টেকসই গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য নাগরিকদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। গ্রামীণ উন্নয়ন যেহেতু একটি বিস্তৃত কর্মসূচি,
তাই সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে। স্থানীয়
সরকার সব সমস্যা সমাধানের প্রাথমিক স্তম্ভ। সেখানে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় করে
নেয়ার একটি বড় সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকারের স্থায়ী কমিটিকে কার্যকরের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা সমুন্নত রেখে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় গ্রামীণ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তর ইউনিয়ন পরিষদ। প্রতিষ্ঠানটি
নাগরিকদের দোরগোড়ায় সেবা প্রদানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এটি স্থানীয়
পর্যায়ে সুশাসন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। স্থায়ী কমিটি ইউনিয়ন পরিষদের এসব কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে কাজের চাপ কমাতে ও সিদ্ধান্ত প্রণয়নের মাধ্যমে
দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন কার্য সম্পাদনে সহায়তা করে।
সাধারণভাবে স্থায়ী কমিটি হলো ইউপি সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি, যারা তাদের
ওপর অর্পিত বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে। যেহেতু স্থায়ী কমিটিগুলো তুলনামূলক কম আনুষ্ঠানিক নিয়মের অধীনে কাজ করে, সদস্যরা অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে এবং বিভিন্ন স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এটি একটি কর্মপরিবেশ তৈরি করে যেখানে ছোট ছোট বিষয়ে দ্রুততার সঙ্গে একমত হতে পারে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থানীয় পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া হয়। টেকসই উন্নয়নকে একটি সর্বাঙ্গীণ এবং ন্যায়সংগত মান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান প্রদানের চেষ্টা করে। ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের শক্তিশালী চালক বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর (বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশের বেশি) জীবন ও জীবিকার গুণগত পরিবর্তন আনার স্বার্থে স্থানীয় শাসনের মাধ্যমে এসডিজির স্থানীয়করণ অপরিহার্য। কভিড-১৯ মহামারী আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বপ্রথমে নাগরিকদের জীবন উন্নত করার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। একটি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ প্রকল্পের সাফল্যের সম্ভাবনাকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে।
সর্বশেষ স্থানীয় সরকার (ইউপি) আইন ২০০৯, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। স্থানীয় সরকার (ইউপি) আইন ২০০৯ অনুসারে, উন্নত শাসন ও পরিষেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিষদকে সমর্থন করার জন্য ইউপিতে ১৩টি স্থায়ী কমিটির একটি বিধান রয়েছে। আইন অনুসারে, প্রতিটি ইউপির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, সমাজকল্যাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি, মৎস্য ও পশুসম্পদের মতো বিভিন্ন বিষয়ে কমপক্ষে ১৩টি স্থায়ী কমিটি গঠন করার কথা। পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য, সামাজিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি এবং ওই এলাকার নারী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত স্থায়ী কমিটি ইউপিকে উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহায়তা করার জন্য
দায়বদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, স্থায়ী কমিটি সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং গভর্নিং বডিগুলোর কাজকর্মের ওপর নজরদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় প্রদর্শন করে। এ স্থায়ী কমিটিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ পরিষদে সক্রিয় নয়। কারণ নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য সদস্যরা এর কাজ এবং এখতিয়ার সম্পর্কে সঠিকভাবে সচেতন নন, কাজের
ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী নন।
স্থায়ী কমিটির এ মন্থর কার্যক্রমের পেছনে সক্রিয় কারণগুলো চিহ্নিত করলে দেখা যায় যে, ইউপি সদস্যদের উদ্যোগের অভাব, সাধারণ মানুষের চাপের অভাব, রাজনৈতিক চাপের অভাব, উন্নয়ন কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব। স্থায়ী কমিটি পদ্ধতির সারমর্ম এখনো স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ সদস্যের কাছে অপ্রকাশিত। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কোরাম কার্যক্রম পরিচালনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনে সদস্যদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক না হওয়ায় স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ সদস্যই বৈঠকে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। বিপরীতে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি কাগজে-কলমে রয়ে গেছে, কারণ চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য সদস্য পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে প্রশিক্ষিত নন। অন্যদিকে সদস্য সচিবের অনীহাও কমিটির কার্যকারিতা দুর্বল করার প্রধান কারণ হিসেবে বেরিয়ে এসেছে।
বিকেন্দ্রীকরণের প্রবক্তারা যুক্তি দেন, ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার আইনের বিধানটি মহিলাদের জন্য তাদের স্বার্থ প্রকাশ করার, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রবেশ করার এবং মহিলাদের স্বার্থকে এগিয়ে নেয়ার পথ খুলে দেয়। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে মূলধারায় আনতে এ আইনের বিধানে বলা হয়েছে, ১৭টি কমিটি উপজেলা পরিষদের দুই ভাইস চেয়ারপারসন (পুরুষ ও মহিলা) দ্বারা সভাপতিত্ব করতে হবে। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণের কাঠামোগত কাঠামো তৈরি করে
দিচ্ছে। এটি স্থানীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে নারীদের নিয়ে আসার এবং তৃণমূল পর্যায়ের নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার সুযোগও দিয়েছে। মহিলা ভাইস চেয়ারদের কেউই পরিষদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের অসন্তোষ বা মতানৈক্য প্রকাশ করেননি, যা এ সত্যের ইঙ্গিত দেয় যে শাসনের সব স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগুলোয় নারীদের কম প্রতিনিধিত্ব করা হয়।
অংশগ্রহণমূলক তৃণমূল স্থানীয় সরকার এসডিজি, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক এলাকায় প্রদানের জন্য অপরিহার্য। স্থানীয় সরকার শুধু মৌলিক পরিষেবাগুলোর
প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে না বরং দরিদ্র, কৃষক, শ্রমিক এবং নারীদের তাদের জন্য গৃহীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য একটি কার্যকর প্লাটফর্ম দেয়। গ্রামীণ বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করাই সম্ভবত সরকারের নীতিগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং বর্ধিত সমৃদ্ধিতে অনুবাদ করার একমাত্র কার্যকর সমাধান। বৈশ্বিক এজেন্ডাগুলোকে স্থানীয়করণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টা ক্রমে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত হচ্ছে।
আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এসডিজির বিপরীতে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট
গোল (এমডিজি) বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল তৃণমূল পরামর্শ ও সমর্থনের প্রাথমিক অভাব। তাই স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
নাজমুন নাহার: উন্নয়ন কর্মী
ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন
(আইডিএফ)










