উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিদ্যুৎ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে। আর ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ বিল সরবরাহের কারণে গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুত ও সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশের বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। কোম্পানিগুলোকে নির্ভুল বিদ্যুৎ বিল তৈরি নিশ্চিত করতে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এতে গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা যায়। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডে (ডেসকো)। বিতরণ কোম্পানি দুটির ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটিপূর্ণ বিলের অভিযোগ তুলেছেন গ্রাহকরা। গ্রাহকের অভিযোগ, ব্যবহারের তুলনায় অতিরিক্ত বিল আসছে তাদের। বিশেষ করে শীতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমলেও বিল এসেছে গ্রীষ্মের মতোই। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও বিল অনেক কম আসার নজিরও পাওয়া যাচ্ছে। 

এদিকে ত্রুটিপূর্ণ বিলের বিষয়ে আঞ্চলিক অফিসেও সুনির্দিষ্ট সুরাহা পান না গ্রাহকরা। এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে তাদের বাড়ছে ভোগান্তি। আবার কেউ কেউ ভোগান্তি এড়াতে বাড়তি কিংবা ভুল বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তারা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গ্রাহকের যথাযথ সেবা নিশ্চিতে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আরো পেশাদার ও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। পাশাপাশি জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর বিদ্যুৎসেবা খাতে দক্ষ জনবল বাড়ানো দরকার। 

আমাদের দেশে একটা সময়ে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল না। এখন সক্ষমতা রয়েছে কিন্তু জ্বালানির অভাবে উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কারণ নিজস্ব জ্বালানি গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে গুরুত্ব কম দেয়া হয়েছে। এর আগে গ্যাস ও কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ ছিল। আর এখন যন্ত্রপাতি থাকলেও গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ কম। ফলে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত গড়ে তোলা হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই টেকসই ও নিরাপদ জ্বালানি খাত গড়ে তুলতে আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। আর দেশীয় গ্যাস ও কয়লা উত্তোলন বাড়াতে হলে সরকারকে যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর দেশের জ্বালানি খাত নিরাপদ হলে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়বে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। জ্বালানি খাতে আমাদের আমদানিনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হলে দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। 

বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল, কয়লা ও সোলার এনার্জির ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুতের ৪৬ শতাংশ উৎপাদন হয় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, ২৬ শতাংশ উৎপাদন হয় ফার্নেস অয়েল থেকে, কয়লা হতে উৎপাদন হয় ১১ শতাংশ এবং বাকি অংশ উৎপাদন হয় অন্যান্য উৎস থেকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য জ্বালানি হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। একসময় বাংলাদেশের বিদ্যুতের ৮০ শতাংশ উৎপাদন হতো প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, বর্তমানে তা ৪৬ শতাংশে নেমেছে। এর অন্যতম কারণ দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়ানো এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য দুই-চার গুণ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট তৈরি হয়েছে। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন সে তুলনায় বাড়েনি। 

এদিকে আমাদের অন্যান্য খাতের মতো বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুতই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদের দরকার। স্থানীয় দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে জ্বালানি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও সামগ্রিক কার্যক্রমে বিদেশীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ সংকট নিরসনে সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। তা না হলে আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে নানামুখী জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। 

বিশ্বজুড়ে অন্যান্য খাতের মতো জ্বালানি খাতেও ডিজিটাল রূপান্তরের ছোঁয়া লেগেছে। আমাদের দেশেও জ্বালানি ও শক্তি খাতে প্রযুক্তির অসীম সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারি। গ্রাহকের হয়রানি লাঘবে বিদ্যুৎ খাতে দক্ষ জনবল ও আধুনিকায়ন জরুরি।