট নেমে আসে, তখন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স হয়ে ওঠে অর্থনীতির জন্য অক্সিজেন। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করে প্রবাসী আয়ের ওপর। বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত, যারা প্রতি বছর গড়ে ২৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে প্রবাসীদের এ বিপুল পরিমাণ কষ্টার্জিত অর্থ? এ ব্যাপারে মানুষের একটা সাধারণ ধারণা রয়েছে যে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের অর্থ ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে। আসলে এর সবটাই কি ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে? কিছুই কি সঞ্চয় হিসেবে থাকছে না? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এর কিছু তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে যে প্রবাসী রেমিট্যান্স আয় বাবদ খাদ্য ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে যে বিনিয়োগ হয় তার বেশির ভাগই যায় অনুৎপাদনশীল খাতে। অর্থাৎ মোট রেমিট্যান্সের মধ্যে ৭৪ দশমিক ৬৮ শতাংশই কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয় না। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কাপড়চোপড়, তেল-সাবান, বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্য থেকে শুরু করে নানা বিলাসী পণ্য যেমন ফ্রিজ, টেলিভিশন, খাট, সোফাসেটসহ নানা সামগ্রী ক্রয়ে। বাকি ২৫ দশমিক ৩২ শতাংশ অর্থ পরোক্ষভাবে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ হয়। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ অর্থ জমিজমা, ফ্ল্যাট কেনায় ও বাড়িঘর নির্মাণে ব্যয় হয়।
গত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় রোজা ও ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। যদিও ঈদের পরের মাসে তা আবার কমে আসে। ঈদের সময় যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে তার বেশির ভাগ অর্থাৎ ৯০ শতাংশই ব্যয় করা হয় ভোগবিলাসে। বছরের অন্য সময় অবশ্য বিলাসিতায় এতটা খরচ হয় না। এক জরিপে আরো উঠে এসেছে যে প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পরিবার প্রাপ্ত অর্থ থেকে কমবেশি সঞ্চয় করে থাকে। এ ধরনের পরিবারের গড় হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। তবে বিভাগওয়ারি এ হার ভিন্ন ভিন্ন। যেমন প্রবাসী আয় থেকে সঞ্চয় করে এমন পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে কম সিলেটে। বরিশালে এ হার সবচেয়ে বেশি। আবার যারা ঋণ নিয়ে প্রবাসে গেছেন ওই পরিবারগুলোয় সঞ্চয়ের সুযোগ তুলনামূলক কম।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। কিন্তু তাদের ঘাম ঝরানো এ আয়ের বড় অংশই ভোগবিলাসে ব্যয় হচ্ছে। আর বিনিয়োগ বলতে যা বোঝায় তা হলো জমিজমা কেনা ও ঘরবাড়ি নির্মাণ। অর্থাৎ প্রবাসী আয়ে এমন কোনো বিনিয়োগ হয় না, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়। প্রবাসীদের এ রেমিট্যান্স আয় যদি পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যেত তাহলে আমাদের অর্থনীতি আরো দ্রুত এগিয়ে যেত। কাজেই আহরিত রেমিট্যান্স বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী পরিবারগুলো তাদের বেসিক চাহিদা মেটানোর পর হাতে যে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে তা যাতে তারা নিরাপদে ও সহজে বিনিয়োগ করতে পারে সে লক্ষ্যে আরো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।
বিগত সরকারের সময় রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ছিল অনেকটাই অবহেলিত। প্রবাসীদের মর্যাদা তো দূরের কথা বিমানবন্দরে তাদের নানা রকম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হতো। তাদের শ্রম-ঘামের অর্থে কেনা জিনিসপত্র বিমানবন্দর থেকে প্রায়ই চুরি হয়ে যেত। এছাড়া কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে তাদের লাশ দেশে আনতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। অথচ এ রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই বছরের পর বছর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন।
রেমিট্যান্স যোদ্ধারা মনে করেন রেমিট্যান্স খাতকে আরো সংস্কার করা দরকার। আর এজন্য রেমিট্যান্স খাতকে ঘিরে তাদের যত দাবি ও প্রস্তাব। তাদের অন্যতম দাবিগুলো হলো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন, ব্যাংক খাতের জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, বিমানবন্দরে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ভিআইপি মর্যাদা দেয়া, প্রবাসী কর্মীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, বিমান ভাড়া ও পাসপোর্ট ব্যয় হ্রাস করা, রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস পালন করা, প্রবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, কোনো রেমিট্যান্স যোদ্ধা বিদেশে মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশে ফিরিয়ে আনা ইত্যাদি। সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়ানো এবং রেমিট্যান্সকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের দাবিগুলো পূরণ করা আজ আর শুধু প্রয়োজন নয়, নৈতিক দায়িত্বও। দেশের উন্নয়নের এ মেরুদণ্ডকে যথাযথ সম্মান ও সহায়তা দিতে হবে। তাদের পাশে থেকে অর্থনীতির এ অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে হবে। দেশপ্রেমিক এ যোদ্ধাদের আর কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদানকে স্বীকৃতি ও তাদের প্রাপ্য সম্মান দেয়াটা এখন সময়ের দাবি মাত্র।
ড. ইউসুফ খান: সাবেক ব্যাংকার ও রেমিট্যান্স বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান, ব্যুরো বাংলাদেশ










