বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পথ চলা একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। উভয় প্রতিষ্ঠানেরই আর্থিক পণ্য পরিষেবার বৈচিত্র্য ও চ্যালেঞ্জ দুটোই রয়েছে। লক্ষণীয় যে তাদের পরিষেবার ধরন এক হলেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অনেকটাই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। আজকের নিবন্ধে আমরা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে আর্থিক পণ্য পরিষেবায় বিদ্যমান ফারাকগুলো পূরণ করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করব।
দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংক এবং ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দেশজ উন্নয়নে উভয় প্রতিষ্ঠানই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে, কিন্তু লক্ষণীয় যে তাদের পণ্য পরিষেবায় বেশকিছু বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
আর্থিক পরিষেবায় পণ্যগুলোর একটি বড় অংশই ব্যাংকগুলো মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। যাতে প্রচলিত সঞ্চয় হিসাব থেকে শুরু করে চলতি হিসাব, আমদানি, রফতানি, বাণিজ্যিক অর্থায়নসহ অত্যাধুনিক সব সেবাই অন্তর্ভুক্ত। তারা ডিমান্ড ড্রাফট (ডিডি), টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার (টিটি), পে-অর্ডার, এলসি, ব্যাংক গ্যারান্টি, ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট এবং আরো অনেক কিছুর মতো আনুষঙ্গিক পরিষেবাগুলো দিয়ে থাকেন। উপরন্তু তাদের জন্য স্থানীয় এবং বিদেশী রেমিট্যান্স, কল মানি অপারেশন এবং সরকারি ট্রেজারি পরিষেবাগুলোরও সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণ সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে খুবই সীমিত বিকল্প রয়েছে যা ব্যবসায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। তাদের ব্যবসা প্রাথমিকভাবে মেয়াদি আমানত এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক অর্থায়নের মতো পণ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে ব্যাংকগুলোও একই পণ্য পরিষেবায় প্রতিযোগিতা করে। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব সময় তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যবসা করতে হয়। একই প্রতিযোগিতায় যেখানে ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কস্ট অব ফান্ডের মাঝে বিশাল ফারাক। এমন বিশাল ফারাক এবং অসম প্রতিযোগিতায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিক বাস্তবতায় টিকে থাকা সত্যিই কঠিন। ওই সীমাবদ্ধতায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন অনেক সম্ভাবনাময় বাণিজ্যের উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবসায় সমতা আনয়ন ও পণ্য নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রতিটি সেক্টরের জন্য আর্থিক পণ্য নির্ধারণে ঝুঁকি কমাতে একটি কৌশলগত বাজার ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করতে পারে, যেখানে একটি সেক্টরের ব্যবসার সঙ্গে অন্য সেক্টরের ব্যবসার ওভারল্যাপিং হবে না এবং সুস্থ প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করবে।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আইনি কাঠামোর মাঝে এমন পরামর্শ থাকবে যাতে তারা প্রচলিত বাজারের বাইরেও অপ্রচলিত বাজারের আর্থিক পণ্য উদ্ভাবনে আগ্রহী হয়। বাজারের চাহিদা রয়েছে কিন্তু ব্যাংক সেসব ব্যবসায় আগ্রহী নয় এমন বাজারে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। যেমন প্রান্তিক পর্যায়ে সমবায়কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায় লগ্নি এবং মহাজনি কারবার। এ ধরনের অনেক অনানুষ্ঠানিক ব্যাংকিং রয়েছে যা অপ্রচলিত বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। এমন ব্যবসাগুলো প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনতে পারলে যেমন গ্রাহক পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত হবে তেমনি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হবে। নীতি প্রণয়নে এমনসব দিকনির্দেশনা থাকলে প্রান্তিক লেভেলে ব্যাংকিং ব্যবসায় যেমন শৃঙ্খলা ফিরে আসবে তেমনি ভবিষ্যতে সেক্টরাল গ্রোথকেও আরো ত্বরান্বিত করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক আর্থিক পণ্য নির্ধারণ জরুরি। তাই নীতি সহায়তার মাধ্যমে প্রতিটি সেক্টরের মধ্যে বিশেষীকরণ স্পষ্ট করাসহ তাদের নতুন বাজার উদ্ভাবনে আগ্রহী করতে পারে এমন পরিকল্পনা নেয়া আবশ্যক। যেখানে ব্যাংকগুলো তাদের জন্য নির্ধারিত পণ্যে মূল ব্যবসাগুলো পরিচালনা করবে আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জন্য নির্ধারিত পণ্যে ব্যবসা পরিচালনা করবে। উভয় প্রতিষ্ঠানের এ দ্বৈত আর্থিক বাজার প্রক্রিয়াকে একটি গতিশীল বিভাজিত বাজার প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করতে পারলে ভোক্তা পর্যায়ে যেমন পণ্য পছন্দের ক্ষেত্রে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পণ্য নির্ধারণ সহজ হবে তেমনি উভয় প্রতিষ্ঠানের মাঝে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু কিছু ক্ষেত্রে নীতি সহজীকরণের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি বিশেষ ফান্ড তৈরি করতে পারে। ওই ফান্ড স্বল্প সুদে বা সুদবিহীন আপৎকালীন ফান্ড সহায়তা হিসেবে তাদের সক্ষমতা বিবেচনায় প্রদান করাসহ ব্যাংকের জন্য প্রচলিত কল মানি মার্কেটের সুবিধা উন্মুক্ত করা যেতে পারে। ফান্ড দেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই রেটিং বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে ফান্ডের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রেফারেন্সিয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন ফান্ড থেকে কম সুদে ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এমন উদ্যোগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে নতুন প্রাণ খুঁজে পাবে বলে আমার বিশ্বাস।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অনুমতির জন্য প্রায় ৫০টিরও বেশি আবেদন এরই মধ্যে জমা পড়েছে। উদীয়মান এ খাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরেকটি সম্ভাব্য হুমকি হয়ে সামনে আসবে। কারণ তাদের এই ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবসার বিভিন্ন পণ্যের গ্রাহক পর্যায়ে একই উৎসে প্রতিযোগিতায় লড়তে হবে যা এই মার্কেটের স্থিতিশীলতাকে আরো প্রভাবিত করবে।
কঠিন তারল্য সংকট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পথ চলাকে দারুণভাবে ব্যাহত করছে। যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল ফান্ডিং সোর্স ধরা হয় ব্যাংক এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন ফান্ড, সেখানে তাদের কাছ থেকে এখন ফান্ড পাওয়া দুষ্কর, বরং যাদের ফান্ড ছিল তারাও ফান্ড সরিয়ে নিচ্ছেন। কিছু কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রেপুটেশন সংকটের কারণে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেই গ্রাহক পর্যায়ে ফান্ড সরিয়ে নেয়ার চাপ অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রাহক পর্যায়ে তাদের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং তাতে দিন দিন এ খাতের সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নমনীয় নীতি সহায়তার মাধ্যমে তারল্য সরবরাহ না পেলে এ খাতের অস্তিত্ব কঠিন হুমকির সম্মুখীন হবে।
আর্থিক খাতের ওপর গ্রাহক পর্যায়ে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অংশীজনদের নিজ নিজ জায়গা থেকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। উভয় প্রতিষ্ঠান থেকে সমস্যা চিহ্নিতকরণসহ সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার মাধ্যমে অচিরেই এর সমাধান নিশ্চিতকল্পে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য সংকট মোকাবেলা ও স্থিতিশীলতার জন্য সংবিধিবদ্ধ লিকুইডিটি রিজার্ভ (এসএলআর) থেকে আপৎকালীন সহায়তা ও কল মানি বাজার ব্যবস্থার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা শিল্পগুলোর মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আন্তঃ অর্থবাজার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারল্য প্রবাহ তৈরি করা। তাছাড়া এ খাতের জন্য বিশেষ ফান্ড তৈরির মাধমে দ্রুত স্বল্প মেয়াদি তারল্য সহায়তার ব্যবস্থা করা যা স্বল্প সুদে বা নো-কস্ট সার্টিফিকেট এবং বিলের মাধ্যমে হতে পারে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি রিকভারি, ঠিক সময়ে বিনিয়োগকৃত টাকা রিকভারি না হলে এর সব চাকা বন্ধ হয়ে যায়। কঠিন নীতি প্রণয়ন এবং প্রয়োগের মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের কাছে আটকে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা পুনরুদ্ধারকল্পে রেগুলেটরি পর্যায়ে আইনি পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবশ্যক।
অংশীজনের সঙ্গে রেগুলেটরি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে আইনি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ খাতে বিদেশী ইনভেস্টমেন্ট সহজীকরণ এবং রেমিট্যান্স সংগ্রহে এ খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা। এ খাতের স্থিতিশীলতা এবং প্রসারে অবিলম্বে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক পণ্য আলাদা করে নির্দিষ্টকরণ এবং যথাযথ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা। দীর্ঘমেয়াদি তহবিল দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যবহার করা এবং স্বল্পমেয়াদি তহবিল স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যবহার করা।
বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত পদক্ষেপ, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব। বিদ্যমান সমস্যার মাঝেও এ খাতকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিশ্রুতি ও অনবদ্য সহায়তা অবশ্যই প্রশংসনীয়, যা একটি বৈচিত্র্যময়, স্থিতিস্থাপক এবং গতিশীল আর্থিক খাতকে লালন করে। স্টেকহোল্ডার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যদি একসঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়নে আর্থিক পণ্যের বিশেষীকরণ, তারল্য প্রবাহ সহজীকরণ, অপ্রচলিত বাজারের ঘাটতি পূরণে নতুন নতুন সুযোগের উদ্ভাবনসহ আটকে পড়া হাজার হাজার কোটি টাকা পুনরুদ্ধারে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর মধ্যে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, তাহলে এ খাতের বিকাশে পথচলা আরো সহজ হবে এবং ভারসাম্যপূর্ণ একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
কেবিএম মঈন উদ্দিন চিশ্তী: চেয়ারম্যান
ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (আইএফআইএল) ও ট্রেজারার, বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি










