বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের পাঠানো এ কষ্টার্জিত আয়ের ওপর নির্ভর করে দেশে বৃহৎ অংকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। তবে প্রবাসীরা বৈধ পথে বিদেশ থেকে ডলার পাঠালে তা রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য হয়। অবৈধ পথে অর্থ প্রেরণ করলে সেটি রেমিট্যান্সের অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের মজুদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশের সঞ্চিত রিজার্ভ কমে যাচ্ছে, দেশের প্রয়োজন পূরণের জন্য রিজার্ভ খরচ খুব স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই সঙ্গে রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে। তাই রিজার্ভের প্রধান একটি উৎস রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু কার্যত তেমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মাত্র ১০৫ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। নিকট অতীতে কোনো মাসে এত কম রেমিট্যান্স প্রবাহ দেখা যায়নি। যদিও গত আড়াই বছরে ২৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ জন বাংলাদেশী নতুন করে বিদেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছেন।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার শুরুটা গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে। ওই সময় আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের সর্বোচ্চ দর বেঁধে দেয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। বেশি দামে ডলার বেচাকেনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দেশী-বিদেশী ছয়টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণও করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব তৎপরতার মুখেই গত বছরের সেপ্টেম্বরে এক ধাক্কায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার কমে যায়। ২০২২ সালের আগস্টে ২০৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে এলেও সেপ্টেম্বরে তা ১৫৩ কোটি ডলারে নেমে আসে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখনই ডলারের বিনিময় হার নিয়ে কঠোর হয়েছে, তখনই বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিপর্যয় দেখা গেছে।

বর্তমানেও বেশি দামে ডলার বেচাকেনা ঠেকাতে দেশের ব্যাংকগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ১০টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান বিশেষ অভিযানের মধ্যেই রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫৭ কোটি ২৬ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ৪১৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছিল। ওই সময় রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ শতাংশেরও বেশি।

দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভুল নীতিতে চলছে। ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নামে ব্যাংকগুলোয় আতঙ্ক তৈরি করেছে। এ কারণে রেমিট্যান্সের বাজার আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রেমিট্যান্স হ্রাসের বিষয়টি খেয়াল করলে দেখা যাবে আসলে বৈধ চ্যানেলে অর্থ আসা কমে যাচ্ছে। হুন্ডি ও হাওলার মতো অননুমোদিত উপায়ে দেশে অর্থ আসছে। এতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে জমা হচ্ছে না বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ। আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে হুন্ডির বাজার এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরাও অনেক প্রভাবশালী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো প্রভাবশালী হুন্ডি কারবারিদের বিরুদ্ধে কিছুই করছে না। তারা ভাসমান বিদেশী মুদ্রা বিক্রেতা ও কিছু মানি এক্সচেঞ্জে অভিযান চালিয়ে হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ব্যাংক খাতে গতকাল প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। যদিও খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) প্রতি ডলার ১১৭-১১৮ টাকায় লেনদেন হয়েছে। ব্যাংকের তুলনায় খুচরা বাজারে বেশি দাম পাওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা হুন্ডির মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আমদানি দায় মেটানোর পাশাপাশি বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপে রয়েছে বাংলাদেশ। ডলারের সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও প্রতিনিয়ত ক্ষয় হচ্ছে। ২৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল মাত্র ২ হাজার ১২০ কোটি বা ২১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সে হিসাবে গত দুই বছরের ব্যবধানে রিজার্ভের পরিমাণ অর্ধেকেরও অনেক নিচে নেমে এসেছে। দেশে ডলারের চাহিদা যখন সবচেয়ে বেশি তখন রেমিট্যান্সের বড় পতন অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। 

কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্যোগের সময় তথা ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৭ কোটি বা ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমে ২ হাজার ১৩০ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। গত অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ১৬১ কোটি ডলার। গত দুই অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহে স্থবিরতা চললেও এ সময়ে বিদেশগামী অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, শুধু চলতি ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৬ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৬ জন বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশ গেছেন। ২০২২ সালে বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৩ জন। এর আগে ২০২১ সালেও ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ বাংলাদেশী শ্রমিক অভিবাসী হয়েছেন। সব মিলিয়ে গত আড়াই বছরে বিদেশের শ্রমবাজারে নতুন করে ২৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ জন বাংলাদেশী যুক্ত হয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী বিদেশ গেলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে সেটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, যে হারে শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে সে হারে রেমিট্যান্স আসছে না। 

রেমিট্যান্স কমার প্রধান কারণ কী? বৈধ পথে রেমিট্যান্সে পর্যাপ্ত প্রণোদনা নেই। আর হুন্ডিতে বড় অংকের লাভের সুযোগ। হুন্ডিতে যদি ডলারপ্রতি অতিরিক্ত ১০ টাকা পাওয়া যায় তাহলে কেন কেউ বৈধ পথে অর্থ পাঠাবে। এক্ষেত্রে হুন্ডি ঠেকাতে হলে দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধ অর্থ পাচার ঠেকাতে তদারকি সংস্থাগুলো যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বৈধ চ্যানেলে প্রণোদনা বৃদ্ধির মাধ্যমে হয়তো কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহ; করোনাকালে যেমনটা বেড়েছিল। তবে দেশ থেকে বড় অংকের অর্থ পাচারের ফলেই হুন্ডির চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। হুন্ডিতে অর্থ পাঠানো, অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া আমাদের বেশির ভাগ শ্রমিকই নিম্ন আয়ের কাজ করে থাকেন। তাদের সুপ্রশিক্ষিত জনশক্তি হিসেবে রফতানি করতে পারলে উচ্চ আয়ের পেশায় যুক্ত হতে পারবেন তারা। রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী না হলে শিগগিরই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। এমনিতেই বছর দেড়েক ধরে দেশের আর্থিক খাত বিপর্যস্ত। এমন সময় রেমিট্যান্স হ্রাসের বিষয়টি মানা যায় না।