আমাদের কৃষি খাত ও উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়ে কথা বলা দরকার। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশ কৃষি খাতে একটি ঈর্ষণীয় উন্নয়ন করেছে এবং সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত হয়েছে। একই পরিমাণ জমিতে আমরা কৃষি উৎপাদন করে আসছি। জমির পরিমাণ বাড়ছে না। এর কারণ এখানে সরকারের নীতিমালায় কিছু ইস্যু আছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যত্রতত্রভাবে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় কৃষকের যে জমি চাষ হওয়া প্রয়োজন, সেগুলো হচ্ছে না।
আমাদের জমি থাকলেও জমির মালিক যারা আছেন তারা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। ভূমি প্রশাসন আইন অনুসারে ইন্দোনেশিয়া ও অন্য দেশে যদি কৃষি খাতের জমি চাষাবাদ না করে কেউ রাখেন, তাহলে সরকার সেই সম্পত্তির দখল নিতে পারে এবং সেখানে কৃষিতে আমাদের দেশে এ ধরনের একটি আইন প্রয়োজন। আমরা সবসময় আলোচনার ভেতরে থাকি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের জন্য কোনো নীতিমালা গ্রহণ করি না। নীতিমালা গ্রহণ করার পর এর বাস্তবায়নও থাকতে হবে। যদি আইনকে কেউ না মানেন, তাহলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে। না হলে কিন্তু এর উন্নতি হবে না।
খাদ্য উৎপাদনে সারা পৃথিবীতে আমরা তৃতীয় স্থানে আছি এবং আমাদের প্রচুর সম্ভাবনা আছে। সারা পৃথিবীতে যুদ্ধে বিপর্যস্ত প্রাণ-প্রকৃতি। যেমন গাজাকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে প্রাণ-প্রকৃতির কোনো অস্তিত্ব নেই। যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে, সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে এবং মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সেখানে নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। ছড়িয়ে পড়া এসব ক্ষতিকর উপাদান শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। একইভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ২০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশেছে। ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম গম উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু যুদ্ধের কারণে গম উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
ফারাক্কায় ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের নদ-নদী সব শুকিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তাপমাত্রাও বাড়ছে। পদ্মাসংলগ্ন প্রায় ১২টি জেলায় যে পানি সরবরাহ হতো এখন তা আর হচ্ছে না। এ পানি যেখানে সরবরাহ হতো, সেগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রায় ৩৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর বিল, ৮৪ হাজার ৪৯৮টি পুকুর এবং ৬ লাখ ১০ হাজার ৭৬৭ হেক্টর প্লাবনভূমি পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এখানে একটি বিষয় বলা প্রয়োজন। যদিও এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়। সেটি হলো আমাদের নদীগুলো খনন করা প্রয়োজন। নদীগুলো খনন করা হলে পানির প্রবাহ বাড়বে। এভাবে আমাদের পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতিকে সমুন্নত রাখতে পারি। আগে সেচের সময় ডিজেল পাম্প দিয়ে সেচ কর্মকাণ্ড চালানো হতো। এখন ডিজেল পাম্পের পরিবর্তে সোলারের পাম্প ব্যবহার হচ্ছে। এতে কৃষি খাত পরিবেশবান্ধব হয়েছে। বর্তমানে সেচ কর্মকাণ্ডের অর্ধেকই সোলার পাম্পে রূপান্তর হয়েছে।
কৃষি খাতে ঋণ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও ব্যাংকগুলো তা যথাযথভাবে পালন করছে না। ফলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষি খাতে আমাদের উৎপাদন বাড়াতে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাকে উন্নতি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা এ খাতে ঋণের জন্য নির্ধারণ করে রাখলেও অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক তা মানছে না। সুদহারও অনেক বেশি। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে কীভাবে সাধারণ কৃষক আরো বেশি সুবিধা নিতে পারেন, সে বিষয়ে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিশেষায়িত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষায়িত নিয়ম থাকতে হবে। তা না হলে কৃষকের জন্য কৃষি খাতে অর্থায়ন করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। উচ্চ সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে কীভাবে সাধারণ কৃষক বা সব ধরনের কৃষিকাজে জড়িতরা সহজে প্রবেশাধিকার পাবে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। এগুলো লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক ঋণ প্রয়োজন। অর্থাৎ কোন খাতে কতটুকু ব্যবহার করতে হবে, বিশেষায়িত ব্যাংক কী করবে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কী করবে, সেগুলোর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেই তখন সেটা করা সম্ভব।
আরেকটি বিষয়ে বলা দরকার, উডেন পোল ব্যবহারের কারণে মাটিতে আর্সেনিক তৈরি হচ্ছে। এতে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষেরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। এসব বিষয়ে আগে কথা হয়েছিল এবং অনুসন্ধানও হয়েছিল কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সিসা, সালফার ও আর্সেনিক মাটিতে যাচ্ছে, সেগুলো আমাদের দেখতে হবে। এসব উপাদানের কারণে যাতে মাছ, শাক-সবজিসহ অন্যান্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। কৃষি খাত ন্যায্যতামূলক ভর্তুকি দেয়ার জন্য বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় স্বাক্ষরকারীরা চুক্তিবদ্ধ থাকলেও সেগুলো কেউ মানছে না। বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা পারস্পরিকভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা চুক্তিবদ্ধ হতে পারি। যাতে করে সবাই বাজারের একটা প্রবেশাধিকার পায় ও ন্যায্যতা সৃষ্টি করা হয়।
আজম জে চৌধুরী: চেয়ারম্যান, ইস্ট কোস্ট গ্রুপ
[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘কৃষি উৎপাদন ও প্রাণ-প্রকৃতি’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










