গত ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থাকাকালে মজুরি বোর্ডের ষষ্ঠ বৈঠকের পরই একই দিনে তড়িঘড়ি করে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা দিলেন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এর পরপরই শ্রমিকরা কতগুলো প্রশ্ন তুলেছেন, বলছেন ‘১২০ টাকা পেঁয়াজের যুগে এ মজুরি কি যথার্থ?’ তারা আরো বলছেন, ৮০ টাকার তেল ১৮০ টাকা, ৫০ টাকার চিনি ১৪০ টাকা, ৬০ টাকার ডাল ১২০ টাকা, সব কিছুর দাম যখন দুই-তিন গুণ, তখন ৮ হাজার টাকার মজুরি কেন ১২ হাজার ৫০০ টাকা? একজন শ্রমিক বলছেন, ‘আমার বেতন এখন ১২ হাজার টাকা, খরচ ১৭ হাজার টাকা, ঋণ ৫ হাজার টাকা। বাড়িতে বাবা-মাকে পাঠামু কী, আর সংসার চালামুই বা কীভাবে?’ পোশাক শিল্পে এ ধরনের শ্রমিকের সংখ্যা ৮০ শতাংশ, যারা উচ্চ সুদে ঋণ করে বেঁচে থাকে এবং পোশাক খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিকই সন্তানের শিক্ষার খরচ বহন করতে পারেন না। শ্রমিকের এ বেহাল অবস্থা প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও তার ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, এ মজুরি"খুবই অপ্রতুল।
কেন এ মজুরি অপ্রতুল? বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৪১ ধারা অনুসারে যে ১২টি সূচকের ওপর নির্ভর করে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ হওয়ার কথা, তার মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাপনের মান, শ্রমিকের জীবনযাপন ব্যয়, শিল্পের সক্ষমতা অন্যতম। আজকের বাজারের যে বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে ঘোষিত মজুরি কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ গত ১২ বছরে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি দুই-ই হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ (দি ডেইলি স্টার)। গত পাঁচ বছরে ভোক্তা মূল্যসূচক (কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স) বেড়ে হয়েছে ৩৫ শতাংশের ওপরে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে একটি বড় অংশের জীবনমান দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে নেমে গেছে, অনেক শ্রমিক নতুন করে অপুষ্টির মধ্যে পড়েছে (ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম, ২০২৩)। দেখা যায়, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকার মজুরি দিয়ে যে ধরনের জীবনযাপন করতে পারত, তা কমে গেছে ৩ হাজার ৫৯ টাকার পরিমাণ। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ২০১৮ সালের ৮ হাজার টাকা এখন হয়েছে ১২ হাজার টাকার কাছাকাছি। এ হিসাবে ধরলে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে মাত্র ৫০০ টাকা, আর ডলারের হিসাবে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ১৩ ডলার (২০২৮ সালে ছিল ৯৮ ডলার, ঘোষিত মজুরি ১১১ ডলার, (বিনিময় হার ১ ডলার=১১২ টাকা ধরে)। যারা বলছেন মজুরি বেড়েছে ৫৬ শতাংশ, সেটি ঠিক নয়। আসলে শ্রমিকের মজুরি বাড়েনি, শুধু পঞ্চম গ্রেডের (আগের সপ্তম গ্রেড) শ্রমিকদের মজুরি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় হয়েছে। আর অন্যান্য গ্রেডের শ্রমিকের মজুরি প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ শতাংশ বৃদ্ধি হারে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মুদ্রাস্ফীতি যেখানে ১০ শতাংশের কাছাকাছি, তখন ৬ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি কি আইনসম্মত? উল্লেখ করা দরকার, পোশাক খাতে অধিকাংশ শ্রমিক গ্রেড ৪, ৩, ২, ১-এ কাজ করেন। বৃহত্তর অংশের এ শ্রমিকদের মজুরি তেমন বাড়েনি। ফলে এ নির্ধারিত মজুরি শ্রমিকদের গণহারে ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেবে।
জীবনযাপন ব্যয় মজুরি নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। মজুরি কেন্দ্র করে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিবিদরা শ্রমিকের মজুরি প্রস্তাবের কথা বলেছেন ১৭ হাজার ৫৬৮ থেকে ৪২ হাজার টাকা পর্যন্ত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) নামক একটি শ্রমবিষয়ক বেসরকারি এনজিও তাদের গবেষণায় শ্রমিকের খাবার বাবদ খরচ পেয়েছে ১৪ হাজার ৪৩০ থেকে ১৬ হাজার ৫২৯ টাকা। অথচ ঘোষিত মোট মজুরি শ্রমিকের শুধু খাবার খরচের থেকে অনেক কম! খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণ বয়স্ক একজন শ্রমিক যে ১০ ঘণ্টা কাজ করেন, তার দরকার তিন হাজার কিলোক্যালরি। এ পরিমাণ খাবার কিনতে একজন শ্রমিকের দরকার হবে ৪৮ হাজার ৪১৮ টাকা। তাহলে কোন বিবেচনায় মজুরি বোর্ড শ্রমিকের মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করলেন? এটি কি আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? শ্রমিকের সন্তানের জন্য শিক্ষা বাবদ কোনো খরচ ধরা হয়নি, আর চিকিৎসা বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ৭৫০ টাকা, (মজুরি গেজেট, ১১ নভেম্বর, ২০২৩)। যেখানে বাংলাদেশে গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্য বাবদ ব্যয় ৫ হাজার ৯৭৫ টাকা (৫৪ ডলার, ১ ডলার সমান ১১০ দশমিক ৩২ পয়সা হিসেবে), যারা বিদেশে চিকিৎসা করে তাদের ৫ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টাকা (৫ হাজার ডলার) (বণিক বার্তা, ২৪ নভেম্বর ২০২৪)। তাহলে মালিকরা বিদেশে চিকিৎসা করবেন আর শ্রমিক শুধু ফার্মেসিতে ওষুধ কিনে খাবেন, ডাক্তার দেখানোর অধিকার তার থাকবে না। কারণ এ টাকায় একজন এমবিবিএস ডাক্তারও দেখানো যায় না। আসাদ ও নূর হোসেন জীবন দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের জন্য, স্বাধীনতার এত বছর পরও শ্রমিকের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকারও এ মজুরি বোর্ড স্বীকার করে না? তাহলে বিষয়টি এ রকম—আপনারা ‘বিজ্ঞাপন দেখে বাজার করবেন’, আপনাদের সন্তানরা মানসম্মত শিক্ষা পাবে, আর শ্রমিকরা থাকবে অভুক্ত এবং তার সন্তানরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। ভয়ের ব্যাপার হলো, ঘোষিত মজুরি ও শ্রমিকের জীবনের বাস্তব অবস্থার মধ্যে এ বিস্তর ফারাক একদিকে যেমন দশকের পর দশক শ্রমিকের জীবনকে দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্রে আটকে ফেলবে, অন্যদিকে অপুষ্টিজনিত কারণে দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকদের মধ্যে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়ে যাবে। কারণ এ শিল্পে ৬০ শতাংশ শ্রমিকই নারী (আইএলও, ২০১৯, সিপিডির গবেষণায় উদ্ধৃত)।
মালিক পক্ষ চিরাচরিতভাবে বলে আসছে, শিল্পের অবস্থা ভালো না। তারা মজুরি বাড়াতে পারবে না। কারণ হিসেবে মজুরি বোর্ডের মালিক প্রতিনিধি বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইসরায়েল এবং হামাসের যুদ্ধের কারণেও তাদের শিল্পের অবস্থা ভালো নয় এবং আগামীতে আরো ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন (মজুরি বোর্ডের প্রেস ব্রিফিং, ২২ অক্টোবর, ২০২৩)। কিন্তু এ দাবি কোনো বাস্তব তথ্য-উপাত্ত সমর্থন করে না। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালে শিল্পের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৯ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৩ বিলিয়ন থেকে ৪৭ বিলিয়ন ডলার (বিজিএমইএ, ২০২৩)। ২০২২ সালে অন্য সব দেশকে ছাড়িয়ে ইউরোপের বাজারে (পরিমাণে) বাংলাদেশ এখন শীর্ষ রফতানিকারক দেশ, পণ্যের গড় মূল্য বেড়েছে ১২ শতাংশ, অথচ শ্রমিকের মজুরি অন্য দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন, মাত্র ৭২ ডলার (ডেইলি স্টার, ডিসেম্বর ২০২২/প্রথম আলো, ৬ আগস্ট, ২০২৩)। গত পাঁচ বছরের রফতানি প্রবৃদ্ধিতে একজন শ্রমিকের অবদান বেড়েছে ৫ হাজার ১৮২ ডলার, অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ২০২২ সালের একটি গবেষণায় বলছে, বাংলাদেশের একজন শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা (৪ হাজার ৮৫৭ ডলার) কম্বোডিয়ার (৩ হাজার ৪১১ ডলার) একজন শ্রমিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু মজুরির বিচারে কম্বোডিয়ার তুলনায় আমাদের শ্রমিকের বেতন ১৬০ ডলার কম (বাংলাদেশে মজুরি ৭২ ডলার, কম্বোডিয়ার মজুরি ১২৮ ডলার)। এছাড়া রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার যে অবমূল্যায়ন হয়েছে, সে কারণে বিনা বিনিয়োগে গত এক বছরে মালিক পক্ষ বাড়তি পেয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকা, শুধু শ্রমিকের মজুরি থেকে প্রতি মাসে পাচ্ছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা (আনু মুহাম্মদ, ২০২৩; দেলোয়ার হোসেন, ২০২৩)। সুতরাং মালিক পক্ষের এ ধরনের কথাবার্তাকে কুযুক্তি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। রফতানি প্রবৃদ্ধির এ অগ্রযাত্রা এবং বিশ্ববাজারে আমাদের অবস্থান, স্বাধীনতার পর এই প্রথম। এ অর্জনের পেছনে যার ভূমিকা অগ্রগণ্য, সেই শ্রমিক কি এ অর্জনের ভাগীদার হবে না? রফতানি প্রবৃদ্ধি যে পরিমাণে হয়েছে, শ্রমিকের অবদান যেভাবে বেড়েছে, উৎপাদনশীলতা যে হারে বেড়েছে, সে অনুযায়ী হিসাব করলে বর্তমান মজুরি হওয়ার কথা ২০ হাজার ৯২৮ টাকা, এর সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক নেই, এটি তার ন্যায্যতার প্রশ্ন। মজুরি বোর্ড কি এ তথ্য বিবেচনায় নিয়েছে? ফলে মজুরি বোর্ড ঘোষিত মজুরি আইন অনুসৃত পদ্ধতি মেনে যে হয়নি সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। অনুমান করা ছাড়া উপায়ও নেই, কারণ মজুরি বোর্ডে সাত মাস অধিককাল যে বৈঠক করে এ মজুরি নির্ধারণ করেছে, তাদের এসব সভায় কী আলোচনা হয়েছে, কীসের ভিত্তিতে এ মজুরি নির্ধারণ করেছে তা জানার সুযোগ কারো নেই।
ফলে আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলেছে বোর্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে, তারা বলছে মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের অংশগ্রহণ কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ঘোষিত মজুরিতে শ্রমিকের বাস্তব প্রয়োজনের কোনো প্রতিফলন ঘটেনি (ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম, ২০২৩)। প্রায় ২০০ পোশাক ক্রেতা/ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ করে বৈশ্বিক পাঁচটি শ্রমিক অধিকার সংস্থা, তারাও প্রধানমন্ত্রীকে ঘোষিত মজুরি পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়েছে। এটাও বলেছে যে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত অর্থের ভাগাভাগি তারা করবে। যেহেতু ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণ ঘটছে, শ্রমিকের মজুরিটাও স্মার্ট হোক এবং মজুরি বোর্ডের কার্য প্রক্রিয়াও ডিজিটাল হোক, ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হোক এবং শ্রমিকদের বাস্তব প্রয়োজনের নিরিখে শ্রম আইন অনুসারে একটি যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করা হোক। অন্যথায় অভুক্ত, অপুষ্টিতে ভোগা শ্রমিক দিয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মেড ইন বাংলাদেশ উইথ প্রাইডের যে স্বপ্ন, তা মজুরি দাসত্বের কলঙ্ক নিয়েই অগ্রসর হবে।
জাফর ইকবাল: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া
ড. দেলোয়ার হোসেন: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক, ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি
কনক বর্মণ: শ্রম সংগঠক ও আমার শ্রম, আমার লড়াই, অনলাইন শ্রমিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতিষ্ঠাতা










