দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অস্থিরতা চলছে। এর প্রভাব পড়েছে অন্যান্য খাতে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে না পারলে দেশের অর্থনীতি গতি পাবে না। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জোরালো তৎপরতা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু এটাও খেয়াল রাখতে হবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ব্যাংক ও আর্থিক খাত যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, এখন থেকে ৪৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হতে পারবেন না। এমডি নিযুক্তির দুই মাস আগে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ নিয়োগ প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সময় ও স্থানে এমডি পদে মনোনীত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার হবে। ইনক্রিমেন্ট, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি সুবিধা, নববর্ষ ভাতা, ছুটি নগদায়নসহ অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা ব্যাংক এমডিরা নিতে পারবেন না। চিকিৎসাসহ যেকোনো প্রয়োজনে দেশের বাইরে যেতে হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। এমন সব বিধান রেখে এমডি পদে নিয়োগের নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নীতিমালায় দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর এমডি বা শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগ ও তার দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি’ বিভাগ থেকে গতকাল নীতিমালাটি জারি করা হয়। এতে এমডি পদে নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের যোগ্যতা ও উপযুক্ততা, বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা, বিদেশ ভ্রমণ, এমডি পদ থেকে অব্যাহতি বা অপসারণ, এমডির দায়দায়িত্ব, ক্ষমতাসহ নানা বিষয়ে বিস্তৃত শর্তারোপ করা হয়েছে। এর আগে চলতি ফেব্রুয়ারিতেই ব্যাংকের পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য পৃথক নীতিমালা জারি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বড় মাথাব্যথার কারণ মন্দঋণ বা কুঋণ। সঙ্গে রয়েছে বৃহৎ অংকের খেলাপি ঋণ। সরকারি হিসাবেই তা দেড় লাখ কোটি টাকা হলেও তা দ্বিগুণের বেশি হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কুঋণ প্রদান ও বড় অংকের খেলাপি ঋণের পেছনে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কথা বলা হচ্ছে অনেক দিন ধরেই। দেখা যায়, পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের একাধিক সদস্য থাকছেন। এতে ব্যাংকে একটি পরিবারের আধিপত্য দেখা যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে অনেক ব্যাংকই ধুঁকছে এবং কয়েকটি ব্যাংক তো একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে। আরো আগে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্রিয় পদক্ষেপের দাবি তুলে আসছিলেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। 

রিজার্ভ ক্ষয় ও ডলারের বিপরীতে টাকার মানে বড় অংকের পতন এবং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে গত বছর থেকেই নড়েচড়ে বসেন নীতিনির্ধারকরা। ছয়-নয় সুদহার থেকে বেরিয়ে আসার পাশাপাশি ডলারকেও বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। নতুন বছরের শুরু থেকে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বেশ দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে। এটা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক দিক। কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলাদেশ ব্যাংক পিছপা হবে না এমনটাই কামনা করছে সবাই। উল্লেখ্য, আগেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের শর্ত ও যোগ্যতা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ ছিল। তবে সেগুলো ছিল বিভিন্ন সময়ে জারীকৃত বিচ্ছিন্ন প্রজ্ঞাপন। এবারই প্রথম সব বিষয়ে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করল বাংলাদেশ ব্যাংক। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে অনেক বিশ্লেষকের সমালোচনা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে গতিশীলতা আসছে না। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক ও আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ আমলে নিয়ে নিজেদের পলিসিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারীকৃত প্রজ্ঞাপনকে ইতিবাচক হিসেবে নিলেও অনেকই নিজেদের অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, নীতিমালায় এমন অনেক শর্ত দেয়া হয়েছে, যেগুলো আমলে নিলে ব্যাংকের জন্য এমডি খুঁজে পাওয়া যাবে না। যোগ্য ও দক্ষ ব্যাংক কর্মকর্তারা এমডি হতে চাইবেন না। প্রজ্ঞাপনের অনেক শর্তে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক এমডিদের নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের যোগ্যতা ও উপযুক্ততার বিষয়ে বলা হয়, ফৌজদারি আদালতে দণ্ডিত কিংবা জাল-জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ বা অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের এমডি হতে পারবেন না। এমডি সম্পর্কে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় আদালতের রায়ে কোনো বিরূপ পর্যবেক্ষণ বা মন্তব্য থাকবে না। কোনো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের বিধিমালা, প্রবিধান বা নিয়মাচার লঙ্ঘনের কারণে দণ্ডিত না হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। অবসায়ন বা লাইসেন্স বাতিল হয়েছে এমন কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় যুক্ত থাকার ইতিহাস থাকলেও কেউ এমডি হতে পারবেন না। কোনো কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিলের সঙ্গে কারো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অপরাধ জড়িত থাকার ইতিহাস থাকলে তাকেও ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না। অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি ও নৈতিক স্খলনের কারণে কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালক বা কর্মকর্তা বা কর্মচারী থাকাকালীন স্বীয় পদ থেকে অপসারণ/বরখাস্ত/অবনমিত বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিও ব্যাংকের এমডি হতে পারবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট বা অনসাইট পরিদর্শনে তার বিরুদ্ধে কোনো বিরূপ পর্যবেক্ষণ থাকা যাবে না। ঋণখেলাপি, করখেলাপি, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তি এ পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। পাওনাদারের প্রাপ্য পরিশোধ বন্ধ করে দেয়া বা আপসরফার মাধ্যমে পাওনা আদায় থেকে অব্যাহতি লাভ করা ব্যক্তিও ব্যাংকের এমডি হতে পারবেন না।

বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা ৬১ হলেও তা পরিচালনায় বিস্তৃত নীতিমালা অনুপস্থিত ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। দেরিতে হলেও এবার ব্যাংক খাত পরিচালনার বিস্তারিত নীতিমালা ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিছু কিছু বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও রদবদলও করতে পারে তারা। তবে পরিচালনা পর্ষদে যে দীর্ঘদিন ধরে নৈরাজ্য চলছিল, কুঋণ ও খেলাপি ঋণের বন্যা হচ্ছিল তা ঠেকাতে কোনো ধরনের ছাড় কাম্য নয়। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অহেতুক হস্তক্ষেপ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেন ব্যাংক খাতের  কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়ে যাবে—এমনটাই সবার কাম্য।