দেশের অর্থনীতির আকার অনেক বড় হয়েছে। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদনের ফলে বেড়েছে ব্যাংকের সংখ্যা। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ব্যাংক খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যাংক খাতে বেড়েছে নানা সংকট। নানা চেষ্টা করেও তা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক যে কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সুশাসন ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। দুর্বল ব্যাংকের উন্নতি না হলে সেগুলোকে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে। তবে একীভূত করার ক্ষেত্রে রয়েছে প্রশ্ন। 

এদিকে খেলাপি ঋণে আমরা পাকিস্তানের কাছাকাছি থাকলেও প্রতিবেশী ভারত-শ্রীলংকার থেকে বেশি। ভারতের ব্যাংক খাতে সুশাসন থাকায় ভারতের অবস্থান এক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো। আমরা দেশে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। কারণ যারা পরিচালক তারাই আবার ব্যাংকের মালিক এবং তারাই ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের কাজে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন। তবে এক্ষেত্রে ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কার করে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ব্যাংকার্স সভার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ব্যাংক খাতের সংস্কার ও করপোরেট সুশাসন। প্রভাবশালী ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেয়া হয়। সভায় জানানো হয়, ঋণখেলাপিদের সঙ্গে আর আপস নয়। ব্যাংক খাত আইন অনুযায়ী চলবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে আর কোনো সুবিধা দেয়া যাবে না। ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। মামলায় আটকে থাকা অর্থ আদায়ে অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ দেয়ার বিষয়েও ব্যাংক নির্বাহীদের তাগাদা দেয়া হয়। এছাড়া তারল্য সংকট, ক্রলিং পেগ নীতির বাস্তবায়ন, ডলার সোয়াপের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দেয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণীত প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর উন্নতি না হলে সেগুলো অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত (মার্জ) করার বার্তা রয়েছে।

দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র কেমন, তা সুস্পষ্ট নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর অনেক বেনামি ঋণ রয়েছে, যা খেলাপি ঋণের হিসাবের বাইরে। ফলে দুর্বল ব্যাংককে ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাই এক্ষেত্রে সঠিক গাইডলাইন অনুসরণ করা প্রয়োজন। যাতে দুর্বল ব্যাংকের প্রভাবে ভালো ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেক্ষেত্রে বেনামি ঋণের সঠিক তথ্য প্রকাশ করাও প্রয়োজন। 

যে দেশের অর্থনীতি যত বেশি সুসংহত, সে দেশে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ব্যাংকের সংখ্যা তত কম। এক্ষেত্রে আমরা থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার দিকে তাকালে দেখতে পাই যে তাদের অর্থনীতির আকার বেড়েছে। একই সঙ্গে অর্জন করেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। অর্থনীতির আকার বিবেচনায় সেসব দেশে স্থানীয় ব্যাংকের সংখ্যা বাড়েনি। এসব দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ায় সেখানে বিদেশী ব্যাংকগুলোর আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। থাইল্যান্ডের জিডিপির আকার ছাড়িয়েছে ৫০০ বিলিয়ন ডলার। দেশটিতে সরকারি খাতে মাত্র ছয়টি এবং বেসরকারি খাতে মাত্র ১২টি ব্যাংক। অর্থাৎ সব মিলিয়ে দেশটিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিজস্ব ব্যাংকের সংখ্যা ১৮। এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ সিঙ্গাপুরে স্থানীয় ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র পাঁচটি। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ায় স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র আটটি। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ায় প্রতিনিয়ত দেশগুলোয় বিদেশী ব্যাংকগুলো শাখা খুলছে। থাইল্যান্ডে ৪৫টি, সিঙ্গাপুরে ২২টি ও মালয়েশিয়ায় ২৬টি বিদেশী ব্যাংক। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও আমাদের চেয়ে ব্যাংকের সংখ্যা কম। দেশটিতে ১২টি সরকারি ও ২২টি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে। তবে ভারতে অঞ্চলভিত্তিক ৪৩টি ব্যাংকের পাশাপাশি ৪৬টি বিদেশী ব্যাংকও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফিলিপাইনের সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৭টি ব্যাংক। তবে ফিলিপাইনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ২৯টি বিদেশী ব্যাংক। অন্যদিকে এসব দেশের তুলনায় ব্যাংক খাতে বাংলাদেশের চিত্র পুরো উল্টো। বর্তমানে দেশে তফসিলভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। এর মধ্যে বিদেশী ব্যাংক নয়টি। তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংকসহ দেশে মোট নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক আছে। বাকি ৪৩টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে। 

দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। প্রভাবশালী বিবেচনায় প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিচ্ছে সরকার। ফলে ব্যাংক খাতে বেড়েছে অস্থিতিশীলতা। সেই সঙ্গে বেড়েছে অনাদায়ী ঋণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এছাড়া দেশের প্রায় সব ব্যাংকেরই মূলধন কাঠামো দুর্বল। নতুন করে কোনো বিদেশী ব্যাংকও দেশে আসছে না। আশির দশকে যেসব বিদেশী ব্যাংক দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করত তারাও নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে গেছে। তবে ব্যাংক খাতে এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন বন্ধ না হলে দেশের ব্যাংকিং ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকবে। আমাদের দেশের সব ব্যাংকের সেবার ধরন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম একই। তবে মুনাফা করে কিংবা রাইট শেয়ার ইস্যু করে মূলধন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাগজে-কলমে ক্ষমতা ও নিয়মনীতি রয়েছে। তবে তার প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের আর্থিক স্বার্থে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। আর্থিক ও ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ খাতে প্রভাবশালীদের প্রভাব কমিয়ে এনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ তা প্রশংসনীয়।