অর্থনৈতিক কাঠামো সদা পরিবর্তনশীল। একসময় ধীরগতিতে এ পরিবর্তন সাধিত হলেও একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির কল্যাণে পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিকস, ব্লকচেইন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ইত্যাদি প্রযুক্তি। এরই মধ্যে দেশেও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সাধনকারী প্রযুক্তিগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য নির্মাণ হয়েছে হাই-টেক পার্ক। দেশে গত দেড় দশকে সরকারি হাই-টেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৯২টি। কিন্তু পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে অধিকাংশ পার্কের কাজের লক্ষণীয় অগ্রগতি নেই। উপরন্তু বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) কর্তৃক গত চার বছরে নতুন করে আরো ১০টি বেসরকারি পার্কের অনুমোদন দেয়া হলে তা খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবসায়িক সুবিধা ও কর রেয়াত পেতে হাই-টেক পার্ক ঘোষণায় আগ্রহী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, সময়সীমা অনুযায়ী, ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুর তারিখ থেকে প্রথম ১০ বছর শতভাগ, ১১তম বছর ৭০ শতাংশ, ১২তম বছর ৩০ শতাংশ হারে কর অব্যাহতি দেয়া হয়। পার্ক ঘোষণা পাওয়া প্রতিষ্ঠান আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর থেকেও অব্যাহতি পায়। পার্কে বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিকে ৮০ শতাংশ এবং পার্ক উন্নয়নে পণ্য জোগানদারকে শতভাগ ভ্যাট অব্যাহতি এবং ঘোষিত পার্ককে ওয়্যারহাউজ স্টেশন সুবিধা দেয়া হয়। এর মাধ্যমে হাই-টেক পার্কে স্থাপিত শিল্প-কারখানা, প্রতিষ্ঠানটির পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার্য কাঁচামাল, উপকরণ আমদানির সময় প্রযোজ্য আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি, মূল্য সংযোজন কর পরিশোধ না করে বন্ড ব্যবস্থায় আমদানি করতে পারবে। এছাড়া শুল্কমুক্ত যানবাহন আমদানি, মূলধনি যন্ত্রপাতি, নির্মাণ উপকরণ আমদানির ওপর নানা পর্যায়ে ভ্যাট ও শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে।

বাস্তবিক অর্থে বিনিয়োগ ছাড়া এসব পার্কের কার্যকারিতা এবং সুফল দাঁড়াবে প্রায় শূন্যের কোটায়। বরং অর্থের অপচয় হবে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, সরকার এ পর্যন্ত ১৬টি হাই-টেক পার্ক, চারটি সফটওয়্যার পার্ক, ৭১টি শেখ কামাল অ্যান্ড ইনকিউবিশন সেন্টার এবং একটি ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি পার্ক (মোট ৯২টি) তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি প্রকল্পকে পার্ক হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে এবং সাতটি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রকল্পও সেই অর্থে দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণেও ব্যর্থ হয়েছে।

সম্প্রতি জানা যায়, জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা দেয়া সরকারি প্রকল্প ‘এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই)’-এর বিভিন্ন সিস্টেমের হোস্টিং ও অন্যান্য সিস্টেম ক্রয় বাবদ ২৬৩ কোটি টাকার বেশি বিল বকেয়া পড়ে গেছে। এছাড়া চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট প্রকল্পের আওতায় ১৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ৮০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেড় দশকের বেশি সময়ে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১৮ কোটি ডলার। এ পরিস্থিতি আগামীতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং এ খাতের উন্নয়নকে সন্দিহান করে তুলছে। অথচ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সাধন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপায়ণে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকল্প নেই।

অবশ্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ‍বিনিয়োগ ছাড়াও প্রযুক্তি জ্ঞানে সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রযুক্তি খাতের উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চাহিদাকেন্দ্রিক উৎপাদন পরিকল্পনা না থাকায় দেশী ও বিদেশী উভয় বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। নিকট ভবিষ্যতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে তথ্যপ্রযুক্তি খাত, হাই-টেক পার্কগুলো আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। 

বিনিয়োগ সংকট মোকাবেলায় সর্বপ্রথম প্রয়োজন দক্ষ জনবল ও উন্নত অবকাঠামো। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের মধ্যে ৬০ হাজারের অধিক ও ২০৩০ সালে এক লাখ তরুণ-তরুণীকে প্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬ হাজার তরুণ-তরুণী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছে। সুতরাং শিগগিরই দক্ষ জনবল বাড়াতে সক্রিয় হতে হবে সরকারকে। দেশের শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব এ খাতের মাধ্যমে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক মডেলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কেননা কয়েক বছরের মধ্যে যদি কোনো পণ্য অকেজো হয়ে যায়, তাহলে কেউই বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। অর্থাৎ পরিকল্পনা হতে হবে সুদূরপ্রসারী। দেশ ও বিদেশের চাহিদামাফিক পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৫ বিলিয়ন ডলারের বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের। সে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বিদেশী বিনিয়োগ প্রতিনিয়তই বাড়ানোর চেষ্টা করা জরুরি। সম্প্রতি দেশে স্মার্ট বাংলাদেশ সামিট আয়োজন করার ফলে নতুন স্টার্টআপ আসছে এবং ওই স্টার্টআপগুলো বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে বলে আশা করা যায়।