দেশের বেসরকারির তুলনায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণে অনাগ্রহী। এর মূল কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, প্রশাসনিক ধীরগতি ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব। অ্যাক্রেডিটেশন পেতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোর্স আউটকাম, গবেষণার মান, দক্ষ শিক্ষক, অবকাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশের অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের শর্ত পূরণ করা সম্ভব নয়। কেননা গত ১৫ বছরে মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত না করেই দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দলীয়ভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অদক্ষ শিক্ষক। সরকারি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের ঘাটতি, ল্যাবরেটরি ও শ্রেণীকক্ষের সংকট, পর্যাপ্ত অর্থের অভাব ও মানসম্মত গবেষণা পরিবেশের ঘাটতি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
আবার কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দীর্ঘমেয়াদি সুনাম ও জাতীয় মর্যাদার ওপর নির্ভর করে অ্যাক্রেডিটেশনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে না। জাতীয় পর্যায়ে তাদের অতীত সুনাম ও মর্যাদা থাকায় অ্যাক্রেডিটেশনে অনীহা রয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতীয় ঐতিহ্য নয়, বরং মানদণ্ডই শিক্ষার স্বীকৃতির মূল উপাদান। তাছাড়া অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এ উদ্যোগে অনিচ্ছুক। সবচেয়ে বড় কথা, দেশে উচ্চশিক্ষায় এখনো অ্যাক্রেডিটেশন বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এটিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। এসব কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো এ গুরুত্বপূর্ণ মান নিশ্চয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিশ্চিতে অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় উচ্চশিক্ষার মান ও সক্ষমতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে অ্যাক্রেডিটেশন সনদ গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে গঠন হয় বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি)। এর উদ্দেশ্য, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রম, গবেষণা, শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে মূল্যায়ন করে স্বীকৃতি প্রদান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট আস্থাভাজন অ্যাক্রেডিটেশন সংস্থা এবং কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ স্বীকৃতির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করারও কথা এ কাউন্সিলের। তবে বিএসি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিন পরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।
অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা অনুযায়ী কোনো প্রোগ্রামের অ্যাক্রেডিটেশন প্রাপ্তির আবেদনের জন্য সে প্রোগ্রাম থেকে অন্তত একটি ব্যাচের স্নাতক শেষ হওয়ার পর দুই বছর পার হতে হবে। সময়সীমা বিবেচনায় দেশের সরকারি-বেসরকারি ১২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য প্রোগ্রাম রয়েছে। গত পাঁচ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত অ্যাক্রেডিটেশনের চূড়ান্ত আবেদন করেছে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়। অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে ৪৪টি, যার বেশির ভাগই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদনকারী পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবই বেসরকারি। মোট ১৪টি প্রোগ্রামের জন্য অ্যাক্রেডিটেশনের আবেদন করেছে তারা। অ্যাক্রেডিটেশন গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশকারী ৪৪টির মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ১১টি।
উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে অ্যাক্রেডিটেশন একটি পূর্ণাঙ্গ মান নিশ্চয়ন প্রক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসন ব্যবস্থা, একাডেমিক নীতি, কারিকুলাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণার পরিধি, অবকাঠামো, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া—সবকিছুই এখানে মূল্যায়িত হয়। কিন্তু বাস্তবে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই এসব মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ। বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রশাসনিক ধীরগতি, গবেষণা তহবিলের অভাব, মাননির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতির ঘাটতি, দক্ষ শিক্ষক ও মানবসম্পদের অভাব এ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। অ্যাক্রেডিটেশন পেতে হলে প্রতিটি বিভাগকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে পুনর্গঠিত করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে অনেক বিভাগ এ উদ্যোগে আগ্রহ দেখায় না। অ্যাক্রেডিটেশন হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি।
অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন ও উদ্যোগী। তাদের আয়ের মূল উৎস শিক্ষার্থী, ফলে তারা শিক্ষার মান উন্নয়নে আগ্রহী। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাক্রেডিটেশন থাকলে শিক্ষার্থী আকৃষ্ট হয়। তবে নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অধিকাংশ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক নেই, ল্যাবরেটরি ও শ্রেণীকক্ষের ঘাটতি রয়েছে ও দক্ষ মানবসম্পদ কর্মীও পাওয়া যায় না। বিগত সরকারের আমলে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অবকাঠামো ও মানবসম্পদ সংকটে ভুগছে।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বিকাশের সঙ্গে অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে। এক সময়ে দেশজুড়ে শিক্ষার মান নির্ধারণের কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তু এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যকার পার্থক্য নিয়ে কোনো ঐকমত্য ছিল না। সেই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে মানদণ্ডের অস্পষ্টতা দেখা দেয়। ফলে শিক্ষার মান যাচাই ও অভিন্নতা বজায় রাখা ক্রমে জটিল হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান একত্রিত হয়ে গঠন করে বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন। এসব সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হাই স্কুল ও কলেজ শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা এবং সদস্যপদ পাওয়ার শর্ত হিসেবে ‘পিয়ার রিভিউ’র একটি কাঠামো তৈরি করা। পরবর্তী কালে বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠন গড়ে ওঠে, যেখানে সদস্যপদ নির্ভর করত অ্যাক্রেডিটেশনের ওপর। এসব আঞ্চলিক সংগঠন তাদের নিজস্ব অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড বা কমিশন তৈরি করে, যারা সদস্যপদ প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নির্ধারণ করত ও প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা যাচাই করত। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগ অ্যাক্রেডিটেশনের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তাদের প্রোগ্রামগুলোর মান যাচাই করা হয়। শিক্ষা বিভাগের মতে, অ্যাক্রেডিটেশনের প্রধান তিনটি ভূমিকা বা কার্যাবলি হলো—এক. উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক প্রোগ্রামগুলোর গুণগত মান যাচাই ও মূল্যায়ন করা; দুই. কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ধারাবাহিক উন্নয়নের সংস্কৃতি তৈরি করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মান উন্নয়নে উৎসাহ দেয়া; তিন. শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পূর্ণভাবে প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা। অর্থাৎ অ্যাক্রেডিটেশন শুধু শিক্ষার মান যাচাইয়ের উপায় নয়, বরং এটি একটি অব্যাহত উন্নয়ন প্রক্রিয়া, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানোন্নয়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে। সত্তর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব ডিগ্রি প্রদানকারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে অ্যাক্রেডিটেড ছিল অথবা অ্যাক্রেডিটেশন প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় ছিল। ফলে অ্যাক্রেডিটেশন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় মান নিশ্চয়নের অন্যতম প্রধান উপাদানে পরিণত হয়।
অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় টেকসই গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারে। এটি শুধু উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি, গবেষণা উন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ডিগ্রিকে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে সরকারের উদ্যোগ কাম্য।










