আপনি নির্বাচন সংস্কারবিষয়ক কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন, অনেক সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন। আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ব্যাপারে আপনি কতটুকু আশাবাদী?

আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচন করার ঐতিহ্য আছে। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যেমন ১৯৫৪ সালের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে মুসলিম লীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় এবং মুসলিম লীগ হেরে যায়। ওই নির্বাচনটি কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অধীনে হয়নি। তখন এ রকম আইনও ছিল না। নির্বাচনটা হয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং সেই নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি। তার মানে তখন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছিল ও ক্ষমতাসীনরা পরাজিত হয়েছে এবং কোনো রকম প্রশ্ন ওঠেনি। তাও ১৯৫৪ সালের কথা। কিন্তু এর পরে নির্বাচন কমিশনসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশসহ (আরপিও) নানা রকম আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও আমরা এখন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারছি না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুতর অবনতি ঘটেছে এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের সংস্কৃতি হারিয়ে গিয়েছিল।

সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ হয়, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং সাহসিকতার ও নিষ্ঠার সঙ্গে নির্ভয়ে আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম হয়। নির্বাচন কমিশনের পর গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো সরকার। সরকার মানে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব শর্ত।

নির্বাচন কমিশন গত কয়েকটি নির্বাচনে আস্থার প্রমাণ রাখতে পারেনি কেন?

গত ১৫-১৬ বছর সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার অন্যতম কারণ নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। এছাড়া ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে। তারা দলীয় বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থী। রাজনৈতিক দল যদি সদাচরণ না করে ও গণতান্ত্রিক আচরণ না করে নানাভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায় এবং তাদের প্রার্থীরাও যদি ছলেবলে, কলা-কৌশলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয় তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এ গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনগুলো যদি আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করে তাহলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

নির্বাচন সংস্কারের জন্য নির্বাচন সংস্কারবিষয়ক কমিশনের নেয়া প্রয়োজনীয় আশু সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে?

‘বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়।’ অন্তর্বর্তী এ সরকারের আমলে একটা নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। এ নির্বাচন কমিশনটা গঠিত হয়েছে আগের আইনের অধীনে, যা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তবে যাদের নিয়ে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে তারা ছিলেন নিরপেক্ষ ব্যক্তি। নির্বাচন কমিশন নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে, কিন্তু তাদের পক্ষপাতদুষ্টতার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত গুরুতর কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা কতটুকু সফল হবে সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কারণ তারা এখনো কোনো নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ পায়নি। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে আমরাও দেখছি। কিন্তু বাস্তবে তারা কতটুকু সফল হবে তা নির্বাচন আয়োজনের ওপর নির্ভর করবে। মানুষ রায় দিতে পারবে তারা সফল হয়েছে কিনা। সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে।

প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে এবং প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকও করেছে। এ ব্যাপারে কী বলবেন?

আমাদের দুর্ভাগ্য যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে। দলীয়করণের এ প্রক্রিয়া অনেকদিন আগে থেকে শুরু হয়েছে। তবে গত সরকারের আমলে এটা চরম আকার ধারণ করেছে। অবশ্য গত সরকারের আমলের অনুগত অনেকেই পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ আর চাকরিতে নেই। কিন্তু এখনো দলীয়করণের ভয়াবহ প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। এখন যাদেরই নিয়োগ দেয়া হয় তারা একেকজন একেক দলের বলে আমাদের প্রধান দলগুলো অভিযোগ করে, যদিও আমরা নিশ্চিত নই।

প্রধান বড় দুটি দল একে অন্যকে দোষারোপ করছে। একদল বলছে, প্রশাসন অন্য দলের কব্জায়। এর অবসান হওয়া দরকার। বর্তমান সরকার যেহেতু দলীয় সরকার নয়, আমি আশা করি, নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। তারা যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করেন তাহলে আবারো আমাদের নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত ১৫ বছরের নির্বাচনেও প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ন্যক্কারজনক পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেছে। সে সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ৫ আগস্টের ঘটনা ঘটত না। পক্ষপাতদুষ্টতা, দলীয়করণের অবসান হওয়া দরকার। তা না হলে কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এটা বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

জোটে থাকলেও নিজ প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান রেখে আরপিওর সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। এ অধ্যাদেশ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

এর পক্ষে যুক্তি আছে, বিপক্ষেও আছে। নিজ প্রতীকে নির্বাচন করার যুক্তি হলো আমরা যদি উদাহরণ হিসেবে ধরি যে একটা শিশু জন্মগ্রহণ করার পর তাকে যদি কোলে রাখা হয় এবং কোলে থেকে কখনো নামানো না হয় তাহলে সে কোনোদিন হামাগুড়ি দিতে শিখবে না। হাঁটতে শিখবে না। একটা নতুন দল সদ্যপ্রসূত শিশুর মতোই। দলটি যদি তার নিজের আইডেন্টিটির ভিত্তিতে নিজ প্রতীকে নির্বাচন না করে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে তাহলে কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। পাশাপাশি যদি আনুপাতিক পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ হয় এবং ছোট দলগুলো নিজের প্রতীকে নির্বাচন না করে তাহলে উচ্চকক্ষে হিস্যা থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ তাদের দল তো ভোটের হিসাবে থাকবে না। যেই দলের প্রতীক ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের প্রতীক থেকেই উচ্চকক্ষের আনুপাতিক হারে নেয়া হবে। সুতরাং ছোট দলগুলো এর মাধ্যমে এককভাবে নির্বাচন করে যদি নিম্নকক্ষে কোনো আসন নাও পায় কিন্তু উচ্চকক্ষে তাদের আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

আরেকটি ঝুঁকি হলো—বিএনপি তাদের নিজ দলের কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের কাউকে মনোনয়ন দিলে দলটির কোনো কোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারে বা বিদ্রোহী প্রার্থী হতে পারে। এতে ছোট দলগুলো নির্বাচন করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের হয়তো জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

প্রার্থিতা ঘোষণাসহ এখন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনমুখী হয়েছে। ফলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা কমে গেছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তের এ সময়টা জুলাই সনদ কি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে?

না। এটা আলোচনায় নেই সত্য, এটা কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। সরকার তো দলগুলোকে সাতদিন সময় বেঁধে দিয়েছে। এরই মধ্যে সময় ফুরিয়ে গেছে। সরকারকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার যখন সিদ্ধান্ত নেবে তখন আবার আলোচনায় আসবে। কারণ জুলাই জাতীয় সনদের উদ্দেশ্য হলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে কতগুলো মৌলিক সংস্কার করা। এ সংস্কারগুলোর মধ্য দিয়ে বিরাজমান স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কাঠামোটা ভাঙা।

কতগুলো মৌলিক সংস্কারের লক্ষ্যেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে এবং আমরা ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছি। যেহেতু বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি, সেজন্যই আমরা তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই সুপারিশ করেছি। বাস্তবায়নের একটা বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেটা হলো গণভোট।

এখন সরকার আবার দলগুলোকে সময় দিয়েছে। এখন দেখতে হবে তারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারে কিনা। দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারুক বা না পারুক, যেটাই হোক সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তখন আবার এ আলোচনা ফিরে আসবে। আমি নিশ্চিত।

সেক্ষেত্রে গণভোট কবে হবে সেই ঘোষণা দ্রুতই সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হবে?

আমি মনে করি, গণভোটের ব্যাপারে ঐকমত্য আছে। সবাই গণভোটের ব্যাপারে রাজি হয়েছে। গণভোট হবে। আর তারিখের ব্যাপারে তাদের দ্বিমত আছে। কয়েকটা দল তা জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে চাচ্ছে। আর কয়েকটা দল চাচ্ছে নির্বাচনের আগে। এখন সরকার তাদেরকে সুযোগ দিয়েছে তারা যেন আলাপ-আলোচনা করে একটা ঐকমত্যে পৌঁছায়। তা না হলে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্য কমিশন তার সুপারিশে প্রস্তাব করেছে, পরবর্তী সংসদে ২৭০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ অনুমোদিত না হলে অটো অনুমোদিত হয়ে যাবে। এ নিয়ে বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো আপত্তি জানাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই।

এ রকম দৃষ্টান্ত অনেক দেশে আছে। গণভোটে যদি কোনো কিছু গৃহীত হয়, তার মানে হলো মালিক যখন সম্মতি দেয় তখন এগুলো বাধ্যতামূলক হয়; যেহেতু জনগণই মালিক। অনেক চিন্তাভাবনা করে, বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে, অনেক দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা এ সুপারিশ করেছি। সরকারের কাছে আমরা দুটো সুপারিশ করেছি—একটা বাধ্যতামূলক অন্যটা বাধ্যতামূলক নয়।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করার কথা নির্বাচন কমিশন বলেছে। এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুডে চলে আসার কথা রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

আমার ধারণা, তাদের যেটা বক্তব্য তা হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব সাধারণত রুটিন কাজগুলো করা। তারা কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার না। তাই তারা যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তারা নিচ্ছেও।

তারা যেটা বলার চেষ্টা করছে—আমি জানি না এটা কতটুকু প্রযোজ্য। তারা মনে করছে এ সরকার এমন একটা সরকারে পরিণত হোক যারা শুধু নির্বাচনের ব্যাপারেই ভূমিকা রাখবে, অন্যান্য বিষয়ে নয়। কিন্তু আমাদের তো অনেকগুলো সিদ্ধান্ত এ সরকার নিয়ে আসছে। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো এ সরকার তো তিন মাসের নয় যে কেবল রুটিন কাজ করবে।

চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের রাজনীতির ক্যানভাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেক প্রাণহানি ঘটেছে, অনেক লোক আহত হয়েছে, অনেক রকম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে এ সরকারকে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হবে নির্বাচনের দিন না আসা পর্যন্ত। অবশ্য তাদের আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আমি নিশ্চিত তারা নির্বাচনের ব্যাপারে মনোযোগ দিচ্ছে। এটা যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার, সেহেতু এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ভূমিকা তা বোধহয় এখানে প্রযোজ্য নয়। তফসিল ঘোষণার পরও সরকারকে অবশ্যই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও তফসিল ঘোষণা হলে অনেক কিছু নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে চলে যাবে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ অন্যদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারকে সফল মনে করেন?

এটা বলা দুরূহ। অতীতে আমরা প্রতিবেশী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতাম। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তাদের বিরাট ভূমিকা ছিল। আমাদের সে রকম স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল না। এ সরকার চেষ্টা করছে কিন্তু প্রতিবেশীরা বিরূপ। তাদের পক্ষ থেকে আমরা যেটা লক্ষ করছি নাগরিক হিসেবে তা হলো—সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এ সরকারকে সাহায্য তো করছেই না, বরং সরকারের সঙ্গে শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করছে। এটা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি। তাছাড়া এ সরকার তো হঠাৎ করে এসেছে। আমাদের প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই অনেক বিচ্যুতি (ডিজলোকেশন) ঘটেছে। ব্যাপক টালমাটাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিন তো সরকার-ই ছিল না। এগুলো কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। আমি আশা করি পরবর্তী নির্বাচিত সরকার আরো ভালো করবে, আমাদের সবার স্বার্থে।

সেক্ষেত্রে আসন্ন নির্বাচনে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্যান্য রাষ্ট্রের কী ধরনের প্রভাব থাকতে পারে?

এটা বলাও দুরূহ। সর্বশেষ নির্বাচনে তো অভিনন্দন জানানোর ক্ষেত্রে দুই রাষ্ট্র প্রতিযোগিতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম ছিল। তাই আমরা আশা করি, অন্তত ওই দুটো রাষ্ট্র নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে কিংবা সহায়তা করার চেষ্টা করবে। সেইসঙ্গে এটিও আশা করি, ভারত আমাদের সবার স্বার্থে ও নিজেদের স্বার্থে সরকারকে সহায়তা করবে যাতে একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় এবং আমরা এগিয়ে যেতে পারি। বাংলাদেশে যদি একটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করে, বাংলাদেশ যদি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য যেমন ইতিবাচক, ভারতের জন্যও ইতিবাচক। আমরা প্রতিবেশী হওয়ায় বাংলাদেশে যা কিছু ঘটে তার প্রভাব ভারতে পড়ে এবং ভারতে যা কিছু ঘটে তার প্রভাবও আমাদের ওপর পড়ে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন চ্যালেঞ্জ করে আপনি রিট আবেদন করেন। কিন্তু ২০০৬ সালে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল সেটি দুই বছর দীর্ঘায়িত হয়ে যায় এবং সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপ নেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর যে নির্ভরশীলতা সেখানে সমাধান খোঁজাটা কতটুকু কার্যকর?

আমি তো বলছি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারটা নির্বাচনের সময় একটি নির্দলীয় সরকারের কাঠামো। এখন এ নির্দলীয় সরকারটাকে যদি আমরা বিভিন্নভাবে অকার্যকর করে ফেলি, প্রভাবিত করে ফেলি কিংবা প্রভাবিত করার চেষ্টা করি তাহলে কিন্তু এটা কাজ করবে না। অতএব এটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আমাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

অনেক দেশেই তো নির্বাচিত যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। কিন্তু আমাদের এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেও সেটাকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। আমি আশা করি, এসব থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করব এবং ভবিষ্যতে এসব কর্ম থেকে বিরত থাকব। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো ব্যবস্থা রেখে যেতে পারি।

আগামী নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই হবে নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার তৈরির করার কোনো সম্ভাবনা আছে?

তত্ত্বাবধায়ক নয়, আমি নিশ্চিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।