পেশাগত জীবনের সমাপ্তিতে পেনশন প্রাপ্তি আর্থিক নিরাপত্তার অবলম্বন হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীরা এ সুবিধা পেলেও যারা বেসরকারি চাকরি করেন, তারা এমন সুবিধা পান না। এছাড়া যারা স্বল্প আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তারাও কর্মজীবন শেষে আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এর ফলে যে সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয় তা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হবে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। যদিও সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার গেজেট গত রোববার জারি হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে এ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। আপাতত চার শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর জন্য চার ধরনের পেনশন কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। সেগুলো হলো প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাসী। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য ‘প্রগতি’, স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য ‘সুরক্ষা’, প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য ‘প্রবাসী’ ও দেশের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ‘সমতা’ স্কিম। তবে চাঁদাদাতা যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে স্কিম পরিবর্তন করতে পারবেন।
পেনশন কর্মসূচি বা স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হলে ৬০ বছর বয়সের পর থেকে আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন একজন চাঁদাদাতা। তবে চাঁদাদাতা মারা গেলে তার নমিনি বা উত্তরাধিকারী পেনশন পাবেন। তবে এক্ষেত্রে চাঁদাদাতার ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত হতে যত বছর বাকি থাকত, সেই সময় পর্যন্ত নমিনি পেনশন উত্তোলন করতে পারবেন।
এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে এরই মধ্যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা জারি করা হয়েছে, গঠন করা হয়েছে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ‘ইউপেনশন’ নামক ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়েছে। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে কেউ পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেককে একটি ইউনিক আইডি নম্বর দেয়া হবে।
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে দেশের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সব নাগরিকই এ ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন এবং ৬০ বছর বয়স থেকে তারা আজীবন পেনশন পাবেন। শুরুর দিকে চিন্তা না থাকলেও পরে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদেরও পেনশন কর্মসূচির আওতায় রাখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তারা টানা ১০ বছর চাঁদা দেয়ার পর পেনশন সুবিধা পাবেন।
অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড বা তফসিলি ব্যাংকে চাঁদা জমা দেয়া যাবে। জরিমানা ছাড়া পরবর্তী এক মাসের মধ্যে চাঁদা দেয়া যাবে। তবে এর বেশি সময় অতিবাহিত হলে প্রতিদিনের জন্য গুনতে হবে ১ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি। পরপর তিন মাস চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলে পেনশন হিসাব স্থগিত হয়ে যাবে। সব বকেয়া পরিশোধ না হলে তা আর সচল হবে না।
চাঁদাদাতা নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজনে চিকিৎসা, গৃহনির্মাণ, গৃহ মেরামত এবং সন্তানদের বিয়ের জন্য তহবিলে জমাকৃত অর্থের ৫০ শতাংশ ঋণ হিসেবে তুলতে পারবেন। তা নির্ধারিত ফিসহ সর্বোচ্চ ২৪ কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে, যা তার হিসাবে জমা হবে। একটি ঋণ চলমান থাকতে নতুন করে ঋণ নেয়া যাবে না।
মার্সার সিএফএ ইনস্টিটিউট গ্লোবাল পেনশন ইনডেক্সে (এমসিজিপিআই) বিশ্বের ৪৪টি দেশের তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকায় প্রথমদিকে আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, ইসরায়েল, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, সুইডেন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের নাম রয়েছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। তবে গতকাল উদ্বোধনের পর সর্বজনীন পেনশনের যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।
সঞ্চয়মুখী ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার অভিপ্রায়ে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া মানুষ পেনশন তুলতে গিয়ে যে ভোগান্তির শিকার হন, তা আমলে নিলে আলোচ্য কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। যে কারণে কর্মসূচির পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বিকল্প নেই। সাধারণ জনগণের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে পেনশন উত্তোলনের ব্যবস্থা যদি করা যায়, তাহলে এ কর্মসূচি জনপ্রিয়তা পাবে সে আশা করা যায়।
আগে থেকে আলোচনা চললেও বস্তুত এমন সময়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এল, যখন দেশের ব্যাংক খাতে সংকট চলছে। এছাড়া রিজার্ভ সংকটসহ বিনিয়োগে স্থবিরতার বিষয়টিও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পেনশন কর্মসূচির সফলতা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। তার পরও জনবান্ধব এ কর্মসূচি সার্থক করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। এ-সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সংযুক্ত করতে হবে। এ কর্মসূচি সার্থক হলে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা আরো জোরদার হবে। এজন্য পেনশন কর্মসূচির সফল উদাহরণ তৈরি করা প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রক্রিয়াটি যেহেতু অনলাইনে করা হচ্ছে, এজন্য সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। আমরা এ কর্মসূচির সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করি।










