নারীদের সার্বিক কল্যাণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গত নভেম্বরে গঠন করা হয় ১০ সদস্যবিশিষ্ট নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন। এ কমিশনের প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল তাদের প্রধান বিবেচনা হবে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য নিরসন এবং নারী-পুরুষ সমতা অর্জনে পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো বিভিন্ন মেয়াদে বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরি করা। গত শনিবার এ কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ‘সর্বক্ষেত্রে সর্বস্তরে নারীর প্রতি বৈষম্য বিলুপ্তি এবং নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে নারীর উন্নয়নে ১৫টি সংস্কার প্রস্তাব তিনটি মেয়াদে ভাগ করে উপস্থাপন করা হয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে করণীয়, পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদে করণীয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন নারী আন্দোলনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। এ স্তরভিত্তিক সুপারিশমালা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটা ধারাবাহিকতার ওপর জোর দিয়েছে। এখানে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সংবিধান থেকে শুরু করে দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে নারীদের সুরক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের চলমান সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো পূরণে জোরালো উদ্যোগ নেয়া। সেই সঙ্গে এমন একটা টেকসই পথনকশা প্রণয়ন করা, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে নারী উন্নয়নের নিমিত্তে নানা নীতিমালা, আইন ও কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও তার বাস্তব প্রভাব সেভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। বরং নারীরা আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি নারীদের সমতা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে নীতি কৌশল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সেগুলোর বাস্তবায়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তুলনামূলক সহজ কার্যক্রমগুলো যত দ্রুত সম্ভব সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের মধ্যে অসমতা তৈরি করা সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। যেমন ‘সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্যমূলক বিধান বিদ্যমান, বিশেষ করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও ভরণপোষণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন অনুসরণ বাধ্যতামূলক হওয়ায় নারীরা বৈষম্যের শিকার হন’। এতে নারী-পুরুষের মধ্যে অসমতা তৈরি হয়েছে, যা নারীদের সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ করে রেখেছে। এছাড়া নারী নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কিত আইনের বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে কারণে আইনের পাশাপাশি সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৮(৩), ২৯, ৩২ ও ৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সুপারিশ করা হয়েছে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন পরিহার করে সব ধর্মের নারীর জন্য সমানাধিকার নিশ্চিতে অভিন্ন পারিবারিক আইন (Uniform family Code) প্রণয়নের, যা ঐচ্ছিকভাবে প্রযোজ্য হবে। পারিবারিক আইন সংস্কারে এ সুপারিশ বড় মাইলফলক হতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ ও সমতাভিত্তিক আইনি কাঠামো নারীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে সহায়ক হবে।
আবার দীর্ঘমেয়াদে নারীদের সমতা ও সুরক্ষায় কাজ করতে একটি স্থায়ী নারী কমিশন প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যমূলক আইন পর্যালোচনা ও সংশোধন, বাজেট ও জাতীয় পরিকল্পনায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা, প্রযুক্তি ও STEM শিক্ষায় নারীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, মাতৃত্ব-পিতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকরকরণ, শ্রম ও সেবা খাতে নারীর নিরাপত্তা এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নারীর সরাসরি নির্বাচনে সুযোগসহ ৩০০ সংরক্ষিত আসনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করা, যৌন পেশাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত না করা এবং শ্রম আইন সংশোধন করে যৌনকর্মীদের মর্যাদা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নারীর প্রতি সব ধরণের বৈষম্য বিলোপ সনদের (সিডো) দুটি ধারার ওপর সংরক্ষণ প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৮৯ ও ১৯০ অনুচ্ছেদ অনুস্বাক্ষর করার সুপারিশ করেছে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো সব প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছয় মাস ছুটি দেয়া এবং পূর্ণ বেতনসহ পিতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনসহ ৪৩৩টি সুপারিশ রয়েছে প্রতিবেদনে। আর দীর্ঘমেয়াদের সুপারিশগুলো ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণের কথা বলে। যেখানে একজন নারী নিজের জীবন নিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন; কর্মক্ষেত্র, সংসদ কিংবা গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি থাকবে মর্যাদাপূর্ণ ও তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এসব সুপারিশ বা সংস্কার প্রস্তাব পর্যালোচনা করলে একটা বিষয় প্রতীয়মান হয় যে এগুলো বেশ গোছানো পরিকল্পনা যেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক উদ্যোগ।
তাছাড়া এসব পদক্ষেপ কেবল নারীর জন্যই নয়, পুরো সমাজের জন্য উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের কাজটি পরিচালিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, কিন্তু এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। তবে সেটি সম্ভব অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে। তবে সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ওপরও একটা নারীবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব বর্তায়।
বেশির ভাগ সময় দেখা গেছে, যুগোপযোগী সুপারিশমালা তৈরি হয়। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। যে কারণে এখনো সমাজে নারীরা পিছিয়ে। নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হয়। অথচ ৯০ শতাংশের বেশি নারী অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। আবার নানা ক্ষেত্রে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, পরিবারের ঘনিষ্ঠজন কর্তৃক হামলার শিকার হতে হয়, মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। আবার নারীরা যেকোনো প্রয়োজনে, আন্দোলনে যুগে যুগে সামনের সারিতে ঢাল হয়ে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু পরে প্রতিনিধিত্বশীল বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের সামনে দেখা যায়নি। যার সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের নারীদের হারিয়ে যেতে দেখা গেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নারী-পুরুষ বা মোট জনসংখ্যার অনুপাতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে তাই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাছাড়া মনে রাখা প্রয়োজন, সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ না বাড়লে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে না।










