ড. আতিউর রহমান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক। এর আগে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি উন্নয়ন সমন্বয়ের চেয়ারপারসন। দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব ও অন্যান্য প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম

দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক গতিপ্রবাহ সম্পর্কে বলুন।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা যখন তৈরি হয়, তখন একধরনের ভীতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এ ভীতির সংস্কৃতির ফলে বিশেষ করে নগরে মানুষ ঘর থেকে খুব একটা বের হতে চায় না। যারা ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িত, তারাও খুব সতর্ক থাকেন। বিশেষ করে পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কখন তাদের পরিবহনটি ভাংচুর হয় কিংবা আগুনে পুড়ে যায় সেই দুর্ভাবনায় কুঁকড়ে থাকেন তারা। চালক ও সহায়ক কর্মীদের দুশ্চিন্তা আরো বেশি। কাজ নেই। আয়ও নেই। তদুপরি আছে আহত হওয়ার শঙ্কা। অনানুষ্ঠানিক খাত যেটাকে বলা হয়, সেটিতে খুব প্রভাব পড়ে। দেশের ৮০-৮৫ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক খাতেই প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ এসব কাজের সঙ্গে জড়িত। ফলে যেটা হয় অনানুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে যারা ছোট ব্যবসা করে, রাস্তার পাশে চায়ের দোকানদারি করে কিংবা নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে সারা দিন ব্যবসা করে বিকালবেলা চলে যায়, এ খাতের মানুষগুলো বড় বিপদে পড়েছে। প্রথমত, তাদের জন্য পণ্য সংগ্রহ করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এতে তাদের উপার্জনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, এ রকম ভয়ের সমাজে পরিবহন সংকটের কারণে সরবরাহে সংকট দেখা দেয়। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এ ভয়ের একটা প্রিমিয়াম আছে। ভয়ের মধ্যে কাজ করতে চাইলে বিশেষ করে ভ্যান, ছোট ছোট ট্রাক, তারা যদি ভয় পায় তাদের বাহন পুড়িয়ে দেবে, তাহলে তারা বেশি ভাড়া চাইবে। কারণ তাদের তো বীমা করা নেই। বীমা থাকলে এত ভয় পেত না। আবার পরিবহন ব্যবস্থা নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। দূরপাল্লার পরিবহন চালু রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সবাই ভয় পাওয়ায় ট্রাকওয়ালারা নামতে চাইছে না। নামতে চাইলেও অনেক ভাড়া দাবি করছে। এ কারণে শহরে গ্রাম থেকে আসা জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, অবরোধের আগে আদা, রসুন কিংবা পেঁয়াজের যে দাম ছিল, এখন খোঁজ নিলে জানা যাবে কী পরিমাণ দাম বেড়েছে। অথচ গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য কম দামে বেচতে হচ্ছে। অন্যদিকে শহর থেকে যাওয়া পণ্য গ্রামে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেই এমনটি হচ্ছে। সরবরাহের ঘাটতি অর্থনীতিকে এ অবস্থায় উপনীত করেছে। তবে ধীরে ধীরে মানুষ এ ভয়কে জয় করে রাস্তায় বের হতে শুরু করেছে। দূরপাল্লার পরিবহন চলাচল আগের চেয়ে বাড়ছে। তবে পরিবহনে বিচ্ছিন্ন অগ্নিসংযোগ এখনো চোখে পড়ছে।

এ রকম পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ কি আকৃষ্ট করা যাবে?

অতিসত্বর নতুন বিনিয়োগের কোনো সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি না। কারণ ছোটখাটো বিনিয়োগ করতে গেলেও তো অর্থ জোগাড় করতে হবে। আর অনিশ্চিত অবস্থায় কীভাবে বিনিয়োগ করবে? যেমন কেউ যদি তার প্রবাসী কোনো আত্মীয়স্বজনের কাছে ছোট একটা দোকান দেয়ার জন্য ১০০-২০০ ডলার চায়, তাহলে তাকে বলা হবে এখন থাক, পরিস্থিতি আগে শান্ত হোক। যতক্ষণ পর্যন্ত শান্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা নতুন করে কোনো বিনিয়োগ করবেন না। এ পরিস্থিতিতে বড় বিনিয়োগকারীদেরও সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে রফতানি খাতে তারা পণ্য বন্দরে নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। অনেক কাভার্ড ভ্যান পোড়ানো হচ্ছে। আবার আমাদের রফতানি খাতের ৮০ শতাংশ আমদানি খাতের সঙ্গে জড়িত। বিদেশ থেকেও অনেক কাঁচামাল ও মধ্যম জিনিসপত্র আমদানি করতে হয়। সুতরাং, দুদিক থেকেই সংকট তৈরি হচ্ছে। গাড়ি নিয়মিত বন্দরে যাচ্ছে না, পণ্য রফতানি সম্ভব হচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তাই সময়মতো রফতানি আদেশ পূরণ করতে পারছেন না। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকা অবস্থায় পুলিশের আইজিপিকে চিঠি লিখে বলেছিলাম, এ অনিশ্চয়তা কখন দূর হবে জানি না। কিন্তু আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখতে চাই না। বলেছিলাম, আমাদের রফতানিকারকরা চট্টগ্রামে যাবেন। ১০০ ট্রাক যাবে। সামনে, পেছনে ও মাঝখানে পুলিশের নিরাপত্তা গাড়ি থাকলে রফতানিকারকরা নিরাপদে পণ্য বন্দরে নিয়ে যেতে ও সেখান থেকে কারখানায় আনতে পারবেন। সুতরাং, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ যাতে না হয় সেটা যেন তিনি নিশ্চিত করেন। আমরা কিন্তু সে সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু জানি না এবার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কিনা। যদি না হয়ে থাকে তাহলে এ নিরাপত্তাহীনতার একটা প্রভাব তো পড়বেই। তাছাড়া এসবের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর, যা এখনো অস্বস্তিকর। অক্টোবরেও গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশেরও বেশি। 

মূল্যস্ফীতি কমানোর কোনো প্রক্রিয়াই কাজে লাগল না। তাহলে কি পদক্ষেপগুলো ভুল ছিল?

মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক নিচ্ছে। আমরা অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছিলাম, এর মধ্যে একটা পরামর্শ ছিল মনিটারি পলিসি আরো টাইট করতে হবে। আমাদের পলিসি রেটগুলো আরো বাড়াতে হবে। তারা ছয় সপ্তাহ আগে ৭৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছিল। ঋণগ্রহীতার জন্য আরো ৫০ বেসিস পয়েন্ট ঋণের হার বাড়িয়েছে। এটার একটা প্রভাব পড়া শুরু করেছে। অর্থাৎ, বাজার থেকে অনেক টাকা উঠে গেছে। বাজারটা কনট্রাকশনারি একটা মনিটারি অবস্থায় আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক তার নীতি সুদহার আরো ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে। এটি বিচক্ষণ পদক্ষেপ। মূল্যস্ফীতি বাগে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এটি সেই বার্তা। আরো আগে থেকে এ বার্তা দেয়ার প্রয়োজন ছিল। তবে দেরিতে হলেও এ বার্তা দেয়ার ভঙ্গিটি যথার্থ। আরো কিছু দিন তা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি। তবে মূল্যস্ফীতির ওপর এর কার্যকর প্রভাব পড়তে আরো একটু সময় লাগবে। এখন নিশ্চিতভাবে রাজনৈতিক কারণে এ অপারেশনগুলো করা যাচ্ছে না। কেননা টাকার অভাব এখন বড় না, এখন আস্থার অভাব বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বাজারে কিছু বিক্রি করতে ও কিনতে যেতেই ভয়ে আছে। অনেকেই হিসাব করে পা ফেলছে। সব মিলিয়ে অনাস্থার একটি পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলার যে বিষয়টি মনিটারি পলিসিতে করার কথা ছিল, সেটা অনেক সময় অর্থনীতির বাইরের কারণে নিউট্রালাইজ হয়ে যাচ্ছে। কারণ এখন ডিমান্ড সাইডের চেয়ে সাপ্লাই সাইড বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। এ কারণে জিনিসপত্রের দাম কমানো বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মনিটারি পলিসিতে একটা বিষয় ঘটছে, আগে সুদহার বিশেষ করে ডিপোজিটের বিপরীতে সুদহার মূল্যস্ফীতির চেয়ে অনেক কম ছিল, যে কারণে লোকেরা ব্যাংকে টাকা রাখত না। বর্তমানে সুদহার একটু একটু করে বাড়ানোর কারণে আবার ব্যাংকে টাকা ফেরা শুরু করেছে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে যে মানি ইজ রিভার্সিং, অর্থাৎ টাকা ফিরে আসছে। এটা একটি ভালো লক্ষণ। মূল্যস্ফীতিকে চাহিদার দিক দিয়েও যেমন আক্রমণ করতে হবে, সাপ্লাইয়ের দিক দিয়েও আক্রমণ করতে হবে। ডিমান্ড সাইডের চাপ কমছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের কারণে সাপ্লাই চেইনে নতুন করে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সাপ্লাই সাইড শুধু দেশের ভেতরে না, বিদেশ থেকে যে পণ্যগুলো আসে সেগুলোর খরচও বেড়ে গেছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির হার খুব একটা নামানো যাচ্ছে না। এটার জন্য সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতাকে অবশ্যই দায়ী করা যায়। যেটা কমতে শুরু করেছিল, সেটা আর কমছে না। এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেজন্যেই নীতি সুদহার বাড়ানো যথার্থ বলছি। তাছাড়া নির্বাচনের সময় এমনিতেই বাড়তি টাকার চলাচল বাড়ে। মূল্যস্ফীতির ওপর তারও প্রভাব পড়ে। 

এখন তাহলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

সংকোচনমূলক মুদ্রা ও রাজস্বনীতির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষার চৌহদ্দি বাড়িয়ে যেতে হবে। নিঃসন্দেহে এতদিনে রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়া উচিত ছিল। সেটা কীভাবে হবে আমরা অর্থনীতিবিদরা বলতে পারব না। আমরা যেটা বলতে পারি এই যে অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করেন, যারা খুব বিপদের মধ্যে আছেন, তাদের জন্য আরো বাড়তি কিছু সামাজিক সুরক্ষা সুযোগ তৈরি করা। যেমন আগে টিসিবির যে কয়টা ট্রাকে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রি করত, সেই ট্রাকের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে দেয়া। মনে হয় এ সংখ্যা খানিকটা হালে বেড়েছে। তবে এটা মনে রাখা চাই যে আগে ছোট ছোট দোকানদারও এসব ট্রাকের পণ্য কিনতে আসতেন না, এখন ছোট পান দোকানদাররা এসব ট্রাক থেকে কিনতে আসছেন। আর পরিবহন কর্মীরাও আসছেন। তবে অনেকটা সময় লেগে যাচ্ছে তাদের এ পণ্য কিনতে। তাদের শ্রমঘণ্টা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে। তাই এ পণ্য সংগ্রহের সুযোগটা আরো খানিকটা বাড়িয়ে দেয়া দরকার। দরকার হলে একটা স্পটে বিক্রি হচ্ছে, পাশেই আরো একটা স্পটে তা বিক্রি হোক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এসব ট্রাকে রাজনৈতিকভাবে যারা বিরোধিতা করছে তারাও আগুন দেবে না। কারণ এ আগুন তাদের ভাবমূর্তির কাপড়েই গিয়ে লাগবে। সুতরাং কম আয়ের মানুষের জন্য আমাদের পণ্যের সাপ্লাই সাইডটা বাড়িয়ে দেয়া উচিত। তা না হলে যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তাতে মানুষের কষ্ট আরো বাড়বে। একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হচ্ছে, আবার নিম্ন আয়ের মানুষ সেভাবে জিনিসপত্র কিনতেও পারছে না। তাই তাদের জন্য খানিকটা কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ আরো বাড়ানোর দরকার রয়েছে। এসবই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমাদের এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। যদি সহসাই রাজনৈতিক সমঝোতা না হয় তাহলে সমাজে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। এর প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। যেমন ২০১৪ সালে তিন-চার মাস ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। তার প্রভাব অর্থনীতিতে অনেক খারাপভাবে পড়েছিল। আমরা তা নিজ চোখে দেখেছি। যারা ঋণ নিয়েছিলেন তারা আর ফেরত দিতে পারেননি। তাদের জন্য আমরা প্রায় শতভাগ শোধের সময় বাড়িয়ে দিয়েছি। শূন্য ডাউন পেমেন্টেও অনেককে পুনঃতফসিল করে দিয়েছি। অনেক বড় ব্যবসায়ীও সে সুযোগটা নিয়েছেন। এটা আসলে হয়ে থাকে। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ অনিশ্চিত পরিবেশ, তারা যে টাকাটা বিনিয়োগ করছেন, সে বিনিয়োগের সুফল তুলতে সময় তো দিতে হবে। আরেকটা ছোটখাটো বিপর্যস্ত গ্রুপ হলো যারা অস্থায়ী গৃহকর্মী। তারা বস্তি থেকে কাজে আসেন। বাসাবাড়িতে কাজ করেন, আবার ফিরে যান। তারাও খানিকটা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিয়েও তারা ভাবেন। তাদের অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সার্বিকভাবে কর্মসংস্থানের ওপর বড় একটা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে আমার নিজের ধারণা। আমাদের অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতে মাত্র ১৫-২০ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়। তাছাড়া আনুষ্ঠানিক খাতে যথেষ্ট জনবল এখন আছে। তাদের একটা অংশের কর্মচ্যুতি ঘটার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এ রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে তা হতেই পারে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতে যদি মানুষের আয় কমে যায় তাহলে বড় সমস্যা তৈরি হবে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাবে। অন্যদিকে কৃষকদের ভোগান্তি তো হচ্ছেই। তারা ফসল উৎপাদন করছেন, তবে সেটা নির্বিঘ্নে বাজারজাত করতে পারছেন না। সঠিক মূল্য না পাওয়ার কারণে কোথাও কোথাও খামারিরা দুধ বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এসব সমস্যা স্বল্পমেয়াদি হলেও এগুলো সমাধান করা জরুরি। প্রশাসনিকভাবে এ সমস্যা দূর করতে না পারলে স্থানীয়ভাবে হলেও এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। এর আগে কভিডের সময় আমি একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম সেটিই আবার দিচ্ছি। যেহেতু কৃষকদের উৎপন্ন সবজি দূর-দূরান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না, সেক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারে এসব সবজি বিক্রি বাড়ানো যায় কিনা সে ব্যাপারে আমাদের সম্ভাব্যতা দেখতে হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেমন—কারাগার, হাসপাতাল। এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্যের যে চাহিদা রয়েছে, সেটা মেটাতে যদি স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাড়তি সবজি সংগ্রহ করা যায় তাহলে কৃষক লাভবান হবেন। তারা উপযুক্ত দাম পাবেন।

সংকট সমাধানের জন্য কীভাবে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আসল কথা হচ্ছে রাজনীতির সংকট রাজনৈতিকভাবেই খুঁজতে হবে। তবে বিরোধী দলগুলোর প্রতি আমার আহ্বান হচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কষ্টের সম্মুখীন না হয়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক সক্রিয়তা মানে এই না যে আমরা অর্থনীতির পায়ে বেড়ি দেব। কারণ হচ্ছে এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। নিরুৎসাহিত হন উদ্যোক্তা শ্রেণী। তারাও তো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক। তাদের বিষয়টি না দেখলে এ রাজনীতিকে মানবিক বলা যাবে না। তবে এটা যে শুধু রাজনৈতিক সংকট ব্যাপারটা এমনও নয়, এর পেছনে সামগ্রিকভাবে সমাজের কিছু করার দায় রয়েছে। নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক সংকটের দ্রুত সমাধান দরকার। তা না হলে অর্থনীতি মার খাবে। এক্ষেত্রে সেতুবন্ধ তৈরির কেউ নেই। রাজনৈতিক সমাধান আনতে বিদেশীরা মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। সেটি আমাদের জন্য মোটেও গৌরবের নয়। সেক্ষেত্রে আমি বলতে চাচ্ছি দেশের মধ্যে এমন কাউকে দরকার যিনি এসব বিষয়ে মধ্যস্থতা করবেন। আমরা নব্বইয়ের দশকে এমন একটি চিত্র দেখেছিলাম। আমার মনে আছে অধ্যাপক রেহমান সোবহান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ফয়েজ আহমেদের মতো মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। এখন সে মাপের মানুষও নেই আর সেভাবে একত্রে বসানোর উদ্যোগও নেই। সেজন্যই পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার দিকেই যাচ্ছে, যার প্রভাব অর্থনীতির ওপর নিশ্চয়ই পড়বে। এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে।

ব্যাংক খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে কী করা উচিত?

ব্যাংক খাতে আগের চেয়ে খানিকটা আস্থা ফিরেছে। মানুষ ব্যাংকে বেশি হারে আমানত রাখছে। এর আগেও বলেছি, মনিটারি পলিসি খানিকটা সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সর্বশেষ নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে আরো সক্রিয়তা দেখিয়ে যেতে হবে। এখন প্রথম কাজ হচ্ছে ব্যাংক খাতে বাজারনির্ভরশীলতা আরাে বাড়াতে হবে। এর আগে সুদহার ও বিনিময় হারের ক্ষেত্রে বাজারের পরিস্থিতি না বুঝেই কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। ফলে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহে তার কোনো সংযোগ ছিল না। কিন্তু এখন বাজারের সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের সম্পর্ক খানিকটা হলেও ফিরতে শুরু করেছে। এ সম্পর্ক সর্বদাই ধরে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি কিছুটা কাজ শুরু হয়েছে, ফলে ডিপোজিট এমনকি রেমিট্যান্সও আসতে শুরু করেছে। বিনিময় হার বাজারদরের কাছাকাছি আনার একটা চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে কাজ এখনো অনেকটাই বাকি। তাই বলব এই যে আমাদের বাজারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, এটা যেন অব্যাহত থাকে। এতে অন্তত তারল্যের যে সংকট সেটি হবে না।

আর দ্বিতীয় যে কারণটা আগেও বলেছি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে খেলাপি ঋণ কিন্তু বাড়বে। যারা প্রকৃতপক্ষে ঋণ নিয়ে ফেরত দিতে চান, তারাও ব্যবসা-বাণিজ্যে ভালো করতে না পারলে সময়মতো অর্থ ফেরত দিতে পারবেন না। তাই এসব ক্ষেত্রে আমাদের অনেক উদ্ভাবনীমূলক মনিটারি/ফিসক্যাল পলিসি বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক যে আলোচনা শুরু করেছে তা চালিয়ে যেতে হবে। আশার কথা, নতুন করে মনিটারি পলিসি কমিটি গঠিত হয়েছে এবং সেটি কাজ শুরু করেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরের অর্থনীতিবিদরাও সদস্য হিসেবে অবদান রাখছেন। এভাবেই সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। একইভাবে আগামীতে বড় ধরনের সংস্কারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।