বিদ্যুৎ উৎপাদন, আবাসিক, সিএনজিচালিত পরিবহন ও শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহৃত হয়। স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা দেশের অনেক গ্যাসকূপের উৎপাদন হার কমে গেছে। ফলে গ্যাসের চাহিদার ঘাটতি মেটাতে পেট্রোবাংলাকে আমদানীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়াতে হচ্ছে। দেশের বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এলএনজি-নির্ভরতা এরই মধ্যে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি)-২০২৩-এর প্রাক্কলন অনুসারে, ২০৩০ সাল নাগাদ গ্যাসের চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার হার দাঁড়াবে ৬৮ শতাংশে, যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এলএনজি একটি সহজে পরিবহনযোগ্য উচ্চ মূল্যের জ্বালানি, যা শিল্পোন্নত অথচ নিজস্ব জ্বালানি নেই এমন দেশগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। কিন্তু আমাদের মতো দেশের জন্য এ উচ্চ মূল্যের এলএনজির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কেননা এটি ব্যয়বহুল ও উচ্চ মূল্যের জ্বালানি। আর বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যটির মূল্য অস্থিতিশীল হলে বা ডলার সংকটের মুখে আমদানি করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হবে পেট্রোবাংলাকে। যদিও এরই মধ্যে সংস্থাটি বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এছাড়া উচ্চ মূল্য, টার্মিনাল বিকল বা বন্ধ হয়ে পড়া, পাইপলাইনে ত্রুটি অথবা দুর্যোগের সময় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হলেও দেশে গ্যাসের বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিচ্ছে। গত দুই-আড়াই বছরে বেশ কয়েকবার এমন বড় ধরনের সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এতসব ঝুঁকির মধ্যেও সংস্থাটি এলএনজি আমদানিনির্ভরতা বাড়াচ্ছে, যা মোটেই স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। তাই দেশীয় গ্যাস উত্তোলন ও উদ্ভাবনে সংস্থাটির গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।  

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ৩১০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ভাসমান দুটি টার্মিনালে রিগ্যাসিফিকেশনের মাধ্যমে দৈনিক এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। এ অনুযায়ী জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের মোট সরবরাহ সক্ষমতায় এলএনজির অংশ ৩০ শতাংশের বেশি। আইইপিএমপি-২০২৩ এও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় আমদানীকৃত এলএনজির নির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে সব খাতেই অস্থিরতা বাড়বে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে গ্যাসের চাহিদা তৈরি হবে দৈনিক ৬২৪ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে স্থানীয় গ্যাস ক্ষেত্র থেকে পাওয়া যাবে প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। বাকি ৪২৪ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করতে হবে। আইইপিএমপিতে প্রাক্কলিত এসব হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের গ্যাস খাতে চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার হার হবে ৬৮ শতাংশ। 

বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে দুটি ভাসমান—এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিটের—এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। বিদ্যমান দুটির সক্ষমতা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ১২৬ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করতে চায় সরকার। এছাড়া মহেশখালী ও পায়রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার আরো দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ীতে ভূমিতে স্থাপিত (ল্যান্ডবেজ) ১০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ সক্ষমতার আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ এসব টার্মিনাল উৎপাদনে আসতে পারে। 

আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন ও দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই দাম বেড়ে রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ ছিল, নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এলএনজি, জ্বালানি তেল প্রভৃতির বাজার অস্থিতিশীল। এর দাম দ্রুত ওঠানামা করে। এছাড়া এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যায়। যা সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব রাখে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাসের সরবরাহ। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান আসায় স্বল্প মূল্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে এটি প্রদান করা গেছে। এতে স্বল্প মূল্যে পণ্য উৎপাদন করা গেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

সমন্বিত মহাপরিকল্পনায় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বড় অংশই আমদানীকৃত এলএনজিকে ঘিরে। এর ওপর অধিক নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। কোনো কারণে এলএনজির বৈশ্বিক সংকট কিংবা অর্থ সংকটে পণ্যটি কেনা সম্ভব না হলে দেশের পুরো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকেই বড় ঝুঁকিতে ফেলবে। ফলে দেশের সব খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কোনো কারণে এলএনজির একটি লাইন কিংবা একটি ভাসমান টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্যটি দিয়ে গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখার মতো পেট্রোবাংলার সক্ষমতা আছে কিনা তা যাচাই করা দরকার। কেননা এটি করতে গেলে বিপুল অর্থ দরকার। এছাড়া এরই মধ্যে অনেক পাইপলাইন পুরনো হয়ে গেছে। সেগুলো সংস্কারের জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ। যদিও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঝুঁকি মোকাবেলা করার মতো পেট্রোবাংলার আর্থিক সংক্ষমতা নেই। তাই সবকিছু বিবেচনা করেই সামনে এগোনো উচিত।  

সার্বিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা উচ্চাভিলাষী ও বাস্তববিমুখ পরিকল্পনা। আমরা এখনো প্রাথমিক জ্বালানির বিষয়টি নিয়ে একটা পরিপূর্ণ সমাধানে আসতে পারিনি। অথচ এর সমাধানও রয়েছে। দেশীয় যেসব গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদনে আমরা কম গুরুত্ব দিচ্ছি। গোষ্ঠী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রাধান্য দিতে গিয়ে জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানের পথগুলো বাস্তবায়ন করতে পারছি না। অথচ এর খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর এ মহাপরিকল্পনা সংশোধনপূর্বক দেশীয় উৎসনির্ভর করা প্রয়োজন। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন।