মোহাম্মদ ফোরকান উদ্দীন পেশাদার হিসাববিদদের সংগঠন দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) প্রেসিডেন্ট। এম এম রহমান অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের ম্যানেজিং পার্টনার তিনি। এর আগে ২০২০ সালে আইসিএবির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং টানা দুই মেয়াদে কাউন্সিল সদস্য ছিলেন। সম্প্রতি তিনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক অবস্থা ও নিরীক্ষা চর্চার নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান রাহাত
সম্প্রতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরীক্ষা করতে গিয়ে এ সংকটের কী ধরনের প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন?
যে চাপ বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে, কাজ করতে গিয়ে সেটি আমরা ভেতর থেকেও টের পাচ্ছি। আমাদের প্রায় সব কাঁচামালই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বেড়ে গেছে। পাশাপাশি প্রাপ্যতার সংকটের কারণে কোম্পানিগুলোকে এলসির (ঋণপত্র) জন্য ডলার জোগাড় করতে বেগ পেতে হচ্ছে। আগে যেখানে এক ব্যাংকের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় ডলার পেত এখন সেটি একাধিক ব্যাংকের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে পণ্যের দামও বাড়াতে হচ্ছে। আর পণ্যের দাম বাড়ার কারণে সেটি সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়সীমাকে অনেক ক্ষেত্রেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাবে পণ্যের ভোগ কমে যাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। কিন্তু সেখানে অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আয় কমে গেছে। পাশাপাশি প্রবাসীদের আয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো দেশে বিভিন্ন ধরনের করারোপ করা হয়েছে। যার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার কথা সেটি আসছে না। এবার আসি রফতানির বিষয়ে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং এতে গার্মেন্টসের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু যে হারে ব্যয় বেড়েছে সে হারে কিন্তু রফতানি মূল্য বাড়েনি। ফলে প্রকৃতপক্ষে ডলারের হিসাবে আমাদের রফতানি আয় কিন্তু কমে গেছে। তাছাড়া গণমাধ্যমের সংবাদেও রফতানির পরিমাণ কমার তথ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি। সব মিলিয়ে এ বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলেছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
আপনি ব্যবসার ব্যয় বাড়ার কথা বলছিলেন। কোন কোন খাতে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে?
তৈরি পোশাক খাতের কথা তো বলেছি। দেশের ওষুধ খাতে ব্যবহৃত উপাদানগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ খাতেও ব্যয় বেড়েছে। একই অবস্থা সিরামিক খাতেরও। আমাদের সব ধরনের রাসায়নিক আমদানি করতে হয়। চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত চামড়া স্থানীয় হলেও এর প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়েছে। বিদেশে চামড়া রফতানি সেভাবে বাড়াতে পারিনি। শুধু কৃষি খাত আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। যদি কোনো কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় তাহলে আমরা টিকতে পারব না। ফলে এ জায়গায় আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রায় প্রতিটি শিল্পের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। জাহাজ ভাড়া, জ্বালানির দাম ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের দাম আরো বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে। এসব ব্যয় বাড়ার একটি চেইন ইমপ্যাক্ট রয়েছে, যে কারণে আমরা মূল্যস্ফীতিকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চিন্তা করেছিলাম বাস্তব পরিস্থিতির কারণে সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা আছে। কিন্তু সুদহার বাড়ানো মানে হচ্ছে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। আর অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হলে সেটি শিল্পের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হলে এর প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপরও পড়বে। তাছাড়া ব্যাংক ঋণের কত শতাংশ ভোগে ব্যয় হয় আর কত শতাংশ শিল্পে বিনিয়োগ হয় সেটিও দেখার বিষয়। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানো এবং দেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয়েছে সেটি ফিরিয়ে আনা। এজন্য যা করা প্রয়োজন তা করা উচিত। যদি বাইরে থেকে অর্থের প্রবাহ বাড়ে তাহলে আমাদের অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির বিদ্যমান অবস্থা যদি আরো দীর্ঘায়িত হয় তাহলে সেটি আমাদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় ব্যাংক খাতের সংস্কারের শর্ত রয়েছে। ফলে ব্যাংকের নিরীক্ষা ও হিসাব মানের ক্ষেত্রেও বেশকিছু পরিবর্তন আসবে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নিরীক্ষকদের বেশকিছু দায়িত্ব দিয়ে একটি খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। সেখানে নিরীক্ষকদের ওপর অনেকগুলো অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এটা নিয়ে আমরা চিন্তা করছি যে আমাদের নিরীক্ষার জন্য যে সময় দেয়া হয় সে সময়ের মধ্যে এসব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে কিনা। পাশাপাশি এসব কিছু নিয়ে কাজ করার সুযোগ আমাদের আছে কিনা সেটি নিয়েও চিন্তা করছি। এ কাজগুলো করার সময় ও সুযোগ যদি না থাকে তাহলে তো শুধু দায়িত্ব নিয়ে কোনো লাভ হবে না। আমরা এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা করব। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারে আমাদের অনেক সময় নিরীক্ষা করতে হয়। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরীক্ষা করার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারে পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
দেশে নিরীক্ষার গুণগত মান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
আমাদের এখানে জাল নিরীক্ষা প্রতিবেদন বেশ বড় একটি সমস্যা ছিল। তবে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) প্রবর্তনের মাধ্যমে এটি অনেকাংশেই বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি কারণ যেসব সংস্থার এসব প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে দেখার কথা তারা হয়তো সেটি পরিপূর্ণভাবে করতে পারছে না। নিরীক্ষার গুণগত মানের বিষয়ে আমাদের স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করছে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক সদস্যকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। তাছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তীক্ষ্ণ দৃষ্টিও রয়েছে আমাদের ওপর। আমি বলছি না যে এখানে কোনো সমস্যা নেই। সব পেশার ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু সমস্যা থাকে। তবে এটা আমি হলফ করে বলতে পারি যে আগের তুলনায় নিরীক্ষা মানের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় এটি আরো উন্নত হবে বলে আমি মনে করি।
নিরীক্ষার ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী?
বর্তমানে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সব কোম্পানির হিসাব বছর জুনে শেষ হয়। ফলে জুন শেষে একসঙ্গে অনেক বেশি নিরীক্ষার চাপ পড়ে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। তবে এ চাপ নেয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে যেসব প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি তাদের আরো স্বচ্ছ হতে হবে। এছাড়া নিরীক্ষা করতে গিয়ে সময় ব্যবস্থাপনা ও তথ্য সংগ্রহের মতো বিষয়ে আমাদের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়।
বেশকিছু নিরীক্ষক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও অনেক বেশি নিরীক্ষা করেছেন। এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা এফআরসির পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
এ ধরনের বিষয় আমাদের কাছেও এসেছে। আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এগুলো তদন্ত করে যেখানে ব্যত্যয় পেয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সামনেও আমাদের এ ধরনের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে আপনারা শাস্তি দিলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সদস্য উচ্চ আদালতের কাছ থেকে এর বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ নিয়ে এসে নিরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
উচ্চ আদালতের কাছে যে কেউ আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন, এটা তার অধিকার। কিন্তু এ ধরনের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ এলে আমরা সেটি আইনিভাবে মোকাবেলা করছি। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের উদ্যোগের কারণে সেই স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা রদ হয়ে গেছে। আগের চেয়ে আমাদের আইনি কার্যক্রম আরো জোরালো হয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অনেক সময় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতিবেদনে অতিরঞ্জিত তথ্য দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধেও যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
আমাদের আগে দেখতে হবে পুঁজিবাজারে কারা আসে? কী উদ্দেশ্যে আসে এবং ভালো কোম্পানিগুলো আসে না কেন? অনেক সময় দেখা যায় যে স্বল্প পরিচিত কোম্পানিগুলো তাদের ভ্যালুয়েশন বাড়ানোর জন্য পুঁজিবাজারে আসছে। ফলে তাদের আর্থিক ও ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স আশানুরূপ হবে কীভাবে? অন্যদিকে ভালো কোম্পানিগুলো সেভাবে পুঁজিবাজারে আসছে না। একটি কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কর্তৃপক্ষ, ইস্যু ব্যবস্থাপক, অবলেখক, নিরীক্ষক, স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। ফলে এককভাবে নিরীক্ষকদের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। তবে নিরীক্ষকদের ক্ষেত্রে একেবারেই যে সমস্যা নেই তা বলব না। যদিও এ সংখ্যা খুব বেশি নয়।
দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিরীক্ষা পেশায় উদ্বুদ্ধ করতে আইসিএবি উদ্যোগ নিয়েছিল। এ উদ্যোগের বিপরীতে আপনারা কেমন সাড়া পেয়েছেন?
অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই এ বিষয়ে আমাদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস পর্যালোচনা করে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সির ক্ষেত্রে কোন কোন কোর্সের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হবে সেটি আমরা নির্ধারণ করে দিয়েছি। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষার্থীদের এ পেশার প্রতি আকৃষ্ট করা। এতে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। সামনের দিনগুলোয়ও আমাদের এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।










