চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান, দুই দশক ধরে আমার বাস এ শহরে। এখানকার জানুয়ারির খুব ঠাণ্ডা এক সকালে ভারী জ্যাকেট চাপিয়ে হেলেদুলে অফিসে গিয়ে গরম গরম গ্রিন টি-তে চুমুক দিতে দিতেই এসেছিল এক মহার্ঘ ফোন। হুবেই প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে ফোনে আমাকে জানানো হলো, ৩০ জানুয়ারি সকালে আমাকে প্রাদেশিক সরকারের ২০২৪ সালের দুই অধিবেশনে বিদেশী অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটলেও মন দিয়ে শুনলাম অন্য প্রান্তের সব কথা—কিছু ফরমালিটিস আছে, সেগুলো কীভাবে কী করতে হবে তিনি খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলেন, আমিও ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রাখলাম। নিঃসন্দেহে এটি আমার এবং আমার দেশের জন্য আনন্দ সংবাদ, কাজেই আনন্দ ছুঁয়ে গিয়েছিল আমাকেও।

এ ফাঁকে বলে রাখি, চীনের ‘দুই অধিবেশন’-এর দুটো ধাপ রয়েছে। সাধারণত চীনা নতুন বছরের আগে প্রাদেশিক সরকারগুলোর দুই অধিবেশন হয়ে থাকে। তারপর সব প্রাদেশিক সরকারের পাঠানো রিপোর্ট ও সুপারিশের আলোকে মার্চের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় ‘দুই অধিবেশন’। কেন্দ্রীয় ‘দুই অধিবেশন’ হলো চীনের জাতীয় গণকংগ্রেস (এনপিসি) ও চীনা গণরাজনৈতিক পরামর্শ সম্মেলনের (সিপিপিসিসি) জাতীয় কমিটির বার্ষিক অধিবেশন। পক্ষান্তরে প্রাদেশিক ‘দুই অধিবেশন’ হলো, চীনের প্রাদেশিক গণকংগ্রেস ও প্রাদেশিক গণরাজনৈতিক পরামর্শ সম্মেলন কমিটির বার্ষিক অধিবেশন। প্রাদেশিক ‘দুই অধিবেশন’-এর প্রাক্কালে ওই প্রদেশের সমাজের সর্বস্তরের জনগণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (এদেরকে রেন তা তাই পিয়াও বলা হয়, বোঝার সুবিধার্থে ধরে নেয়া যাক তারা অনেকটা আমাদের দেশের সংসদ সদস্যদের মতো) মারফত অথবা সরাসরি (ডাকযোগে কিংবা অনলাইনে লিখে) তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা প্রাদেশিক সরকারের কাছে পৌঁছে থাকেন। ‘দুই অধিবেশন’-এ তাদের মতামত নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয় এবং দিন শেষে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার লক্ষ্যে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়। এরপর প্রাদেশিক গভর্নর প্রকাশ্যে এটিকে ইশেতাহার আকারে পাঠ করেন এবং রিপোর্ট আকারে কেন্দ্রীয় ‘দুই অধিবেশন’-এ পাঠিয়ে থাকেন। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ‘দুই অধিবেশন’-এ আইনপ্রণেতা এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টারা বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা সব প্রস্তাব যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করেন। এর মাধ্যমেই সাধারণত গণচীনের বিগত বছরের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন এবং আগামী এক বছরের কর্মপন্থা নির্ধারণ হয়ে থাকে। এখানে যে কথাটি না বললেই নয় তা হলো, চীন একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং এ দেশে ক্ষমতাসীন দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) হলেও চীনা কমিউনিস্ট পার্টি দেশের সব রাজনৈতিক দল (গণচীনে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও আটটি রাজনৈতিক দল রয়েছে), বিভিন্ন গণসংগঠন ও সংস্থা, পেশাদার গ্রুপ, সংখ্যালঘু জাতি, বিশেষজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ নির্দলীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে দেশ শাসনের নীতি মেনে চলে। সব মতকে আমলে নিয়ে সবার সঙ্গে মিলে দেশ শাসন করার এ পদ্ধতি আমাদের কাছে নতুন ঠেকলেও এটি আসলে একটি চীনা দর্শন। প্রাচীন চীনারা সমুদ্রের সংজ্ঞা হিসেবে বলত, ‘যে শত নদীকে আলিঙ্গন করতে পারে সেই সমুদ্র’ (হাই না পাই ছোয়ান)। চীনাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রাচীন চীনা দর্শনের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। এজন্যই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ শাসনের এ চীনা পন্থাকে বলা হয়ে থাকে ‘চীনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতন্ত্র’ এবং ‘দুই অধিবেশন’ হলো চীনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতন্ত্রের আদর্শ উদাহরণ।

ফিরে আসা যাক হুবেই প্রাদেশিক দুই অধিবেশনে। এটির পোশাকি নাম ছিল ১৪তম হুবেই প্রাদেশিক গণকংগ্রেসের দ্বিতীয় সভা। প্রথা অনুযায়ী এ সভার শেষেই হুবেই প্রদেশের গভর্নর ওয়াং চুং লিন তার রিপোর্ট পেশ করবেন। রিপোর্ট শোনার জন্য যথাসময়ে আমরা গিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করলাম। তার ৩২ পৃষ্ঠার রিপোর্টজুড়ে ছিল চীনা জনগণকে সুখী জীবনের স্বাদ পেতে সহায়তা করা, বয়স্ক নাগরিকদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ বা অর্থনীতির দ্বৈত প্রবাহে ইয়াংসি নদীর অববাহিকা অঞ্চলের অংশীদারত্ব বৃদ্ধিতে হুবেইয়ের ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রির সক্ষমতা বাড়ানো, পরিবেশ সুরক্ষা, গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন, সর্বজনীন শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি বিষয়গুলো। তার দেয়া তথ্যমতে ২০২৩ সালে ৫৮ মিলিয়ন জনসংখ্যার হুবেই প্রদেশের জিডিপি ছিল ৫ হাজার ৫৮০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউয়ান এবং জিডিপির বৃদ্ধি ছিল আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ। হুবেই প্রদেশের ২০২৪ সালের প্রাক্কলিত জিডিপি বৃদ্ধির হারও ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। আমার স্পষ্ট মনে আছে, বিগত বছরগুলোয় অনেক প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদই চীনের অর্থনীতি নিয়ে ভুরু কুঁচকেছেন, অনেকে আবার এক কাঠি এগিয়ে এমন ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন যে শিগগিরই মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে চীনের অর্থনীতি। আদতে তার কিছুই হয়নি, শুধু হুবেই প্রদেশই নয়, গোটা চীনের অর্থনীতিতেই ছিল প্রবল বিক্রমে ঘুরে দাঁড়ানোর চিহ্ন। আর এ ঘুরে দাঁড়ানোটা এমন এক সময়ে হয়েছে যখন সারা বিশ্ব যাচ্ছিল একটা প্রবল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের ভেতর দিয়ে। চীনারা অস্থির এ সময়টির নাম দিয়েছেন ‘শতবর্ষের অদেখা পরিবর্তন’ হিসেবে। বর্তমান বিশ্বে ঘটে যাওয়া ‘শতবর্ষের অদেখা পরিবর্তনের’ শিকার কিন্তু আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও। এক্ষেত্রে চীনা উন্নয়ন মডেলকে রেফারেন্স হিসেবে নিয়ে আমরা আমাদের সমাজের উপযুক্ত একটি উন্নয়ন পন্থা খুঁজে পেতে পারি কিনা—আমি মনে করি, সেটি ভেবে দেখা গেলে মন্দ হয় না। বিশেষত বিগত বছরগুলোয় পরিবেশ সংরক্ষণ করে একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন সাধন করার ক্ষেত্রে চীন ছিল গোটা পৃথিবীর আগ্রহের কেন্দ্রে। পরিবেশের ক্ষতি না করে চীনের ব্যাপকভিত্তিক উন্নয়ন এখন বাঘা বাঘা উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের ভাবতে বাধ্য করেছে—উন্নয়ন মানেই ‘পশ্চিমায়ন’ নয়। আমার মতে, বিগত বছরগুলোয় এটিও ছিল চীনের অন্যতম একটি সাফল্য।

গভর্নর সাহেবের বক্তৃতা শেষ হতেই আমরা একে একে সবাই অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে এলাম। কিছুক্ষণ পরই দুপুরের খাবারের বিরতি। সভাস্থলের পাশেই উহানের বিখ্যাত ইস্ট লেক; ভাবলাম লেকের ধার ধরে একটু হেঁটে আসি, তারপর না হয় দুপুরের খাবার খাওয়া যাবে। লেকটি আমার খুব প্রিয়, ছাত্রাবস্থায় বহুবার এখানে এসেছি আমি। একবার তো এই লেক থেকে ডুবে যাওয়া এক তরুণীকে আমি বরফজল সাঁতরে উদ্ধারও করি। সেটা ২০০৬ সালের ঘটনা, সে ঘটনার পর প্রাদেশিক সরকার আমাকে শ্রেষ্ঠ যুবক পদক দিয়ে সম্মানিত করে। আমার আগে ও পরে আর কোনো বিদেশী নাগরিক এ পদক পাননি। লেকের কথায় আসা যাক। আগে লেকের পানি আসলেই বেশ দূষিত ছিল, আমার মনে আছে—মেয়েটিকে সাঁতরে উদ্ধারের পর আমার গা থেকে পচা পানির গন্ধ আসছিল। এখন লেকের পানি এতই টলটলে যে পাড়ঘেঁষে হাঁটলে আমাদের দেশের বড় সাইজের কাজলি মাছের মতো এক ধরনের মাছের জলকেলি চোখে পড়তে বাধ্য। হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম অনেকেই ছিপ নিয়ে বসে গেছেন, মাছ ধরছেন। এক বুড়ো দেখলাম অনেক মাছ ধরেছেন, কাছে গিয়ে উঁকি মারতেই বুড়ো একগাল হেসে দেখালেন পুঁটি, তেলাপিয়া, বড় কাজলি মিলিয়ে প্রায় কেজিখানেক মাছ তো হবেই। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ‘এত মাছ! মাঝরাত থেকেই ধরছেন নাকি?’, বুড়োর বুঝি খুব হাসার শখ, হেসেই জানাল, ঘণ্টা দুয়েক আগেই কেবল ছিপ ফেলে বসেছে সে। কথায় কথায় তার কাছ থেকে জানলাম, নাতিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে একটু বেলা করে সে এখানে প্রতিদিনই আসে। মাছ ধরা তার পেশা নয়, অবসরের শখ। তার কাছ থেকে জানলাম, সে বাংলাদেশকে চেনে, একসময় আশুগঞ্জ সার কারখানার নির্মাণকাজে চীনা শ্রমিক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ তার খুব পছন্দ, বিশেষ করে বাংলাদেশের মাছের তরকারি নাকি তার খুব প্রিয়। বয়স ৭৮, ছেলে আর ছেলে বউ দুজনই সরকারি চাকরি করে, নাতি দিনের বেলা দাদা-দাদির কাছে থাকে আর সন্ধ্যায় তার ছেলে অফিস থেকে ফেরার পথে নাতিকে নিয়ে যায়। অবসর জীবনও তার কাছে আনন্দময়—মাছ ধরে, বউয়ের সঙ্গে টিভি দেখে আর ছোট্ট নাতিকে দেখাশোনা করে আনন্দেই আছে সে। মনে পড়ে গেল, গভর্নর ওয়াং চুং লিনের প্রাদেশিক রিপোর্টজুড়ে বারবার বলা চীনা জনগণের সুখী জীবনের কথা। আসলেই তো তা-ই, এ বুড়োই তো জলজ্যান্ত উদাহরণ। ঝুটঝামেলা নেই, সামাজিক নিরাপত্তা আছে, পেনশন আছে, চিকিৎসাসেবা বেশ ভালো—অবসরের দিনগুলো আসলেই চীনাদের কাছে উপভোগ্য। কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিলাম, বুড়ো তার ইলেকট্রিক বাইক চালু করছে দেখে সম্বিত ফিরে পেলাম। বাড়ি ফিরে যাচ্ছে সে, আমিও ভাবলাম এবার আমিও তবে ফিরে যাই। ফিরে যাওয়ার পুরোটা পথজুড়েই আমার মাথায় ছিল বুড়োর অমায়িক হাসি, তার ঝকঝকে উজ্জ্বল হাসির আভাই বলে দিচ্ছিল চীন এগিয়ে যাচ্ছে আপন লক্ষ্যে, দুর্নিবারভাবেই।

ড. মোস্তাক আহমেদ গালিব: পরিচালক, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ‘এক অঞ্চল এক পথ’ গবেষণা কেন্দ্র

উহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়