সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গত রোববার যে অসাধারণ রায় দিয়েছেন তাতে যে শুধু কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের জয় নিশ্চিত হয়েছে তা-ই নয়, এতে প্রকৃতপক্ষে সমগ্র জাতি আবারো বিজয়ী হলো। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের একটি পরিপক্ব মতামত এই ছিল সবসময় যে বিষয়টি আসলে সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃত্বের মধ্যে আছে। সে হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের রায়েও কিন্তু তার প্রতিফলন হয়েছে। সেখানে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ হবে। বাকিদের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা সন্তান (শুধু সন্তান), ১ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং ১ শতাংশ তৃতীয় লিঙ্গ ও বিশেষভাবে সক্ষমদের দেয়া হবে। এ বিষয়গুলো সদাশয় সরকার সঠিকভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইনমন্ত্রী পরিষ্কার বলেছেন, উচ্চ আদালতের রায় সরকার গ্রহণ করেছে এবং দুদিনের ছুটি শেষ হলে মঙ্গলবার এটা গেজেট হবে বলে আমরা আশা করছি। আন্দোলনকারীরাও সঠিকভাবে বুঝেছে যে সরকারি গেজেট না হওয়া পর্যন্ত এটা কিন্তু পাকাপোক্ত হয়নি। গেজেট হয়ে এর বাস্তবায়ন শুরু হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আমরা আশা করছি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের এটাই মূল দাবি ছিল এবং এ দাবি মিটে গেলে যাতে লেখাপড়া আবার সুষ্ঠুভাবে শুরু করা যায় সেদিকে তাদের মনোযোগ দিতে হবে। ক্লাসরুমে ফিরে যেতে হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে আমি বলতে চাই, এ কোমলমতি আমাদের স্নেহশীল ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য আন্দোলন করার আগেই যদি এ কোটার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এ রকম খারাপ পর্যায়ে যেত না। অবশ্যই ছাত্রদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কিছু দেশবিরোধী চক্রান্তকারী যেভাবে জানমালের ক্ষতি করেছে, যেভাবে মানুষকে হত্যা করেছে তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। এতে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কোনো অবকাশ নেই, সরকারকে একদম পক্ষপাতহীনভাবে তদন্ত করতে হবে। যারা মেট্রোরেল, বিটিভি, সেতু ভবন, সাবমেরিন কেবল এবং অন্যান্য সরকারি স্থাপনা ও যানবাহন ধ্বংস করে দেশকে যারা সম্পূর্ণ অচল করে দিতে চাইল, তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিহ্নিত করে কঠোরতম শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থার সুপারিশ করছি। এখানে গোয়েন্দা ব্যর্থতারও সুরাহা হওয়া দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাসহ ছাত্ররা অন্য যে দাবিগুলো করেছে, আশা করছি সরকার সেদিকে দৃষ্টি দেবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ছাত্রদের দাবি অনুযায়ী পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এটা যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই ভালো। পরিস্থিতি অনুধাবন করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কারফিউ ও অন্যান্য যে সীমাবদ্ধতা আছে সেগুলো উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে।
আমাদের ইন্টারনেট ব্যবস্থা অচল করে দেয়ার সিদ্ধান্তকে আমি হীনম্মন্য সিদ্ধান্ত মনে করি। এতে শুধু যে দেশের গ্রাহক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, বিদেশেও কিন্তু নানা অপ্রচারের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। আমি জানি, হয়তো সংশ্লিষ্টরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আমার সুপারিশ থাকবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দুয়েকদিনের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ আনা হোক। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়া হোক।
বলা বাহুল্য, এ আন্দোলনের মাঝে ঢুকে পড়ে কিছু দুষ্কৃতকারী, দেশ ধ্বংসকারী ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধবাদী লোকজন এরই মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে অনেক ক্ষতি করেছে। তারা যাতে আরো ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য অর্থনৈতিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সদাশয় সরকার স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড যত শিগগির সম্ভব শুরু করবে।
আমরা দেখেছি, এ ব্যাপারে কিছু কিছু উদ্যোগ, সভাসমিতি এরই মধ্যে করা হয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক এ বিরূপ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিকতায় ফিরতে হবে। অর্থনীতি চালাতে যেসব অসংগতি, অবিচার, অন্যায় হয়েছে তার সুরাহা করবে। ‘বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আগামীর করণীয়’ পুস্তকে যেসব সুপারিশ করেছি, সেগুলো আশা করি সদাশয় সরকার আবারো বিবেচনায় নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংশোধন করে অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করার উদ্যোগ নেবে।
ব্যাংক খাতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। অবশ্যই শুধরানোর জন্য দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যায়ভাবে খেলাপিদের যেসব সুবিধা দেয়া হয়েছে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। বিশেষজ্ঞ মত আমলে নিয়ে আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ শাসনকালে যে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল সেগুলোয় যেতে হবে। ব্যাংক খাত সংস্কারে শেখ হাসিনার সরকারই অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। খেলাপি ঋণ, ব্যাংক পরিচালক পদে এক পরিবারের কতজন সদস্য থাকতে পারবে সে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বিদ্যমান পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ও বস্তুনিষ্ঠভাবে বিবেচনা করে আবার সংশোধনের দিকে যেতে হবে।
পরিশেষে আমি বলব, যতদিন পর্যন্ত মুদ্রা পাচার, খেলাপি ঋণ ও কর খেলাপ বন্ধ না করা যায় ততদিন পর্যন্ত কিন্তু অর্থনীতিতে মন্দাবস্থা চলবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই যত শিগগির সম্ভব পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে আমি বলব, সদাশয় আদালত খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ কোটা নিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী ও কিছু মহল নারী কোটার ব্যাপারে এবং আরো দুয়েকটি কোটার ব্যাপারে কিছু আপত্তি করেছেন। এখন কিন্তু আপত্তির সময় নয়, এখন এ রায়কে অবিলম্বে কার্যকর করার সময়। রায়ের মধ্যেই বলা হয়েছে যে, সরকার ইচ্ছা করলে পরবর্তী সময়ে পরিবর্ধন, পরিবর্তন করতে পারবে। সংবিধানের ২৯ ধারায় যেভাবে সরকারকেই এসব ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার অধীনে সরকার পরবর্তী সময়ে ইচ্ছা করলে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নারী কোটা এবং অন্যান্য বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই পারবেন।
সবাইকে আমি অনুরোধ করছি, আমরা আপত্তি না করে সদাশয় আদালত যে রায়টি দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করি। বাংলাদেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে যে কয়েকটি যুগান্তকারী রায় হয়েছে রোববারের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের এ রায় তার অন্যতম। আমরা আশা করি, এ রায় অবিলম্বে কার্যকর হবে, বাস্তবায়ন হবে।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য (১৯৯৫-৯৮) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর (১৯৯৮-২০০১)










