বন্দরে সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত বন্দর চার্জ ও শিপিং ড্যামারেজ চার্জসহ নানা সারচার্জ গুনতে হয়। পণ্য খালাসের বিলম্বের দায় আমদানিকারকদের নয়। কেননা দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তারা তাদের পণ্য যথাসময়ে খালাস করতে পারেনি। তাই বিলম্বে পণ্য খালাসে যেসব বাড়তি চার্জ রয়েছে, সেসব চার্জ মওকুফ করে খালাসীকরণ প্রক্রিয়া সহজ করতে বন্দর কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কাম্য। দীর্ঘদিন সব ধরনের উৎপাদন বন্ধ থাকায় এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হয়েছে। তার ওপর এসব চার্জ আদায় করা হলে ব্যবসায়ীদের ওপর আরো চাপ বাড়বে। ফলে তারা আরো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব চার্জ আদায় করা হলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব রাখবে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ২০১১-১২ অর্থবছরের পর সর্বোচ্চ। সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অবশ্য অর্থবছর শুরুর মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে 

৯ দশমিক ৬৯ শতাংশে দাঁড়ায়, জুনে ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গ্রাম ও শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরেই ছিল। 

সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারলে আমদানিকারকদের যেসব বাড়তি চার্জ প্রদান করতে হয় তা মওকুফ করা দরকার। তা না হলে বর্তমানে দেশে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান রয়েছে, সেটাকে আরো বাড়িয়ে দেবে। কেননা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ছিল, তার মধ্যে এসব চার্জ আদায় করা হলে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, যা সাধারণ মানুষকে আরো ভোগাবে। 

দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। এ বন্দর দিয়েই দেশের আমদানি-রফতানির সিংহভাগ সম্পন্ন হয়। এছাড়া পণ্য আমদানি-রফতানির ৯৫ শতাংশেরই শুল্কায়ন হয় চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে। কাস্টমস শুল্কায়নের পরই রফতানি পণ্য ডিপো থেকে এনে বন্দর দিয়ে জাহাজে তুলে দেয়া হয়। আবার আমদানি পণ্যের শুল্ক–কর পরিশোধ করে বন্দর থেকে খালাস করেন ব্যবসায়ীরা। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৮ জুলাই রাত থেকে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এতে বন্ধ হয়ে যায় আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। কারণ পণ্য চালানের শুল্কায়নের জন্য অনলাইনে কোনো নথিপত্র জমা দেয়া যায়নি। এছাড়া দেশে যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে পড়ে। এ কারণে সব ধরনের আমদানি-রফতানি পণ্য আটকে যায় বন্দরে। দীর্ঘ পাঁচদিন শুল্কায়ন কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর ২৩ জুলাই মঙ্গলবার বিকল্প ব্যবস্থায় চট্টগ্রাম কাস্টমস আমদানি-রফতানির শুল্কায়ন কার্যক্রম শুরু করে। গত বুধবার সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যদিও গত বৃহস্পতিবার থেকে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পুরোপুরি সচল হয়। 

কয়েক দিনের অচলাবস্থার কারণে বন্দরের ভেতরে আমদানি পণ্যের স্তূপ বেড়ে গিয়েছিল। খালাস না হওয়ায় প্রায় ৪১ হাজার কনটেইনারের স্তূপ জমে বন্দরে। তবে তা এখন ধীরে ধীরে কমছে। সরকারের পদক্ষেপই পারে বন্দরে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।

সাধারণত জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর চারদিনের মধ্যে পণ্য খালাস করতে হয় আমদানিকারকদের। এ সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করতে না পারলে অতিরিক্ত ভাড়া (ড্যামারেজ ফি) গুনতে হয় তাদের। প্রথম সাতদিনের জন্য প্রতিদিন ৬ ডলার, এরপর ১১ দিনের জন্য প্রতিদিন ১২ ডলার এবং পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিদিন ২৪ ডলার করে ড্যামারেজ ফি দিতে হয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে।

সম্প্রতি সরকারের এক মন্ত্রী ড্যামারেজ ফি মওকুফের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের আদেশ বা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি, যার কারণে তৈরি হয়েছে ড্যামারেজ ফি সংক্রান্ত জটিলতা। এ জটিলতা নিরসনে বন্দর কর্তৃপক্ষেরই উদ্যোগ দরকার। 

পণ্য আমদানি ও রফতানিকারকদের জন্য বন্দরের অতিরিক্ত চার্জ ও শিপিং ড্যামারেজ চার্জসহ অন্যান্য সারচার্জ মওকুফের দাবিও জানিয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন। ব্যবসায়ীরা ড্যামারেজ ফি মওকুফের দাবি জানালেও তাতে রাজি হয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ। বরং ব্যবসায়ীদের প্রতিটি চালানের জন্য পৃথক আবেদন করতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। এতে আরো জটিলতা বাড়বে। কেননা যদি আমদানিকারকদের আলাদা চালানে আবেদন করতে হয়, তাহলে আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আরো সময় লাগবে। এতে কনটেইনার ড্যামারেজ সময় আরো বাড়বে এবং ব্যবসায়ীদের ব্যয়ও বাড়বে। বন্দর ড্যামারেজ ফি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই পারে এ সমস্যা সমাধান করতে। 

দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। আশা করি, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার দ্রত পদক্ষেপ নেবে।