নানা কারণে সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনীতি আর রাজনীতি নিয়ে পাড়াগাঁয়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নির্বাহী বিভাগের সচিবালয় পর্যন্ত সবাই আড্ডা, আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, বাদানুবাদে ব্যস্ত। আমাদের সামাজিক পরিবর্তন, সামাজিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা কম, লেখালেখিও কম আর গবেষণা তো নেই-ই বললে চলে। দুর্ভাগ্যজনক সময়ের পরিসরে সমাজের যে পরিবর্তন হচ্ছে বা হবে তা ইতিবাচক না নেতিবাচক তা অনুসন্ধান করার আগ্রহ নেই কারো। সমাজবিজ্ঞানী, গবেষক, এমনকি সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত রাজনৈতিক নেতারাও এ নিয়ে ভাবছেন বলে মনে হয় না। এটাও একটা বিরাট অবক্ষয়ের লক্ষণ।
প্রতিবেশী: স্বাধীনতার প্রথম দিকে সমাজ ছিল মূলত কৃষিনির্ভর, পরস্পরের সহযোগিতানির্ভর এক গ্রামীণ সমাজ। এখনকার বাংলাদেশে শহুরে জীবনযাত্রা, প্রযুক্তি ও তথ্যনির্ভরতা মানুষকে আরো আত্মকেন্দ্রিক করেছে। আগের মতো বিশেষ করে শহর এলাকায় প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেয়ার, বিপদে-আপদে সাহায্য-সহযোগিতা করার, উপহার, খাদ্য বিনিময়ের সংস্কৃতি অনেকটা কমে গেছে। একই ভবনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন অবস্থান করেও পারস্পরিক পরিচয়, চেনাজানা হয় না। আত্মকেন্দ্রিকতার প্রসার ছাড়াও পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ার কারণে, মানুষের নীতিহীনতা বেড়ে যাওয়ায়, লোভ-লালসা বেড়ে যাওয়ায়, প্রতারণার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পারস্পরিক আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে আসা-যাওয়া, অংশগ্রহণ, শুভেচ্ছা বিনিময় আনুষ্ঠানিকতার বলয়ে চলে গেছে। তবে সশরীরে দেখাসাক্ষাৎ বা যোগাযোগ কম হলেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এককেন্দ্রিকতা: ক্রমবর্ধিষ্ণু এককেন্দ্রিকতা সমাজে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, আন্তরিকতা, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যের আপদে-বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার সেই ঐতিহ্য ম্রিয়মাণ। পথচারীরা দুর্ঘটনায় নিপতিত ব্যক্তির বা দুষ্কৃতকারী কর্তৃক আক্রান্ত ব্যক্তির ছবি ওঠায়, ভিডিও করে, উদ্ধার কিংবা প্রতিরোধ করার পরিবর্তে। কেউ আবার ভিউ বাড়ানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে। দেশ বা সমাজের কথা না ভেবে নিজ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানকে কষ্টার্জিত টাকায় কিংবা অবৈধভাবে উপার্জিত টাকায় বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ব্যক্তিস্বার্থ এবং আত্মকেন্দ্রিকতা এর কারণ।
বলা হয় দেশে ভালো/সজ্জন লোকের সংখ্যা কমেছে—এটা নিয়ে মতপার্থক্য হতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো লোকেরা ভালো লোকদের সমর্থন, নিরাপত্তা বা আনুকূল্য দেয় না—এটা সত্যি। তেমনি সহজ-সরল লোকদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্য সহজ-সরল লোকেরা সমর্থন দেয় না, সহযোগিতা করে না। ঝামেলা এড়ানোর জন্য অনেকে অন্যায় অপরাধ নির্যাতন- জুলুম ইত্যাদির প্রতিরোধ প্রতিবাদ করে না।
আনুষ্ঠানিকতা: আগে আন্তরিকতা বেশি ছিল এখন আনুষ্ঠানিকতা বেড়েছে এবং তা সব ক্ষেত্রেই, ধর্মীয় আচার-আচরণ থেকে দাপ্তরিক কাজকর্মে। অনেক দেশের ন্যায় আমাদের সমাজেও বিশেষত যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রকৃত ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা/আমল কমে যাচ্ছে উদাসীনতা, কর্মব্যস্ততা, ধর্মীয় শিক্ষার অভাবসহ নানা কারণে। কেউ কেউ পবিত্র হজে যান ব্যবসা কিংবা রাজনীতিতে সহায়ক হবে—এই ভেবে। অনেকে সাধু সাজ গ্রহণ করে অসাধু কাজ নির্বিঘ্নে করার জন্য। যেই মসজিদে জুমার নামাজে দুই হাজার মুসল্লি হয় সেই একই মসজিদে মাগরিব বা এশার নামাজে একশ মুসল্লি হয় না। যেকোনো পদেই পদায়িত হোন না কেন সহকর্মীরা দল বেঁধে ফুল দেবেন, এমনকি কেউ দাপ্তরিক সফরে মফস্বলে গেলেও ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর জন্য কর্মকর্তারা লাইন ধরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। দাপ্তরিক সফরে বিদেশ গিয়ে ফেরত এলে তাকেও ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়। ৩০-৪০ বছর আগেও এত আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
ঘোরাঘুরি: দেশে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে রিসোর্ট, ট্যুরিস্ট স্পট, ট্যুর অপারেটর, পর্যটন সুবিধা। কিন্তু কমেছে, কমে যাচ্ছে আত্মীয়ের বাসায়, বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। শহর এলাকায় মেহমান এলে তাদের রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে বা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার এনে আপ্যায়ন করানো হচ্ছে। স্বল্প সময়ের জন্য বাসায় অতিথি এলে তাদের বাসায়/হাতে বানানো চা-নাশতা পরিবেশন এখন প্রায়ই অনুপস্থিত। আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গেলে মিষ্টান্ন, ফলমুল বা উপহার নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজও কমে গেছে। ঈদে বা পূজা-পার্বণে দলে দলে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে মিষ্টান্ন বা প্রসাদ খাওয়ার রীতি শহরাঞ্চলে অনেকটাই কমে গেছে।
চরমপন্থী: সমাজে চরমপন্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মধ্যপন্থী কমে যাচ্ছে। সেটা অর্থনীতি, রাজনীতি, ফ্যাশন পোশাক—সব ক্ষেত্রেই। মধ্যবিত্ত আছে অনেকটা আগের মতোই, কিন্তু মধ্যপন্থী কমে গেছে। রাজনীতি এখন সর্বত্র, চায়ের স্টল থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন, সমিতি সংগঠন, খেলাধুলা, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই। নিরীহ নিরপেক্ষ লোক প্রায় শূন্য। এখন ক্লাব, সমিতি সংগঠনগুলোতে, এমনকি গ্রামেও শুধুই বিভেদ, বিভক্তি এবং সেগুলো খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়ছে। পঞ্চাশ-ষাট দশকে ঢাকা শহরে হাতে গোনা কিছু হিজাব পরিহিতা নারী দেখা যেত, এখন তার পরিমাণ বেড়ে গেছে। আবার উল্টোদিকে তখন আধুনিক, আল্ট্রামডার্ন সাজে সজ্জিতা নারীও খুব কম দেখা যেত, এখন অনেক বেশি। ধর্মীয় ক্ষেত্রেও সহনশীল মডারেট লোক কমে গেছে, একদল আমল মোটেই করেন না, আরেক দল ধর্মীয় ইস্যুতে অতিশয় সংবেদনশীল।
রাজনীতি: আগে কিছু লোক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল, অধিকাংশ নিষ্ক্রিয় ছিল, প্রয়োজনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত। এখন গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবাধিকার ও সুশাসন নিয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক, সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাজনীতিতে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা আর প্রভাব প্রতিপত্তির প্রভাব পড়েছে। পুরো সমাজ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এখন রাজনীতি নিরপেক্ষ লোক বিরল, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, পুরো সমাজ বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে। ক্লাব সমিতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দাতব্য বা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন মূলত রাজনৈতিক পক্ষাশ্রয়ের প্রেক্ষাপটে ক্রমান্বয়ে ভেঙে ক্ষুদ্রতর হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্বার্থ, দ্বন্দ্ব, লোভ, উচ্চাশা ও এককেন্দ্রিকতার কারণে। পেশাজীবী শ্রমজীবী সব সমিতি সংগঠন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। এমনকি নিরপেক্ষ আলোচনাকেও রাজনৈতিকীকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে বা রাজনীতিকে টেনে নেয়ার অপপ্রয়াস চলছে।
সরকারি বেসরকারি দপ্তরে, সিভিল সার্ভিস সর্বত্রই পদোন্নতি কিংবা পদায়নে চাকরির রেকর্ড, যোগ্যতার চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক পক্ষপাত, ব্যক্তিগত পরিচয়/যোগাযোগ কিংবা স্বার্থ। ফলে যোগ্য মেধাবীদের মধ্যে হতাশা অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংস্কৃতি: সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে ঘটেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। স্বাধীনতার পর লোকসংস্কৃতি যেমন বাউল, জারি-সারি, পালাগান, পল্লীগীতি ইত্যাদি ছিল সংস্কৃতির মূল ধারায়। কিন্তু এখন সেগুলো সময়ের সঙ্গে অনেকটাই কোণঠাসা। এখন যুক্ত হয়েছে টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, নাটক, ব্যান্ড সংগীত, ফ্যাশন, ফিউশন ও ডিজিটাল কনটেন্ট—যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন রুচি ও সৃজনশীলতার জন্ম দিয়েছে। আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাচ্ছে, সংগীত পৌঁছে গেছে ইউটিউব ও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে। সংস্কৃতিতে এখন গ্ল্যামার, যৌনতা, অশ্লীলতা বেড়ে গেছে। অন্যদিকে সংস্কৃতিতে আর্থিক মুনাফার আকাঙ্ক্ষা বেড়ে গেছে।
অশ্লীলতা: যৌনতা অশ্লীলতা ক্রমান্বয়ে অনেকটা স্বাভাবিকতায় পৌঁছে যাচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতি, স্মার্টফোন কালচার, পাশ্চাত্য সংশ্লিষ্টতা, অবাধ তথ্যপ্রবাহ, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইনে পর্নোফিচার, জীবনযাপনের মানোন্নয়নসহ নানা কারণে আবালবৃদ্ধবনিতা সবারই সেক্স, যৌনতা আর অশ্লীলতা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক কারণেও যৌনতা, গ্ল্যামার পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। টেলিভিশনের নাটকে, ওটিটি প্লাটফর্মে অনেক ‘সাহসী’ সংলাপ বা দৃশ্য দেখছেন পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে। এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত/প্রচারিত সিনেমায় পরিবারের সবাই একসঙ্গে উপভোগ করার চিত্রও দেখা যায়। সেক্স যৌনতাকে স্বাভাবিকতায় ফেলাটা আবার কারো কারো কাছে ফ্যাশন বা আধুনিকতা।
প্রবাদ বাক্য: প্রবাদ বাক্য, খনার বচন, নীতিকথা—এগুলো প্রায় উঠে গেছে। এমনকি মুরব্বি তথা বয়স্করাও আজকাল এগুলো বলেন না, বিশ্বাস করেন না। সবকিছুই কুসংস্কারের খোলসে ঢুকে পড়েছে বা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। শিশু-কিশোরদের নীতিবাক্য/উপদেশ সংবলিত বই-পুস্তক পাঠাভ্যাসে মুরব্বিদের আগ্রহ চোখে পড়ে না। গল্প কিসসা, রূপকথার মাধ্যমে বিনোদন এবং মানবিক শিক্ষার যে বীজ শিশুমনে অঙ্কুরোদ্গম হতো, তা এখন নিশ্চিহ্নের দিকে। এখন Early to bed and early to rise, makes a man healthy and wise অপ্রচলিত করে আবালবৃদ্ধবনিতা রাতে জাগে দিনে ঘুমায়। Slow and steady wins the race না বলে এখন বলে Speed and accuracy wins the race.
মিতব্যয়িতা: মানুষের আয় বেড়েছে, জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, সে সঙ্গে কমেছে মিতব্যয়িতা। তার মধ্যে খাদ্যাভ্যাসে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে অপচয় খুব বেশি। শীতের ঠাণ্ডায় গাড়ির কাচ তুলে দিয়ে এসি চালানো, অফিস কক্ষের/চেম্বারের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়ে পর্দা টেনে দিয়ে এসি চালানো/ উচ্চশক্তির বাতি জ্বালানো, বাতি-এসি-ফ্যান চালু রেখে কক্ষ ত্যাগ করা, এসি ও পাখা যুগপৎ চালানো, অত্যধিক আলোকসজ্জা, বাতি জ্বেলে রাত জেগে থেকে দিনের বেলা ঘুমানো, ব্যবসা-বাণিজ্য দোকানপাট দুপুর পর্যন্ত বন্ধ রেখে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা রাখা—এসবই অপচয়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চয় করার প্রবণতা অনেক কম।
আচার-আচরণ: আগে সমাজে শিষ্টাচার, সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল সামাজিক জীবনের মৌল উপাদান। অতিথি বা বয়োজ্যেষ্ঠ দেখলে সালাম জানানো, প্রতিবেশীর খোঁজ নেয়া, একে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো ছিল সাধারণ সামাজিক প্রথা। বর্তমানে সামাজিক শিষ্টাচারে কিছুটা ভিন্নতা এসেছে। তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক বেশি মুক্তচিন্তার, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মূল্য দেয়। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে পারস্পরিক মেলামেশা ও আন্তরিকতা আগের মতো গভীর নয়। সমাজে মানুষের মধ্যকার আচার-আচরণে আনুষ্ঠানিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু আন্তরিকতা হ্রাস পেয়েছে।
মানুষ কথায় কথায় মিথ্যা বলে, হাসতে হাসতে মিথ্যা বলে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মিথ্যা বলে, খামখেয়ালি করে মিথ্যা বলে, দুষ্টুমি করে মিথ্যা বলে। এটা সহজাত প্রবৃত্তি। এটা বলা যে অনুচিত, অশোভন, মহাপাপ—এ কথা কেউ স্মরণে রাখে না, গুরুত্ব দেয় না। অস্থির সমাজে আস্থাহীনতায় বন্ধুত্ব হচ্ছে বাধাপ্রাপ্ত। দারিদ্র্য লুকাতে, আবার অতিরিক্ত সম্পদ লুকাতে সদাব্যস্ত। ধৈর্য, সহিষ্ণুতা কমে যাচ্ছে। মায়া-মমতা, মূল্যবোধ ক্রমেই হ্রাসমান। যন্ত্রনির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে অলসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভোগবাদিতা এবং তাৎক্ষণিক সাফল্যের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে।
শেষ কথা: নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন ‘একটি অসুস্থ সমাজের লক্ষণ হলো তার কারাগারে থাকা মানুষের সংখ্যা।’ আমাদের দেশের কারাগারগুলো সব আমলেই ভর্তি থাকে, ধারণক্ষমতার অনেক বেশি মানুষ থাকে, কয়েদি হাজতি। ১৯৯৯ সালে হাজতি ও কয়েদি মিলে কারাগারগুলোতে বন্দি ছিল ৫৯ হাজার, যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৬ হাজার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কারাগারে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার। সময়ের ফোঁড়ে একদল ঢোকে অন্য দল বের হয়। অর্থাৎ কারাগারে প্রচুর লোক থাকে। আমাদের সমাজ কি অসুস্থ?
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যার উৎস ও পরিণতি গভীরভাবে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত। শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বিশ্বায়ন যেখানে সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, সেখানে সাংস্কৃতিক রুচি, মূল্যবোধ ও সম্পর্কের জায়গায় সংকটও তৈরি করেছে। মনে রাখা দরকার পরিবর্তন/বিবর্তনকে মেনে নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই, আবার যেকোনো পরিবর্তনই কাম্য নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে, একটি মানবিক, মূল্যবোধসম্পন্ন ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের দিকেও লক্ষ রাখতে হবে—এটাই ভবিষ্যতের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ।
সিকদার আনোয়ার: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব










