বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে ১ হাজার ১১৯ জন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২২ শতাংশ। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুসারে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে ২০ কোটি ৩০ লাখ। অন্যদিকে প্রতি বছরই রাস্তাঘাট উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। অনেক জায়গাতেই চিরচেনা ফসলের খেত আড়াল করে ফেলছে নতুন নতুন আবাসন, কলকারখানা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ইটের ভাটা। এর ফলে যে রাস্তার দুপাশে একসময় দেখা যেত কেবলই ফসলের ক্ষেত, সেই রাস্তার দুপাশে এখন দেখা যায় নানা অবকাঠামো। অথচ কৃষিজমি সুরক্ষা আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে।
যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমার মতো অধিকাংশ মানুষ মনে করছে, আমাদের কৃষি সঠিক পথেই এগোচ্ছে। একদিকে জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি অন্যদিকে কৃষিজমি কমে যাওয়া—এ দুই বৈপরীত্যের মাঝে থেকেও দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার অসামান্য কাজটি করে চলছে আমাদের কৃষক ও কৃষিবিদরা। কিন্তু কথা হলো, আগামী দিনে কেমন হবে আমাদের কৃষি? কারণ আমাদের অর্থনীতি এখনো নির্ধারিত হয়ে থাকে কৃষি উৎপাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর।
মনে আছে, একটা সময় চালের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি থাকার কারণে ‘ভাতের ওপর চাপ কমান, বেশি করে আলু খান’ এ রকম একটা স্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। আবার গরিব মানুষের খাবারের মূল উপাদান ছিল গমের আটার রুটি, আর সচ্ছল মানুষ ভাত খেত। কিন্তু পরে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। পুষ্টি বেশি বিবেচনায় রুটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। আর বর্তমানে স্বাস্থ্যসচেতনতা, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব, রুচির পরিবর্তনের কারণে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের কিছু পরিবর্তন আসছে। গবেষকরা দাবি করছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও ক্যান্সার বেশি হচ্ছে। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে সেই হার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ব্যয় জরিপ-২০২২ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মানুষের মাঝে খাদ্য গ্রহণে পরিবর্তন এসেছে। আমাদের প্রধান খাবার ভাতের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। তবে মোট খাদ্যগ্রহণের হার সামান্য বেড়েছে। অন্যদিকে ডাল, শাকসবজি, মাংস ও ফল খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। জরিপে দেখানো হয়, ২০১৬ সালে ভাত গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৩৬৭ দশমিক শূন্য ২ গ্রাম, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়ায় ৩২৯ গ্রাম। ২০১৬ সালে আটা গ্রহণের পরিমাণ ছিল ১৯ দশমিক ৮ গ্রাম, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ গ্রাম। এর ফলে খাদ্যে ক্যালরি এবং প্রোটিন গ্রহণের হারও কিছুটা বেড়েছে। ২০১৬ সালে মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ ছিল দৈনিক ২ হাজার ২১০ দশমিক ৪ কিলো ক্যালরি যা ২০২২-তে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৯৩ কিলো ক্যালরি। প্রোটিন গ্রহণের হার ২০১০-এ ছিল ৬৬ দশমিক ২৬ গ্রাম, ২০১৬ সালে ৬৩ দশমিক ৮০ গ্রাম ও ২০২২ সালে ৭২ দশমিক ৫ গ্রাম।
আমরা প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ গ্রাম ভাত খাচ্ছি, সেখানে পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ ২০০ গ্রামের বেশি ভাত খায় না। জাপানিদের প্রধান খাবার ভাত হলেও তারা আমাদের চেয়ে অনেক কম ভাত খায়। অনেকে আবার সুশি আর শাকসবজি খেয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়, যা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করা একেবারেই অসম্ভব। আমাদেরও ভাতের পাশাপাশি সম্পূরক খাদ্য হিসেবে ধীরে ধীরে আলু বা অন্য কোনো ধরনের শর্করাজাতীয় খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হতে হবে। চালের বিকল্প হিসেবে ভুট্টা, গম ও আলুর বিকল্প ইয়াম, কাসাভার চাষে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশের কৃষক সম্প্রদায়কে এসব কৃষিপণ্যের আবাদে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হবে। দিতে হবে কৃষিঋণ সহায়তা। বিকল্প খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় চালের উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম না পড়লে মানুষ ভাতের বিকল্প খাদ্য হিসেবে সহজে তা গ্রহণ করবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রধান খাদ্য হিসেবে দেশের জনগণ ভাত, আলু বা অন্য যা কিছু গ্রহণ করুক না কেন, তা থাকতে হবে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্রয়সীমার মধ্যে। আর দেশের আপামর জনগণকে ভাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। যখন চালের চেয়ে আটার দাম কম থাকে তখন ভাতের বদলে আটার রুটি খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। ভাতের বিকল্প না হলেও সম্পূরক খাদ্য হিসেবে আলু পেতে পারে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা।
এছাড়া আমাদের দেশের বাজারগুলো সয়লাব হয়ে আছে মিনিকেট, নাজিরশাইল কিংবা মোটা চালে। বাস্তবতা হলো, এসব নামের কোনো ধানের আবাদ যেমন দেশের কোথাও হয় না তেমনি এগুলো কেউ আমদানিও করে না। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশের ধানের মাঠ আর বাজার সয়লাব থাকে ব্রি ধানে, কিন্তু বাজারে ব্রি চাল নামে কোনো চালের অস্তিত্বই নেই। আবার দেশে এখন বিপুল পরিমাণ হাইব্রিড ধান উৎপাদন হলেও বাজারে হাইব্রিড ধানের চাল বা হাইব্রিড চাল বলে কিছু পাওয়া যায় না। যেহেতু মিনিকেট আর নাজিরশাইলে বাজারগুলো সয়লাব তাই এগুলো দিয়ে খাদ্যাভ্যাস কীভাবে পরিবর্তন করা যায় সেদিকেও দৃষ্টিপাত দিতে হবে।
মিনিকেট, নাজিরশাইল চাল নিয়ে মোহাম্মদপুরে এক চাল ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানান, অধিকাংশ ক্রেতা এসে সর্বপ্রথম মিনিকেট কিংবা নাজিরশাইল চালের কথা জিজ্ঞাসা করে। তারপর তার চাহিদা অনুযায়ী চাল কিনে থাকে। যে বিষয়টির ব্যাপারে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতে চাচ্ছে তা হলো, যে ক্রেতা মিনিকেট কিংবা নাজিরশাল চাল কেনে সে সারা বছরই মিনিকেট কিংবা নাজিরশাল কিনে থাকে। এর ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের কথা বিবেচনা করে সারা বছরই মিনিকেট কিংবা নাজিরশাল চাল বাজারজাত করে থাকে। আবার বেশি দামের আশায় বড় বড় কোম্পানি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গুদামজাত করেও রাখে।
বাড়তি জনগোষ্ঠীর খাবার জোগান নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা চালায় চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’। এতে ৩৬ জন বিশেষজ্ঞ দলে ছিলেন কৃষি থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাবার জোগান কীভাবে নিশ্চিত হবে তা নিয়ে তারা এ গবেষণা করেন। যেন সব জায়গায় এ খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আনা যায়। টানা দুই বছর গবেষণা করে তারা বলছেন, ‘আমরা যেসব খাবারে আমাদের প্লেট ভরিয়ে রাখি, সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার।’ তাদের পরামর্শ, মাংসের পরিমাণ কমিয়ে বিকল্প প্রোটিনের উৎস খোঁজা। যেসব পুষ্টিকর খাবার আমরা এড়িয়ে যেতে চাই, সেগুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মানোর ওপরও তারা জোর দেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কেউ যদি প্রতিদিন মাংস খায় তাহলে তার ডায়েটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। তার মানে এই নয় যে, সে আর মাংসই খাবে না। মাংস খাবে, তবে পরিমিত হারে। যেমন লাল মাংসের কোনো খাবার যেমন বার্গার যদি খেতেই হয় তাহলে সেটা সপ্তাহে একদিন খাবে। এছাড়া সপ্তাহের অন্য আরেক দিন মাছ বা মুরগির মাংস দিয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে। আর বাকি দিনগুলোয় প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে হবে বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাবার খেয়ে। এক্ষেত্রে গবেষকরা প্রতিদিন বাদাম, দানাশস্য বা ডাল খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া নানা ধরনের ফল ও সবজি খাওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধির কথাও জানান তারা। শ্বেতসারযুক্ত খাবার যেমন আলু বা কাসাভাও যুক্ত করা যেতে পারে।
বিজ্ঞানীদের দেয়া ডায়েটের তালিকা—বাদাম দিনে ৫০ গ্রাম। শিমের বিচি, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের ডাল দিনে ৭৫ গ্রাম। মাছ দিনে ২৮ গ্রাম। ডিম একটি অথবা দুটির বেশি নয়। লাল মাংস দিনে ১৪ গ্রাম। মুরগির মাংস দিনে ২৯ গ্রাম। রুটি ও চাল দিনে ২৩২ গ্রাম। আলুর মতো অন্যান্য শ্বেতসার সবজি দিনে ৫০ গ্রাম। দুগ্ধজাত খাবার দিনে ২৫০ গ্রাম। শাকসবজি দিনে ৩০০ গ্রাম এবং ফল ২০০ গ্রাম। এছাড়া এই ডায়েটে চাইলে ৩১ গ্রাম চিনি ও ৫০ গ্রাম তেল, যেমন জলপাই তেল যোগ করা যাবে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অক্সিজেনের পরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাবার। সেই প্রাচীনকাল থেকেই একমুঠো খাবারের আশায় সকাল থেকে সন্ধ্যা কাজ করে অসংখ্য মানুষ। তবে অর্থনীতি আর সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের ধরনেরও পরিবর্তন এসেছে। আগে দরকারের বাইরে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত খাবারের কথা চিন্তাই করত না, অথচ আজকাল প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষই রেস্টুরেন্টে খাবার খায়। বিভিন্ন দেশী-বিদেশী রেস্টুরেন্টের বদৌলতে নানা দেশের নানা স্বাদের খাবারও আজকাল খাওয়ার সুযোগ মিলছে। কিন্তু এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাবার নষ্ট আর অপচয় হওয়া। অথচ বিশ্বে প্রতিনিয়ত বাড়ছে খাবারের চাহিদা, প্রচুর খাবার নষ্ট হওয়ার পরও অভুক্ত থেকে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে খাবার নষ্ট বা অপচয় বাসাবাড়িতেই বেশি হয়। কিন্তু বাস্তবে খাবার ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকে নষ্ট হওয়া শুরু হয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত বেশ লম্বা একটি প্রক্রিয়া কাজ করে। আর সবচেয়ে বেশি খাবার নষ্ট হয় এ পর্যায়েই। তবে যেসব দেশ প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে তাদের এক্ষেত্রে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ অন্যান্য দেশের চেয়ে কম স্বাভাবিকভাবেই। শুধু খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে খাদ্যের ফলে সৃষ্ট বর্জ্যের হার কমিয়ে আনা, সেই সঙ্গে বিদ্যমান জমিতে বাড়াতে হবে খাদ্যের উৎপাদন এবং কমাতে হবে খাবারের অপচয়ও।
বশিরুল ইসলাম, কৃষিবিদ
উপপরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়










