একটি দেশের আর্থসামাজিক দুরবস্থার দরুন শিশুশ্রমের আধিক্য দেখা যায়। বাংলাদেশেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বর্তমানে শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু নিয়োজিত রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। এ তথ্য সম্প্রতি তুলে ধরেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০২২’। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ৭ অনুযায়ী দেশে ২০২৫ সালের মধ্যে সব সেক্টর থেকে শিশুশ্রম নিরসনের পরিকল্পনা নেয় সরকার। ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সব শিশুকে সরিয়ে আনার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বিবিএসের বর্তমান জরিপের তথ্য বলছে, লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে আছে দেশ। এ অবস্থায় সব ধরনের শ্রম থেকে শিশুদের প্রত্যাহারের জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। নয়তো এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এরই মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। শ্রমজীবী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে প্রত্যাহারের লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত হয় ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০।’ পাশাপশি বিভিন্ন মেয়াদে ‘ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্পও গৃহীত হয়। এছাড়া ২০১৫ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’। শিশু শ্রমিকের একটি বড় অংশ গৃহকর্মীর কাজে নিয়োজিত থাকে এবং নির্যাতিত হয় সবচেয়ে বেশি। তবে বাস্তবতা বলছে এসব আইন বা প্রকল্পের খুব বেশি কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না। দারিদ্র্য, পিতা-মাতার স্বল্প শিক্ষা, অসচেতনতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ৩৪-৪৪ ধারায় কিশোর ও শিশু নিয়োগসংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে যেকোনো শিশুর নিয়োগ রহিত করা হয়েছে। অথচ আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতেই শ্রমজীবী শিশুর উপস্থিতি লক্ষণীয়। এর কারণ মূলত সস্তা শ্রম। এমনকি অনেক সময় বিনা মজুরিতেও শিশুদের কাজ করানো হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ গৃহকর্মী শিশুরা। বিবিএসের সাম্প্রতিক জরিপমতে, দেশে ২০ লাখ ১০ হাজার শিশু গৃহকর্মী রয়েছে, যাদের পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। সুতরাং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি, ২০১০-এর প্রধান লক্ষ্যই হলো ঝুঁকিপূর্ণ ও নিকৃষ্ট ধরনের শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রত্যাহার করে তাদের জীবনের অর্থপূর্ণ পরিবর্তন সাধন।
শিশুশ্রম একটি দেশের উন্নয়নকে পশ্চাৎমুখী করে। ফলে শিশুর কর্মদক্ষতা অল্প বয়সে হারিয়ে যায় এবং যখন প্রকৃত অর্থে কাজ করার কথা, তখন শারীরিক ও মানসিকভাবে অদক্ষ শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়। দারিদ্র্যের কারণেই অধিকাংশ শিশুকে কাজ করতে হয়। জীবিকার সন্ধানে নেমে শিশুরা তার পরিবার থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক সময় কাজের নামে শিশুদের গ্রাম থেকে শহরে আনা হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিদেশে পাচার করা হয়। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, টাকা আয় করতে গিয়ে তারা পড়াশোনার সুযোগ পায় না। হোটেল-রেস্তোরাঁয়, ফ্যাক্টরি, বাসাবাড়ি, কৃষি, পরিবহন ইত্যাদি কর্মক্ষত্রে নিয়োজিত হয়। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ৪৫ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে। এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ থাকে। দেখা যায়, অনেক পরিবার উপায়ান্তর না পেয়ে শিশুকে কাজে নিয়োজিত করে। সেসব পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস শিশু। সেক্ষেত্রে হুট করে তাদের কর্মচ্যুত করা তার ও তার পরিবারের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই শিশুশ্রম নিরসনে পিতা-মাতার জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বা কর্মে শিশুরা সাধারণত ছয়ভাবে নিয়োজিত থাকে—প্রশিক্ষণার্থী, বদলি, নৈমিত্তিক, শিক্ষানবিস, সাময়িক ও স্থায়ী কর্মী। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবিক অর্থে অল্প মজুরি দিয়ে অধিক কর্মঘণ্টায় নিয়োজিত রাখা যায় বলে শিশুদের শ্রমে নিয়োগ দেয় মালিক কর্তৃপক্ষ। শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি-সংক্রান্ত যেসব উদ্যোগ এরই মধ্যে সরকার কর্তৃক গ্রহণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশব যাপন সব শিশুর মৌলিক অধিকার। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা জীবিকা অর্জনের তাগিদে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বা নিকৃষ্ট ধরনের শ্রমে নিয়োজিত হয়। এতে তারা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কোলে ঢলে পড়ে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক, সরকারি-বেসরকারি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবার সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। পথশিশুদের ওপর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। প্রায় সময় তাদের অপরিচ্ছন্ন, রোগজীবাণুর বাহক, অপরাধী জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পথশিশুদের সার্বিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের পুনর্বাসনের আগে তাদেরকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কাজ করা জরুরি। নয়তো তাদের নিয়ম-শৃঙ্খলায় আনা মুশকিল হয়ে পড়বে এবং দেশ থেকে শ্রমজীবী শিশু নিরসন সম্ভব হবে না। শিশুশ্রম বিলোপে উদ্যোগগুলোকে প্রকল্পভিত্তিক না করে স্থায়ীকরণ করা যায় কিনা সে বিষয়ে ভেবে দেখতে হবে। শিশুশ্রম যতদিন না একেবারে বিলোপ করা যায়, অন্তত কর্মপরিবেশ শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য তথা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং অমর্যাদাকর যেন না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নজর দিতে হবে।










