২০২৩ সাল বিশ্ব অর্থনীতিতে বহু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল। সুদের হার দ্রুত বৃদ্ধি সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে মন্দা এড়াতে পেরেছিল এবং প্রধান উদীয়মান বাজারগুলো ঋণ সংকটের দিকে অগ্রসর হয়নি। এমনকি জাপানের জেরিয়াট্রিক অর্থনীতিতে প্রাণশক্তি ছিল। বিপরীতে, জার্মানির প্রবৃদ্ধি থমকে দাঁড়ানোয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন পিছিয়ে পড়েছে। চার দশকের প্রবৃদ্ধির দৌড়ও আকস্মিকভাবে লাইনচ্যুত হয়েছে চীনের। 

২০২৪ সাল সামনে রেখে বেশকিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি বাগে আসবে কিনা, সমন্বিত সুদের হারের কী হবে? আবাসন খাতের অস্থিরতা ও স্থানীয় সরকারের ঋণের উচ্চমাত্রার কারণে চীন কি শ্লথগতি এড়াতে পারবে? দুই দশক প্রায় শূন্য সুদের হার বজায় রেখে, পদ্ধতিগত আর্থিক ও ঋণ সংকট উত্তরণ ছাড়া ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) কি সুদের হার স্বাভাবিক করতে পারবে? ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির বিলম্বিত প্রভাব কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মন্দার দিকে ঠেলে দেবে? আরেকটি বছরের জন্য স্থিতিশীলতা উদীয়মান বাজার কি বজায় রাখতে পারবে? সবশেষ পরবর্তী সময়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রধান উৎস কী হবে? এটা কি তাইওয়ানের ওপর চীনের অবরোধ, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়লাভ নাকি কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা? 

এসব প্রশ্নের উত্তর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্রে মন্দা বৈশ্বিক সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে কিন্তু এটা কেবল সাময়িক মুক্তি। মোট কথা, অস্বাভাবিক উচ্চ ঋণের মাত্রা, ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, নিরাপত্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং গ্রিন ট্রানজিশনসহ বিভিন্ন উপাদানগুলো ২০১২-২১ দশকের তুলনায় আগামী দশকে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ভূমিকা রাখবে। 

এরই মধ্যে বিভিন্ন কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার করেছে, যা চীনের নেতাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন। সরকার যখন নতুন উদ্যোগ দমিয়ে রাখছে তখন চীনা প্রযুক্তি সংস্থাগুলো কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে পারে তা দেখা কঠিন এবং চীনের ঋণ-জিডিপির অনুপাত ২০১৪ সালে ৪০ শতাংশ ছিল, এটা ২০২৩ সালে ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

যেহেতু চড়া স্থানীয়-সরকারি ঋণ এবং অতিরিক্ত লিভারেজ সম্পত্তি খাত মোকাবেলায় সরকারি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে চীনের উদীয়মান পরিকল্পনাটি অর্থনৈতিক ক্ষতকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই বলে মনে হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রদেশগুলোয় জাতীয় তহবিল বরাদ্দ করা, তারপর ব্যাংকগুলোকে বাজারভিত্তিক সুদহারের চেয়ে কমে দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে ঋণ দিতে বাধ্য করা এবং পরিশেষে স্থানীয় সরকারগুলোর নেয়া নতুন ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা।

কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ঋণদানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে চীনের অর্থনীতিকে চালু রাখা কঠিন। যদিও চীন এরই মধ্যে রিয়েল এস্টেট থেকে গ্রিন এনার্জি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের (জাপান ও জার্মানির গাড়ি নির্মাতাদের হতাশা) দিকে অগ্রসর হচ্ছে, রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো চীনের জিডিপির ৩০ শতাংশের ওপরে এবং সম্প্রতি এ ক্ষেত্রগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব লক্ষণীয়। 

যদিও গত বছর জাপান ভালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে, কিন্তু ২০২৪ সালে জাপানের অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়বে বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল মনে করছে। কিন্তু জাপানের ভালোভাবে চলার ক্ষমতা অর্জনের ওপর নির্ভর করছে, ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) অতি নিম্ন সুদহার নীতি থেকে সরে এসে কীভাবে অনিবার্য ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তনকে পরিচালনা করবে। 

২০২১ সালের শুরু থেকে ইয়েন ডলারের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি বাড়লেও বিওজে এ পরিবর্তনকে স্থগিত রাখতে পারেনি। জাপানের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন এবং আশাবাদী যে বৈশ্বিক সুদের হার কমলে জাপানের ইয়েন চাঙ্গা হবে এবং তাদের সমস্যার সমাধান হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৌশল নয়। সম্ভবত বিওজের সুদহার বাড়াতে হবে বা দীর্ঘমেয়াদে অপ্রচলিত মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে শুরু করবে, এতে জাপান সরকার ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে বর্তমানে যে ঋণ-জিডিপির হার রয়েছে তার চেয়ে ২৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। 

যদিও অধিকাংশ বিশ্লেষকের প্রত্যাশার বিপরীতে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দার মধ্যে পড়েনি, তবে এখন অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৩০ শতাংশ, যা স্বাভাবিক বছরগুলোয় এর সম্ভাবনা থাকে ১৫ শতাংশ। সুদের হারের ওঠানামার অপ্রত্যাশিত দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন প্রশাসন একটি ব্যাপক আর্থিক নীতি অনুসরণ করছে। 

জিডিপির অংশ হিসেবে বর্তমানে ঘাটতি ৬-৭ শতাংশ, বাইডেনের ছাত্র ঋণ মওকুফ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা সত্ত্বেও পূর্ণ কর্মসংস্থানে অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি নির্বাচনী বছরে বিভক্ত কংগ্রেসে ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা কম। গত তিন বছরের ক্রমপুঞ্জিত মুদ্রাস্ফীতি কার্যত সরকারি ঋণের ওপর ১০ শতাংশ খেলাপির সমান—এই একক ঘটনা যা গুরুতর পরিণতি ছাড়া শিগগিরই পুনরাবৃত্তি করতে পারবে না। 

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আঘাতের মধ্যেও ২০২৩ সালে উদীয়মান বাজারগুলো সংকট এড়াতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও নীতিনির্ধারকদের সনাতন সামষ্টিক আর্থিক কৌশল গ্রহণের কারণে কিছু দেশ ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনাকে পুঁজি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত ইউক্রেনের যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ তেল সংরক্ষণ করেছে, অন্যদিকে তুরস্ক রাশিয়ায় অনুমোদিত ইউরোপীয় পণ্য পরিবহনে প্রধান পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

যেহেতু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে এবং জরিপে দেখা গেছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনপ্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং ২০২৪ সাল আরেকটি অস্থিতিশীল বছর হতে চলেছে। উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য বিশেষভাবে সত্য যে ২০২৪ সাল যদি প্রত্যেকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

কেনেথ রগফ: আইএমএফের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও পাবলিক পলিসির অধ্যাপক

ভাষান্তর: দিদারুল হক