দেশে রফতানি বাণিজ্যের প্রধান পণ্য হলো তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাকের বেশির ভাগই প্রস্তুত করা হয় তুলা বা সুতির তন্তু দিয়ে। বিপরীতে বৈশ্বিক বাজারে নন-কটন পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, বৈশ্বিক পোশাকের ৭৫ শতাংশ তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম তন্তু (নন-কটন ফ্যাব্রিক) থেকে। দেশে ২০১৭ সালে নন-কটন ফ্যাব্রিকের তৈরি পোশাক রফতানি ছিল ২৫ শতাংশ। যেহেতু দেশের রফতানি আয়ের অন্যতম উৎস পোশাক শিল্প খাত, এ আয় বাড়ানোর জন্য নন-কটন পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ করতে উদ্যোগী হতে হবে দেশের পোশাক রফতানিকারকদের। নয়তো রফতানি বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক অভিঘাত পড়বে। পোশাকের বৈশ্বিক বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে দেশ। কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের উৎপাদন ও রফতানি বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি নন-কটন পোশাক খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে তা দূরীকরণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে ২০২৫ সাল নাগাদ নন-কটন পোশাকের বার্ষিক রফতানি আয় ১৯ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি)। ইআরডির এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। তথ্যটি বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে নন-কটন পোশাক খাত দেশের জন্য বেশ সম্ভাবনাময় একটি খাত হতে চলেছে। এ খাতে মনোযোগী হওয়া উচিত, বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। তবে কেবল বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, এর যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করা জরুরি।
পোশাক শিল্প যাত্রালগ্নে নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। সেসব সমস্যা মোকাবেলা করে বর্তমানে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তৈরি পোশাক শিল্পের এখন মূল্যমান প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার এবং বৈশ্বিক বাজারে শেয়ার ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগামীতে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা জরুরি। নন-কটন পোশাক দেশের পোশাক শিল্প খাত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে প্রতীয়মান হয়।
ইআরডির গবেষণা মতে, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ও দক্ষ কর্মীর অভাব, অপর্যাপ্ত মূলধন ও বিনিয়োগ, ফাইবার নিরাপত্তা কৌশলের অনুপস্থিতি, সীমিত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম ইত্যাদি নন-কটন পোশাক খাত সম্প্রসারণের অন্তরায়। জানা যায়, কৃত্রিম তন্তুর কাঁচামাল আমদানিতে সর্বোচ্চ ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ককর দিতে হয়। যেখানে কটন বা কটন টেক্সটাইল আমদানি শুল্কমুক্ত। আবার রফতানির পর এ শুল্ক ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও দেখা দেয় বাড়তি জটিলতা। ফলে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, নন-কটন পোশাক শিল্প গড়তে হলে বিনিয়োগে সচেতন হতে হবে।
রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শুরুতেই কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া উৎপাদন বৃদ্ধিতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ বাড়ানো দুষ্কর হবে। ভারত-চীনসহ অন্য দেশগুলোয় পেট্রো কেমিক্যাল চিপস থাকায় তারা স্বল্প ব্যয়ে নন-কটন পোশাক তৈরি করে সরবরাহ করতে পারে। এ কাঁচামাল আমদানি করতে ব্যয় বেশি হলে তার প্রভাব পড়বে তৈরীকৃত পোশাকে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে মূল্য নির্ধারণ করতে হলে উৎপাদন ব্যয় কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।
এছাড়া প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে কর্মীদের দক্ষ করে তুলতে। ফাইবার ব্যবহারে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নন-কটন শিল্প প্রযুক্তি নির্ভরশীল। কর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে তৎপরতা প্রয়োজন। কর্মীদের দক্ষতা বাড়লে পোশাকে বৈচিত্র্যও নিয়ে আসা সহজ হবে। এছাড়া ভুলে গেলে চলবে না, দক্ষ কর্মী বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম হাতিয়ার। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে তাই দক্ষতা বাড়াতে জোর দেয়া প্রয়োজন।
যেকোনো পণ্য আকর্ষণীয় করতে প্রয়োজন বৈচিত্র্য। নতুন ফ্যাশন তৈরি করতে হবে কিংবা চলমান ফ্যাশনের হাল ধরতে হবে। এতে ক্রেতারা যদি আকৃষ্ট হয়, তাহলে বিক্রি যেমন বাড়বে তেমনি বাজারমূল্যও বেড়ে যাবে। ফলে লভ্যাংশও বাড়বে। তাই ফ্যাশনের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড হওয়া জরুরি।
পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণে নতুন রফতানি গন্তব্যও খুঁজে বের করার প্রয়োজন রয়েছে। দেশের রফতানীকৃত তৈরি পোশাকের বেশির ভাগই উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপমুখী। নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে এবং প্রয়োজনমাফিক কাজ করা দরকার। রফতানি বাণিজ্যে যেকোনো এক বা দুটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশীয় বাজারে বিদ্যমান সমস্যাগুলোও দূর করা জরুরি। দেশের বাজারে অসম প্রতিযোগিতা যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে কটন বা নন-কটন উভয় পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা রফতানি বাণিজ্য ভবিষ্যৎ অগ্রগতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছে আর দেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় রফতানি বাণিজ্যের খাত বাড়ানো আবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ ভিয়েতনামের দিকে লক্ষ করা যায়।
যেখানে ২০২০ সালে সারা বিশ্বে পণ্য রফতানি কমে গিয়েছিল প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে ভিয়েতনামের মোট পণ্য রফতানি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২৮ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। এর কারণ তাদের রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য। ভিয়েতনামে শুধু পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য আরো শিল্প, যেমন ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ফুটওয়্যার ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের উৎপাদনেও সমপরিমাণ উদ্যোগী। প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার সার্ভিস ইকোনমি রফতানি করে দেশটি। এ পথে এখন অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যদি রফতানি বাণিজ্য ত্বরান্বিত করতে হয়।










