কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমে বাড়ছে, যা বেশ প্রশংসনীয়।  পরিসংখ্যান বলছে, শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। বিশেষত দেশের প্রাণিসম্পদ ও কৃষি খাতে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জেন্ডার বাজেটের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ (৩০টি) মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থায়  নারী কর্মীর হার ২০ শতাংশের কম। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে দেশের সরকারি নিয়োগের একমাত্র সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে (বিপিএসসি) আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।  

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। আবার জাতীয় জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, গত ৪৭ বছরে কৃষিতে নারীর সংখ্যা শতকের ঘর থেকে কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এর বাইরে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মরত আছেন পোশাক শিল্প খাতে। ৬০-৮০ শতাংশ নারী এ খাতে জড়িত। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোয়।বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও সরকারি বিভাগ এবং সংস্থায় নারী কর্মীর সংখ্যা ২০ শতাংশেরও নিচে। এছাড়া সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় নারীর অংশগ্রহণ কম। 

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে শ্রম খাতের সর্বত্রই নারীর সমান ভূমিকা থাকা জরুরি। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার   অর্ধেকের বেশি নারী। সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ না বাড়লে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে না। দেশের অন্যতম আর্থ-উন্নয়ন বিষয়ক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরা হলে নারীর এ অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। ধারণা করা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ সমানুপাতিক হারে বজায় থাকলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিপিএসসি-কে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। কর্মজীবী নারী আয়োজিত এক সভায় সংগঠনটির ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ৬৯৫ জন নারী শ্রমিকের ওপর জরিপ পরিচালনায় দেখা গেছে, করোনা-পরবর্তী সময়ে পেশার পরিবর্তন করেছেন ১০ দশমিক ২ শতাংশ নারী। করোনার আগে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২৫৮ যা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ৩২৭। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমে গেছে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বেড়েছে। 

শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক খাতও গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা হলো, এটি একই সঙ্গে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এর কারণ স্বল্প মজুরি এবং কাজের নিরাপত্তাহীনতা। অবশ্য সব খাতেই নারীদের আয়বৈষম্যসহ অন্য অনেক বৈষম্যমূলক আচরণ ও হয়রানির শিকার হতে হয়। তবুও নারী ও দেশের উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক খাত বা মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থায় আয় ও আয়ের নিরাপত্তা তুলনামূলক বেশি। তাই এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বিবিএস প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী আছেন। তবে উপসচিব থেকে সচিব পর্যায়ে নারীর সংখ্যা ১ শতাংশ বা তারও কম। দেশে সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদেও নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। এসব ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

জেন্ডার বাজেটের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্ধেকের বেশি নারী কর্মী আছে কেবল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। ৬৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ নারী আছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এ তথ্য জানান দিচ্ছে নারীদের সহজাত স্বভাব—যত্নশীল ও পরিবারকেন্দ্রিকতার কারণেই যেন এসব খাতে নারীর সংখ্যা বেশি। পক্ষান্তরে অধিকাংশ উচ্চ পর্যায়ে নারীর সংখ্যা বেশ নগণ্য। অবশ্য অনেকে মনে করেন, এর পেছনে দায়ী কায়িক শ্রম; কায়িক শ্রম খাতে নারীর সংখ্যা কম। এক মুহূর্তের জন্য যদি ধরে নেয়া হয় যে এ ধারণা সত্য, তাহলে এবার খুঁজতে হবে এ ধারণার উৎপত্তি কোত্থেকে।

সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থেকেই এ ধারণা উৎসারিত হয়। সমাজে যেসব নারী কাজ করার সুযোগ পান, কোনো না কোনো অজুহাতে তাদের কর্মক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করা হয়। যেমন নারীদের এমন পেশায় যেতে বলা হয় বা যেতে সহায়তা করা হয় যেখানে কাজের কম চাপ থাকে এবং যে পেশায় থেকে ‘সংসার’ পরিচালনা করা সহজ হয়। যে কারণে ‍শিক্ষকতায় বা প্রাথমিক শিক্ষার কাজে নারীদের বেশি দেখা যায়। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে এমন রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে নারীর কর্মক্ষেত্র ছোট রয়ে গেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণেও ঘাটতি থাকছে। তারা উচ্চ পর্যায়ে বা চাইলেই সব খাতে কাজে যুক্ত হতে পারছেন না। 

নারীর উন্নয়নের জন্য তাদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সম্পৃক্ত করা জরুরি। এজন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানোয় মনোযোগী হতে হবে। এজন্য বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। তবে সর্বপ্রথম আয়বৈষম্য দূর করে, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে বলে বেশির ভাগ নারী ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সচেতনতা ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি নারীদেরও সচেতন হতে হবে এবং নিজেদের আর্থিক স্বাবলম্বী করতে কাজ করতে হবে। এছাড়া নারী কর্মীদের ঝুঁকি কমাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সুরক্ষা স্কিম চালু করা দরকার। শ্রমবাজারে নারীর অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে এবং উচ্চ শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়, পরিচালক, উচ্চ পদে নারীর অংশগ্রহণের পথও সুগম করতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। দেশের সরকারি খাতে নারী জনবল বাড়াতে বিপিএসসিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।