সুস্থতা মানবদেহের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। শরীরে অসুখ বাসা বাঁধলে নিরাময়ের জন্য চিকিৎসাসেবার দ্বারস্থ হতে হয়। এক্ষেত্রে ছোটখাটো অসুখে চিকিৎসা পেলেও দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বড় ধরনের অসুস্থতায় দেশে কাঙ্ক্ষিত মানের চিকিৎসাসেবা গড়ে ওঠেনি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর দেশের অধিকাংশ মানুষ নির্ভরশীল হলেও অপ্রতুল বরাদ্দে পরিপূর্ণ চিকিৎসা না পাওয়ার অহরহ অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসাসেবার ওপরও সন্তুষ্টি আশাব্যঞ্জক নয়। ফলে জটিল রোগ হলে সামর্থ্যবানরা বিদেশে ছুটছেন। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে, তেমনি দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে জনপ্রতি চিকিৎসা ব্যয় গড়ে ৫৪ ডলার বা ৫ হাজার ৯৯৪ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজারের আকার প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবা নিতে বহির্গমনকারী রোগীর সংখ্যা ৭ লাখ। বিডার হিসাবে, এ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার দেশের বাইরে চলে যায়। ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহির্গমনকারী এসব রোগীর বার্ষিক মাথাপিছু ব্যয় গড়ে ৫ হাজার ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণে বিপুল পরিমাণ ব্যয় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের সর্বোচ্চসংখ্যক হলেন ক্যান্সারের রোগী, যা মোট বিদেশগামী রোগীর ২১ শতাংশ। এরপর ১৮ শতাংশ যাচ্ছেন হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে। এছাড়া বাকিরা যাচ্ছেন প্রজনন জটিলতা, অর্থোপেডিক চিকিৎসা, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, লিভার, কিডনি, চোখ, কান ও স্নায়বিক চিকিৎসার জন্য। চলতি বছরের মে মাসে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জার্নাল ফ্রন্টিয়ার্সে ‘ডিটারমিনেন্টস অব বাংলাদেশী পেশেন্টস ডিসিশন মেকিং প্রসেস অ্যান্ড স্যাটিসফেকশন টুওয়ার্ড মেডিকেল ট্যুরিজম ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলা হয়, ভারতের হাসপাতালগুলো বছরে বাংলাদেশী রোগী পায় প্রায় সাড়ে চার লাখ। তবে মেডিকেল ভিসা ছাড়াও অন্যান্য ভিসা নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর তথ্য রয়েছে। ওই গবেষণায়ও রোগীদের বিদেশমুখিতার পেছনে বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়, দীর্ঘসূত্রতা, চিকিৎসার সহজলভ্যতার অভাবসহ বিভিন্ন কারণকে দায়ী করা হয়।

গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগও ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে দেশে বেসরকারি হাসপাতাল ছিল ৩৮৪টি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ গুণেরও বেশিতে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জেলা বা জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা হাসপাতালসহ (ইউনিয়ন পর্যায় বাদে) বিভিন্ন পর্যায়ের হাসপাতাল রয়েছে ৬৪০টি। এর বাইরেও সরকারের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে দেশে নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা এখন ৭ হাজার ৮৫৪। দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট শয্যা সংখ্যা ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি। এর মধ্যে বেসরকারিতে রয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার শয্যা। আর বেসরকারি রোগ নিরীক্ষা কেন্দ্র আছে প্রায় ১০ হাজার। ব্লাড ব্যাংক আছে ১৮০টি।

যেসব দেশে রোগীরা চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, সে দেশগুলোয় চিকিৎসাসেবা উন্নত হওয়ায় তারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। এক্ষেত্রে দেশগুলোর বিশ্বব্যাপী সুনামও রয়েছে। এভাবে বিদেশে গিয়ে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে যেভাবে দেশের রোগীরা চিকিৎসাসেবা লাভ করেন, তাতে বিদেশে যাওয়া রোগীর সংখ্যা প্রকারান্তরে বাড়ছে। অথচ আমাদের দেশে এখন অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা হয়। কিন্তু আস্থার সংকটের ফলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনাগ্রহ লক্ষণীয়। বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়, তা প্রকারান্তরে দেশে ব্যয় করলে আমাদের চিকিৎসা খাত লাভবান হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে না। এখানে বিশ্বমানের হাসপাতালগুলোর আলোকে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হলেও আস্থার সংকট কাটছে না। এছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলোয় সেবা গ্রহণে অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উপযুক্ত বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আবার প্রাইভেট প্র্যাকটিসে সেবার তুলনায় অর্থকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষোভও আছে। বস্তুত সরকারি হাসপাতালগুলোয় অর্থ বরাদ্দ দিলেই যে চিকিৎসাসেবার মান ভালো হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাটের বিষয় অতীতে বারবার সামনে এসেছে। তাই কীভাবে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ তৈরি করা যাবে, এখন সেটি নিয়ে ভাবার সময়। যারা চিকিৎসাসেবার মতো মহৎ পেশায় আসছেন তাদের রোগীদের প্রতি আরো মানবিক হওয়া প্রয়োজন। রোগীরা দেশের চিকিৎসাসেবায় যেন আস্থা খুঁজে পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে এভাবেই প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে চিকিৎসাসেবার জন্য ব্যয় হবে এবং দিনে দিনে তা বাড়তে থাকবে।