শিক্ষার প্রধান উপাদান শিক্ষক। একটি জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার গুরুভার অর্পিত হয় শিক্ষকের হাতে। এজন্য যেমন দরকার মানসম্মত শিক্ষক, তেমনি প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষকের। কিন্তু দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক সংকট রয়েছে, বিশেষত সরকারি কলেজগুলোয়। সময়ের পরিক্রমায় এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতত্ত্ব ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি কলেজগুলোয় প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী আছে ৯৭ জন, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে দেশে সরকারি কলেজগুলোয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ছিল ১:৭৯। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত সবচেয়ে বেশি স্নাতক-উত্তর পর্যায়ের কলেজগুলোয়। এসব কলেজে এখন প্রতি ১১৭ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন একজন। এছাড়া স্নাতক পর্যায়ে ৭৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন, ডিগ্রি (পাস) কলেজগুলোয় ৫৫ ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় ৪১ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতি বছর সরকারি কলেজগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তার বিপরীতে আনুপাতিক হারে বাড়ছে না শিক্ষকের সংখ্যা। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান এবং নিশ্চিত করা যাচ্ছে না মানসম্মত শিক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ না দেয়া, চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না করা, অন্য পেশার তুলনায় শিক্ষকতা পেশায় অপ্রতুল সুযোগ, সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ধীর পদোন্নতিসহ নানা কারণে কলেজগুলোয় এ সংকট দেখা দিয়েছে। শিক্ষা খাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে হলে এসব সমস্যা অনতিবিলম্বে দূর করা প্রয়োজন।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১:৩০। এখন পর্যন্ত এটি বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের প্রায় সব সরকারি কলেজেই শিক্ষক সংকট এখন চরমে। বিশেষ করে ইংরেজি, বাংলা, আইসিটি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে রয়েছে শিক্ষকস্বল্পতা। আইসিটিতে প্রভাষক ছাড়া সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদ নেই। ফাইন্যান্স, মার্কেটিং ইত্যাদি বিষয়ে পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে অনেক বিষয়ের পাঠদান করেন অন্য বিভাগের শিক্ষক। অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে চলছে সরকারি কলেজগুলো।
বিভাগ ও জেলা সদরের ৭১টি প্রধান কলেজের (বেশির ভাগই মাস্টার্স কলেজ) শূন্যপদ ও পদ সৃজন নিয়ে করা শিক্ষা ক্যাডারদের অভ্যন্তরীণ এক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এসব কলেজে শিক্ষার্থী ১০ লাখ ৯১ হাজারের মতো। শিক্ষক রয়েছেন ৬ হাজার ৯৭২ জন। এসব কলেজে ১:৩০ অনুপাতে শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে ২৯ হাজার ৬৯১ জনের। উপরন্তু সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে এক যুগ ধরে নতুন পদ সৃষ্টি বন্ধ রয়েছে।
১৯৮৪ সালের এনাম কমিটি ও ১৯৮৭ সালের সমীক্ষা কমিটির স্টাফিং প্যাটার্ন অনুযায়ী পদ সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার সরকার অনুমোদিত সমীক্ষা কমিটির প্যাটার্নও মানা হচ্ছে না। কোনো পদ খালি থাকলে অল্পসংখ্যক নিয়োগ দেয়া হয়। অর্থাৎ এ সংকট দূর করতে হলে শিক্ষক নিয়োগ বাড়াতে হবে। এজন্য নতুন পদ সৃজন করা প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনকে (বিপিএসসি) এ কাজে সক্রিয় হতে হবে। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অন্য ক্যাডারের তুলনায় বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধা কম হওয়ায় এ পেশায় বেশি আকৃষ্ট নন চাকরিপ্রত্যাশীরা। যেমন—প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে বছরে দুটি পদোন্নতি দেয়ার নজির থাকলেও পদস্বল্পতার কারণে শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি হয় দেরিতে। ফলে শিক্ষক হওয়ার পরও শিক্ষকরা চেষ্টা চালিয়ে যান অন্য ক্যাডার হওয়ার জন্য। সুতরাং শিক্ষা ক্যাডারে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। বিশেষ বিসিএসের ব্যবস্থা করা যায় কিনা সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা খাতে ক্রমহ্রাসমান বরাদ্দ কলেজসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। বরাদ্দ বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত মাত্রায় জনবল নিশ্চিত করা না গেলে এ সংকট আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষায় উন্নতি নিশ্চিত করতে হলে জিডিপিতে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত অনেক বেশি। এমনকি যেসব শিক্ষক রয়েছেন তাদের মাঝেও যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। কলেজগুলোয় পাঠদান শিক্ষার মান নিশ্চিতে শিক্ষক সংকট দূর করার পাশাপাশি তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। কলেজের ক্ষেত্রে শিক্ষক, বিশেষত প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংকট প্রকট। ফলে শিক্ষার মান নিশ্চিতও চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। এ সংকট দূর করতে হলে আমাদের শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিলেই হবে না, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষিতও করতে হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত হলো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন কতজন শিক্ষক আছেন এবং সেই সংখ্যক শিক্ষকের তুলনায় কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে তার একটি সরল অনুপাত। এর ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক কতটুকু কাজ করবেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি কতটুকু মনোযোগী হবেন সে সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কম হলে শিক্ষকরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন, আলাদাভাবে নজর রাখতে পারেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দক্ষতা অনুসারে শিক্ষকরা আলাদা শিক্ষণ কৌশল তৈরি করতে পারেন। আদর্শ শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত একজন শিক্ষককে শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখার দিকে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে। সাধারণত শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২০কে আদর্শিক হিসেবে ধরে নেয়া হয়। নতুন পদ সৃষ্টি, দ্রুত নিয়োগ ও পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের মাধ্যমে শিক্ষক ও মানসম্মত শিক্ষার সংকট অনেকটাই দূর করা সম্ভব বলে আশা করা যায়।










