সুজাউল ইসলাম খান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। এছাড়া তিনি স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) পরিবেশ ও নগরায়ণ সম্পাদক। বুয়েট থেকে স্থাপত্যে স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইস থেকে স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর সনদ লাভ করেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি স্থাপত্য পেশায়ও নিয়োজিত আছেন। ঢাকার স্থাপত্যের ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব এবং ড্যাপের নানা আঙ্গিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন
এল নিনোর প্রভাবে নগর উষ্ণতা বাড়ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও বাসস্থানের কারণে ঢাকার বাসযোগ্যতা তলানিতে। সামগ্রিক বিবেচনায় ঢাকার স্থাপত্য কাঠামো এখন কোন জায়গায় এসে পৌঁছেছে?
এখানে দুটি বিষয় আছে। একটি হলো হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট। গত কয়েক বছরে শহরের প্রচুর গাছ কেটে ফেলা হয়েছে এবং জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। বেশির ভাগ ভূভাগ এসফল্ট এবং কংক্রিটে আচ্ছাদিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে যেটা হয়েছে, সূর্যের তাপ সরাসরি এসে এসব কঠিন সারফেসে পড়ছে এবং সেখানে জমা হচ্ছে। রাতে ধীরে ধীরে সেটা রিলিজ হচ্ছে। যার কারণে সিটি গরম থাকছে। ঢাকার চারপাশের গ্রামে বা শহরের মধ্যেই বড় বৃক্ষশোভিত এলাকা যেমন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেলে দেখবেন তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রি কম। এ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্বিতীয় বিষয়টি—হিট স্ট্রেসড এনভায়রনমেন্ট। যাকে আমরা তাপপ্রবাহ-পীড়িত প্রতিবেশ বলতে পারি। কোনো স্থানের তাপমাত্রা দীর্ঘসময় ধরে মানবদেহের ত্বকের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির বেশি থাকলে সেটাকে বলা হয় হিট স্ট্রেসড এনভায়রনমেন্ট। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের কষ্টও কিন্তু বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকার ৭০ শতাংশ মানুষ একতলা টিনশেডের বাড়িতে থাকেন। আমি দেখেছি, বস্তিগুলোর আনুমানিক ৫০ শতাংশ ঘরে কোনো জানালা নেই, শুধু দরজা। ওইখানে একজন বয়স্ক মানুষ, নারী, শিশু এরা কীভাবে থাকেন ভাবতে পারেন? তাপপ্রবাহ এবং আরবান হিট আইল্যান্ডের কারণে বাড়ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার। গরমের দিনে দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধেক ব্যবহার হয় ঢাকায়। এ বিদ্যুতের সিংহভাগ উৎপাদন হচ্ছে অনবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। দেশে প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদা। এতে ভবনের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা কমলেও এ যন্ত্রের নির্গত গরম হাওয়া বাড়িয়ে দিচ্ছে শহরের তাপমাত্রা। অথচ ঢাকা একটা দারুণ ট্রপিক্যাল শহর ছিল। প্রচুর গাছপালা ছিল। প্রচুর ওয়েটল্যান্ড (জলাভূমি) ছিল। ওই জলাভূমি ও গাছপালাই শহরের তাপমাত্রা কমিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমরা সেখান থেকে সরে আসছি। এসব নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।
এজন্য করণীয় কী?
প্রথম পদক্ষেপ হলো শহরে নতুন গাছপালা রোপণ, পুরনো গাছগুলোর পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট এ বিষয়ে সঠিক নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়ার অংশীজন হিসেবে কাজ করছে। ভবনের দেয়ালে ইট বা কংক্রিটের স্থলে যখন কাচ ব্যবহার হচ্ছে, তখন সূর্যের তাপ এক ভবন থেকে প্রতিফলিত হয়ে আশপাশের অন্য ভবন এবং স্থানে পড়ছে। এতে গরম আরো বেড়ে যাচ্ছে। আপনি যদি খুব গরমের দিনে গুলশান দুই থেকে এক নম্বর যান বা বনানীতে যান, দেখবেন যেখানে সড়কের দুই পাশের ভবনগুলোর মূল উপকরণ কাচ, সেখানে গরমের তীব্রতা অনেক বেশি। এ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা দরকার, দরকার যথাযথ নীতিমালা এবং সুপারিশমালা, যা তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমরা অচিরেই একটি গ্রিন ডিজাইন গাইডলাইন তৈরি করব। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এখন সব দেশ চেষ্টা করছে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে। বিশ্বের সব দেশ চেষ্টা করছে কার্বনশূন্য উন্নয়নের সড়কে ওঠার।
কার্বনশূন্য উন্নয়নের সঙ্গে ভবনের কী সম্পর্ক?
একটি ভবন নির্মাণ করার সময় যে উপকরণগুলো ব্যবহার করা হয়—যেমন সিমেন্ট, বালি, পাথর, স্টিল, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম—সেগুলো উৎপাদন করার সময় কার্বন নিঃসরণ হয়। একে বলে এমবডিড কার্বন। আর ভবন তৈরির পর সেগুলোয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানোর জন্য যে শক্তির দরকার, তা থেকে তৈরি হয় অপারেশনাল কার্বন। অনবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন ডিজেল, পেট্রল, কয়লা না পুড়িয়ে নবায়নযোগ্য উৎস যেমন বায়ুপ্রবাহ, সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। এমন উপকরণ দিয়ে ভবন নির্মাণ করতে হবে যেন তার জীবন চক্র শেষ হওয়ার পর পুনর্ব্যবহার করা যায়। আমাদের মতো ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশের স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এখানে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার করে ভবন নির্মাণ সম্ভব, যদি সঠিকভাবে ডিজাইন করা হয়। এখন ভবন তৈরির সময় কেউ দুই ভবনের মাঝখানে আলো-বাতাসের জন্য জায়গা বা সেটব্যাক ছাড়ছেন না। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ঘরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে, পাখা চলছে। আমি বলি, ভাই! আপনার ঘরে তো সূর্যের আলো বা বাতাস কিছুই ঢুকছে না। জবাবে বাড়িওয়ালা বলেন, তাতে কী? আমি তো লাইট জ্বালিয়ে রাখছি। এটা যে স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ সেটা কেউই বিবেচনায় নিচ্ছি কি? আমরা করোনার সময় দেখেছি ঘরে আলো-বাতাস না থাকা, সূর্যের আলো গায়ে না মাখা ইত্যাদি স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভয়ংকর। এখন সমস্যা হচ্ছে, সবাই যদি চিন্তা করি যে আমার শুধু ঘরের ভেতর বড় জায়গা দরকার, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের দরকার নেই, বৈদ্যুতিক আলো, পাখা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দিয়ে কাজ চালিয়ে নেব, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ।
ড্যাপ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাচ্ছি।
আমি মনে করি, ড্যাপ খুব ইতিবাচক উদ্যোগ। এখানে অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তাভাবনা আছে, যেটা এর আগে সরকার বিবেচনায় নেননি। নগর পরিকল্পনার লক্ষ্য কি সেটার ওপর নির্ভর করছে পরিকল্পনার কৌশল। ঢাকায় ১৯৯০ সালের দিকে নগর পরিকল্পনার উদ্যোগ নেয়া হলো, প্রথমে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫), তার ধারাবাহিকতায় আরবান এরিয়া প্ল্যান (১৯৯৫-২০০৫), শেষ ধাপে ২০১০ সালে এসেছে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এটার মেয়াদ ছিল। নগর পরিকল্পনা সাধারণত তিন স্তরবিশিষ্ট হয়। প্রথম স্তর হচ্ছে পরিকল্পনার কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ। কীভাবে কী নিয়ে কী কারণে কী লক্ষ্য নিয়ে কোন অঞ্চলে পরিকল্পনা করবেন এটার নীতিমালা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, আরবান এরিয়া প্ল্যান থাকবে। ওই পলিসিগুলো আপনি বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন সেটা সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। তৃতীয় পর্বে প্রভাবগত দিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশদ পরিকল্পনা করে দিতে হবে। ড্যাপে ঢাকার ক্ষেত্রে বলা যায়, পুরো শহরের যেমন বিশদ পরিকল্পনা দরকার নেই, তেমনি এত বড় একটা অঞ্চলেরও নগরায়ণ করার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়গুলো আমরা সরকারকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। ড্যাপ অবশ্যই একটা ভালো উদ্যোগ। এটার লক্ষ্য অনেকটা উচ্চাভিলাষী, এর বেশকিছু আইডিয়া খুবই ভালো। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশকিছু সমস্যা আছে। আমরা স্থপতিরা, পরিকল্পনাবিদসহ যত অংশীজন আছি সবাই একসঙ্গে বসে ঠিক করা দরকার। নগর পরিকল্পনার একটা বড় বিষয় হচ্ছে, পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটা চলমান রাখা। কারণ পরিকল্পনা একটা চলমান বিষয়। দেশের যেমন পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অব্যাহতভাবে পর্যবেক্ষণ করছে—যে পরিকল্পনা নেয়া হলো সেটার বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে? না হলে কেন হয়নি? পরিকল্পনার অধীনের প্রকল্পগুলোর কী অবস্থা? কেন হচ্ছে? কেন হচ্ছে না? বাজেটের কী অবস্থা? যদি না হয় তাহলে আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনা কী? কী কী পরিবর্তন সামনে আসছে? অর্থাৎ একটা বিশাল মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়ন, পরিকল্পনা কৌশল নির্ধারণ, তদারকি এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অতিনিবিড়ভাবে জড়িত। এ ধরনের একটা ব্যবস্থাপনা কাঠামো সারা দেশের স্থানিক পরিকল্পনার জন্যও প্রয়োজন। আমাদের দেশের জনঘনত্ব বিশ্বে কৃষিভিত্তিক দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের কর্মসংস্থান কৃষি খাতে। এ দেশের ভূমিতে বিশ্বের সেরা কৃষিপণ্য উৎপাদন সম্ভব। টেকসই উন্নয়নের জন্য পুরো দেশকে শিল্পায়নের পাশাপাশি কৃষি খাতের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে, আবার বদ্বীপের স্বাভাবিক বন্যা, জল দুর্যোগ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মাথায় নিয়েই ঢাকাসহ সারা দেশের পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সব অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ঢাকা অতিদ্রুত বর্ধনশীল ও পরিবর্তনশীল একটা শহর। নতুন নতুন পরিস্থিতি আসতে থাকবে, সেগুলোকে মোকাবেলা করতে হবে। একটু আগে আমরা হিট স্ট্রেসড এনভায়রনমেন্টের কথা বলেছি, এখন তাহলে কী করা উচিত? ড্যাপ প্রণয়নের সময় কিন্তু এ সমস্যা ছিল না। এখন তো এটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এটাকে এখন পরিকল্পনার অংশ করে নিতে হবে। ড্যাপের অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে শহরের অর্থনীতির বাস্তবতা এবং গতিপ্রকৃতিকে কাজে না লাগানো এবং প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার সঙ্গে না রাখায় এর প্রতিক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা। এর সমাধান কী?
অন্য শহরগুলোয় ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া ঢাকার জনসংখ্যা কমানো সম্ভব নয়। ঢাকার বিশাল সুবিধা হলো যে এটা দেশের কেন্দ্রে, দেশের সব এলাকার সঙ্গে এর যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো। বিদ্যমান রেলপথগুলোয় যদি দ্রুতগামী বিদ্যুৎচালিত ট্রেন সার্ভিস চালুর মাধ্যমে দূরের জেলা থেকে অল্প সময়ে ঢাকায় আসার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে এমনিতেই ঢাকার জনসংখ্যা কমে যাবে। মানুষ ভালো পরিবেশে থাকতে চায়। ঢাকার বাইরে অনেক শহরে উন্নত মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো মানসম্মত। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে এমন জেলা শহরে পরিবার রেখে ঢাকায় অল্প সময়ে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করলে বহু নাগরিক তা নিতে চাইবেন। যেমন ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার, যশোর ১৩৬ কিলোমিটার। এক-দেড় ঘণ্টার জার্নিতে যদি ঢাকা আসা সম্ভব হয় মানুষ তাহলে স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঢাকায় থাকবে কেন? কেন মানুষ অনেক বেশি টাকা ভাড়ার পেছনে খরচ করে দূষিত বায়ুর শহরে থাকবে? মানুষ ঢাকায় এসে কাজ শেষে আবার চলে যেতে পারবে। এমনিতেও তো ঢাকায় এক-দেড় ঘণ্টার নিচে কোথাও যাওয়া যায় না। মনে রাখতে হবে, সমস্যা ঢাকার হলেও সমাধান কিন্তু ঢাকার বাইরে গিয়ে খুঁজতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া ঢাকায় এ জনসমুদ্রের চাপ থামানো যাবে না। কলকাতা সবচেয়ে ভালো উদাহরণ আমাদের জন্য। রেল যোগাযোগের মাধ্যমে কলকাতা বিকেন্দ্রীকরণ করে ফেলেছে প্রায় পুরো পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতা পারলে আমরা কেন পারব না? আমরা সব অবকাঠামো ঢাকায় করতে চাচ্ছি। আমাদের আসলে সারা দেশের জন্য একটা স্থানিক পরিকল্পনা করতে হবে।
যানজট নিরসনে এক্সপ্রেসওয়ে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন?
এক্সপ্রেসওয়েতে বাস সার্ভিস দেয়া একটি ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। এক্সপ্রেসওয়ে বা মেট্রোরেল অনেকটা বিদেশী শিশুকে হঠাৎ করে দত্তক নেয়ার মতো ঘটনা। বাংলাও জানে না, ভাতও খেতে পারে না। আপনি কী বলেন এটাও বোঝে না। তো এটাকে আপনার ভাষা বোঝাতে হবে, এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বোঝাতে হবে। এখানে বাস সার্ভিসের সঙ্গে লিংক করতে হবে। মেট্রো স্টেশনের কাছের এলাকাগুলোর ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় মিশ্র ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবেই এ নতুন সংযোগ ব্যবস্থা বা কানেক্টিভিটি শহরের কাজে দেবে। এ ধরনের যেকোনো একটা অবকাঠামোর পুরো সুবিধা পেতে সময় লাগবে। মেট্রোরেল নিয়ে আমরা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বেশকিছু প্রকল্প করেছি। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও হয়েছে। মেট্রো কীভাবে সিটির মানুষকে আরো বেশি সুবিধা দেবে এটা নিয়ে এসব প্রকল্প। মেট্রোতে এখনই ভালোই ভিড় হয়। মতিঝিল পর্যন্ত যখন খুলে দেবে তখন ৫ মিনিট পরপর ট্রেন দিতে হবে। নতুন কানেক্টিভিটি, মোবিলিটি এটার সঙ্গে শহরকে সমন্বিত করতে অন্তত পাঁচ বছর সময় দিতে হবে।
ড্যাপের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে ‘স্কাই ইজ দ্য লিমিট’। আকাশ অসীম এ কথাটি সঠিক?
আকাশ অসীম, এদিকে ভবনগুলো জমি থেকে শুরু হয়, জমি আবার সীমিত! তাই এটা মোটেও সঠিক কথা নয়। এটা কোন জায়গার জন্য বলছেন বা কোন শহরের জন্য বলছেন সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। আপনি কি ঢাকার ভবনের মডেল হিসেবে হংকংকে বিবেচনায় নেবেন? সেখানে তো ৬০ তলা, ১০০ তলা ভবন আছে। সেটা কি মডেল হতে পারে? হংকংয়ে তো ৪০০ স্কয়ারফিটের মধ্যে ১০ জন মানুষ থাকে এমন নজিরও আছে বহু। এটা কি স্বাস্থ্যকর? ঢাকায় কি সে রকম খাঁচার মতো বাসা বানানো হবে? ঢাকার আবাসন হবে মানুষের সামর্থ্য, লাইফস্টাইল, রুচি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, সামাজিক অবকাঠামোর প্রতুলতা এসব বিবেচনায় নিয়ে। এখানে বিবেচনা করতে হবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ধারণক্ষমতা নিয়ে। ভবনগুলো কি আবাসিক, না মিশ্র ব্যবহারের জন্য? যাতায়াতের অবকাঠামো কেমন? পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা কী? আসলে দরকার ভালো ব্যবস্থাপনা, জমির দক্ষ ব্যবহার, রেজিলিয়েন্স বা দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা। এসব বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ ডিজাইন করার বহু উদাহরণ দেশেই আছে, বিদেশে তো বলাই বাহুল্য। ঢাকায় যদি সামাজিক অবকাঠামো যেমন খেলাধুলার স্থান, মাঠ, পার্ক, লাইব্রেরি, হাঁটা-চলার জন্য পর্যাপ্ত পরিসর ইত্যাদি যথেষ্ট থাকত, তাহলে বহু মানুষ আরো ছোট ফ্ল্যাটে থাকতে পারত স্বাচ্ছন্দ্যে। ঢাকার আরো এক বিশাল সমস্যা হোস্টেল, মেস, ছোট ফ্ল্যাটের সংকট। এতে প্রচুর অর্থেরও অপচয় ঘটছে। ঢাকার ৭০ শতাংশ ভবন একতলা বা দোতলা, বহু পুরনো ভবন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। এ ভবনগুলো যদি তিন বা চার তলায় রূপান্তরিত করা হয় তাহলে তো ঢাকায় মানুষের আবাসন সমস্যা আর থাকে না। পাশাপাশি এটাও ভাবতে হবে যে শহরটা শুধু মানুষের জন্য কিনা! আসলে মহৎ শহরগুলো প্রকৃতি এবং মানব বসতের মধ্যে একটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে। প্রয়োজন আছে বলেই করে।










