স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এজন্য সরকারকেই জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান আধুনিক নগর রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে যেহেতু দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করে, সে হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে হবে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেন না—এ অভিযোগ অনেক পুরনো। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন থাকার পরও কেন এমনটি হচ্ছে সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আবার সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে অভিযোগের সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থাৎ অভিযোগ যেন উপযুক্ত ক্ষেত্রেই প্রয়োগ হয় এবং এর সমাধান উঠে আসে সেটি সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়, তাহলেও এক্ষেত্রে পিছপা হওয়া যাবে না। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, দেশের প্রাথমিক থেকে বিশেষায়িত (টারশিয়ারি) সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রে অর্ধেক চিকিৎসকই অনুপস্থিত থাকেন। সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় একদিকে চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে, পাশাপাশি সেবাপ্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। এতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ থাকার পরও শুধু চিকিৎসকের অনুপস্থিতি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের উপস্থিতির হার অর্ধেকেরও কম।

দীর্ঘদিন ধরেই এমনটি কেন হচ্ছে? এর সদুত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জরুরি বিভাগ ও আন্তঃবিভাগের রোগীদের চিকিৎসা বাদে বহির্বিভাগের কর্মসময় সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। এ ৬ ঘণ্টাকে সরকারি সব পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সময় হিসেবে ধরা হয়। বহির্বিভাগের চিকিৎসা, কনসালটেশন, রোগ নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন কাজ হয় এ সময়ে। 

সকালবেলা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি সেবাপ্রার্থীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়। অথচ চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন—এ পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে থাকেন। সে হিসেবে তারা কেন মূল কর্মস্থলকে অবহেলা করেন, এর কারণ অনুসন্ধান জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও কাজের অতিরিক্ত চাপ, কর্মজীবনের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা চিকিৎসকের অনুপস্থিত থাকার বিষয়কে প্রভাবিত করে বলে মত দেন। এক্ষেত্রে দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। নইলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ থাকার পরও শুধু চিকিৎসকের অনুপস্থিতি সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের বাইরে জেলা-উপজেলায় সরকারি চিকিৎসকের অনুপস্থিতির হার তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ যেখানে চিকিৎসকদের উপস্থিতি অত্যধিক জরুরি, সেখানেই চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এমনটি অব্যাহত থাকলে ঢাকামুখী চিকিৎসার যে স্রোত তা বিকেন্দ্রীকরণ অসম্ভব হয়ে যাবে। এমনকি জরুরি অবস্থায় একজন মুমূর্ষু রোগীর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে না। আবার রাজধানী ঢাকায়ও চিকিৎসকদের উপস্থিতির হার হতাশাব্যঞ্জক। তিন বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক অভিযানে এ হার ৪০ শতাংশ বলে জানা যায়। তার মানে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীতেও সরকারি হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসাসেবা মেলে না। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের উপস্থিতির হার প্রায় ৮০ শতাংশ দাবি করা হচ্ছে। এমনকি জরুরি বিভাগে কখনো চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকেন না—এ কথার সত্যতাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত অন্য কর্মীদের ঘাটতি দূর করতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় চিকিৎসাসেবায় সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পাশাপাশি সার্বক্ষণিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। আমাদের দেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলো এ রকম সেবা প্রদানের চেষ্টা করলেও দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। তাই সরকারি হাসপাতাল পরিচালনায় আরো বেশি পরিকল্পিত ভূমিকা গ্রহণ প্রয়োজন। এজন্য চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অবহেলা করলে পুরো চিকিৎসা খাতই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কারণ চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে নার্সরা রোগীদের সেবা দেন। এক্ষেত্রে যথাযথ দক্ষতার ঘাটতিতে ভুল চিকিৎসার উদাহরণ দেখা যায়।

মূলত চিকিৎসাসেবা একটি মানবিক পেশা। অসুস্থ মানুষের সেবা করার মহান ব্রত নিয়েই এ পেশায় আসতে হয়। নিছক অর্থ উপার্জনের জন্য ডাক্তারি পেশায় এলে এ পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। একজন চিকিৎসকের অবশ্যই টাকা উপার্জনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আগে মূল কর্মস্থলকে প্রাধান্য দেয়া নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি হাসপাতাল বাদ দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বেশি শ্রম দেয়া নৈতিকতার কোনো সংজ্ঞার ভেতর পড়ে না। তাই উপযুক্ত কারণ ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিতির যে অভিযোগ রয়েছে, তা সত্য হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোয় সীমিত জনবল ও সামর্থ্যের মধ্যে রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। এর মধ্যেই রোগী মারা গেলে হাসপাতাল ভাংচুর ও চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। তাই চিকিৎসকরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আইন প্রণয়নের দাবি করেন। এজন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়কেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। চিকিৎসকদের দাবি, দেশের বিদ্যমান বিভিন্ন আইনেই রোগীদের সুরক্ষা দেয়া সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় কোনো আইন নেই। এজন্য তারা কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বস্তুত চিকিৎসাসেবা একটি বহুপক্ষীয় বিষয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের ভূমিকার পাশাপাশি রোগী ও তাদের স্বজনদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। আবার একতরফাভাবে শুধু চিকিৎসকদের স্বার্থ দেখার দাবি জানানোর অভিযোগও উঠেছে প্রস্তাবিত আইনে। কেননা ২০১৪ সালে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়। ২০১৬ সালে চিকিৎসকদের বাধার মুখে খসড়ায় কিছু বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করে ‘রোগী এবং স্বাস্থ্যসেবাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন-২০১৬’ নামকরণ হয়। এমন অভিযোগ চিকিৎসকরা অস্বীকার করলেও এর সামগ্রিক প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমরা সরকারি বেতনভোগী চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে প্রত্যাশা করি। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে যথাযথ করণীয় নির্ধারণ করা হবে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।