ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে মূলত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে রাজধানী ঢাকা যখন তলানিতে অবস্থান করছে, সে সময়ে রাজউকের সক্রিয় ও জোরালো ভূমিকা রাখার বদলে নানা অনিয়মে পথ চলাটাই যেন স্বাভাবিক কাজে পরিণত হয়েছে। রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে অভিযোগ আগে থেকেই রয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা। এর সঙ্গে দুর্বলতার কথাও সামনে আসছে। আর এগুলোকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে ক্রমাগত চলছে নিয়মবহির্ভূত সব অবৈধ নির্মাণকাজ। মূলত রাজউকের প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই দিন দিন বেড়েছে নিয়মবহির্ভূত ভবনের সংখ্যা।

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী ঢাকার বয়স ৪০০ বছর ধরা হয়। একসময় ঢাকার প্রায় সব অংশে এক থেকে তিনতলা বাড়ির সংখ্যাই বেশি ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকায় এখন ১৮-২০ তলা ভবনও দেখা যায়। রাজধানীতে ১০ তলা বিল্ডিং আজকাল অহরহ চোখে পড়ে। এতসব উঁচু ভবন নির্মাণ হলেও রাস্তাঘাট কিন্তু বড় হয়নি। একই সঙ্গে মানা হয়নি ইমারত আইনের বিধিমালা ও বিভিন্ন সুপারিশ। ফলে অগ্নি ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির সঙ্গে ঢাকাবাসীকে নিত্য বসবাস করতে হচ্ছে। ঢাকার বাসযোগ্যতা ধ্বংসের ক্ষেত্রে রাজউকের ভুল পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক দুর্বলতাই বড় কারণ বলে মনে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। রাজউক নিজেদের কর্ম ও দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে একদিকে যেমন সুউচ্চ ভবনের অনুমোদন দিয়েছে, অন্যদিকে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো তদারক করেনি। যে কারণে ঢাকা নগরী আজ এতটা বসবাসের অযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশের শহরাঞ্চলে নির্মাণ করা ও নির্মাণাধীন ৬৬ শতাংশ ভবনই তৈরি হচ্ছে বা হয়েছে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে। নিয়ম না মেনে তৈরি হওয়া এসব ভবন একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি শহরগুলোকে অপরিকল্পিত করতেও রাখছে বড় ভূমিকা। সবচেয়ে বেশি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে রাজউকের অধিভুক্ত এলাকায়।

মূলত ভবন নির্মাণের যাবতীয় আইনকানুন মেনে নকশা অনুমোদন করার পাশাপাশি নির্মাণাধীন ও নির্মিত ভবন তদারকি ও পরিদর্শনের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত ভবনে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা রাজউকের কাজ। কিন্তু রাজউকের প্রশাসনিক বিভিন্ন জটিলতা ও দুর্বলতার কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে। সেজন্যই রাজউককে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির পরিদর্শক ও পরিচালকদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

রাজউকের উচ্ছেদ কার্যক্রম ধীরে চলা ও অন্যান্য অনিয়মের কারণেই রাজধানীতে বেড়েছে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে গড়ে ওঠা ভবনের সংখ্যা। বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান কার্যক্রম ধীরগতির হওয়ার জন্য বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে বড় সমস্যা হলো তাদের নিজস্ব কোনো পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট নেই। কোনো ভবনে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশ প্রশাসন থেকে অনুমতি পেতে দেরি হয় বলে উচ্ছেদ অভিযান সময়মতো পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এছাড়া সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। মূলত কোনো ভবনের ব্যত্যয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নোটিস দেয়ার নিয়ম থাকলেও তা পুরোপুরি মানছেন না খোদ পরিদর্শকরা। যদি কোনো ভবনে নোটিস দেয়া হয়, সেখানেও নোটিস দেয়ার পর ভবন মালিকরা বিভিন্ন উপায়ে পরিদর্শকের উচ্ছেদকাজ আটকে দেয়ার চেষ্টা করেন। আবার অনেক সময় নোটিস বা ভবনের ব্যত্যয়ের বিষয়ে অফিসে প্রতিবেদন জমা না দিতে পরিদর্শকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। একাধিক পরিদর্শক জানান, কোনো কোনো ভবনে বারবার নোটিস দেয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উচ্ছেদ কার্যক্রমে আগ্রহ কম দেখা যায়। এমন বিষয়টিকে বড় ধরনের অনিয়ম বলে মন্তব্য করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, রাজউকের মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চে ২ হাজার ১১১টি ভবন পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণাধীন ভবন ১ হাজার ৭৯৪টি। পরিদর্শন করে রাজউক দেখেছে, ১ হাজার ৫৫টি ভবনে কোনো না কোনোভাবে নিয়মের ব্যত্যয় রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যত্যয় পাওয়া প্রতিটি ভবন মালিককে নোটিস দেয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৮৭৪ ভবন মালিককে দেয়া হয়েছে নোটিস। বাকি ২০৮ ভবন মালিককে চিঠি দেননি সংস্থার ইমারত পরিদর্শকরা।

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি অনেকদিনের। কিন্তু তা সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানীজুড়ে যেকোনো ভবন, স্থাপনা তৈরি করতে হলে রাজউকের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও নজরদারি থাকা আব্যশক। কিন্তু দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে রাজউক নিজ দায়িত্বে অবহেলা ও উদাসীন রয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা অর্থের বিনিময়ে অনুমোদন দেয়া বা সময়মতো নির্মাণাধীন ও নির্মিত ভবন পরিদর্শনে গাফিলতির কারণেই নিয়মবহির্ভূত ভবনগুলো নিজেদের মতো করে নির্মাণ করে চলছে। পরে কোনো প্রকার দুর্ঘটনায় ভবন ধসে পড়লে বা আগুন লাগলে তখন জানা যায় যে ভবনটি রাজউক অনুমোদিত ছিল না বা অনুমোদনকৃত নকশার বাইরেও নানাভাবে বর্ধিত পরিসরে তৈরি করা হয়েছে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা না। রাজউক তার নিজের কাজ ঠিকমতো করলে এমনটি হওয়ার কথা না।

দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পরিকল্পিত ও ঝুঁকিমুক্ত ঢাকা মহানগরীর কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়সাধন করতে হবে। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজউক ঢাকা মহানগরীর উন্নয়নে বর্তমানে যেভাবে কাজ করছে তা  যথেষ্ট নয়। এ সমস্যার সমাধানে রাজউককে ঢেলে সাজাতে হবে। এছাড়া ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নগরীতে বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে কিনা সেটি তদারক করার জন্য রাজউকের অধিক তৎপরতা ও গতি দুটিই বাড়ানো প্রয়োজন।