সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য ওষুধ সংকটের অভিযোগ বেশ পুরনো। এক্ষেত্রে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হাসপাতালগুলোর মৌলিক দায়িত্ব। এজন্য বিকল্প ওষুধ ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তাই অসুস্থ ব্যক্তিরা যেন হাসপাতালে গিয়ে যথাযথ চিকিৎসা পায়, সেটি তদারক করা প্রয়োজন।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বড় অস্ত্রোপচারে রোগীকে পুরোপুরি অচেতন করার ক্ষেত্রে দেশে হ্যালোথেন নামের অ্যানেস্থেসিয়ার সহজলভ্যতা ও প্রচলন রয়েছে। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী ওষুধটি নিয়ে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। কাঁচামাল সংকটের কারণে প্রায় ছয় মাস ধরে এর উৎপাদন বন্ধ রেখেছে দেশের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এতে সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় যেমন সংকট দেখা দিয়েছে, তেমনি রোগীদের অস্ত্রোপচারের খরচও বেড়ে গেছে। বিকল্প ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা ও অধিক দাম এবং রোগীর শরীরে প্রয়োগের আগে বাষ্প করার মেশিনের অপর্যাপ্ততার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক, ওষুধ বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
দেশে টারশিয়ারি (বিশেষায়িত) পর্যায়ের অন্তত পাঁচটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরে ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হ্যালোথেন (তরল) ওষুধের সরবরাহ প্রায় দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। হাসপাতাল থেকে এটি বিনামূল্যে রোগীদের শরীরে প্রয়োগ করা হতো। সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালের রোগীরা নিজ উদ্যোগে বিকল্প ওষুধ সংগ্রহ করছেন। দেড়-দুই হাজার টাকার ওষুধ এখন কিনতে হচ্ছে ১০-৩০ গুণ দামে। কোনো কোনো হাসপাতালে আরো বেশি সময় ধরে ওষুধটির সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে নাক, কান ও গলা (ইএনটি), সি সেকশন, বাইপাস সার্জারি, স্নায়বিক, কিডনিসহ বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হ্যালোথেন ছাড়া একই গোত্রের বিকল্প ওষুধ দেশে দুষ্প্রাপ্য এবং স্থানীয় কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিকল্প ওষুধগুলো উৎপাদন শুরু করেনি।
হ্যালোথেনের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় হ্যালোথেন ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়। এর বেশকিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণও এটি। উন্নত দেশগুলো এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে ওষুধটির প্রয়োগ বন্ধ করেছে। একই কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এবং এফডিএ। সংস্থাটির মতে, হ্যালোথেনের বিকল্প ওষুধ হিসেবে একই গোত্রের অন্যান্য ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে অ্যানেস্থেসিয়ার ফলে রোগীর শরীরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে লিভার ও কিডনির ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। তিন বছরের কম বয়সী শিশু বা গর্ভবতী নারীদের অস্ত্রোপচারে সাধারণ চেতনানাশক ও নিরাময় ওষুধের বারবার ব্যবহার মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। হ্যালোথেন প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর জন্য শতভাগ নিরাপদ না হওয়ায় উন্নত দেশগুলোয় আইসোফ্লুরেন, এনফ্লুরেন, ডেসফ্লুরেন ও সেভোফ্লুরেন ব্যবহার করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা ইউসিএলএ হেলথের ভাষ্যমতে, মূলত চার পর্যায়ের অ্যানেস্থেসিয়া রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সাধারণ অ্যানেস্থেসিয়া, আঞ্চলিক (রিজিওনাল) অ্যানেস্থেসিয়া, উপশম (সেডাকশন) অ্যানেস্থেসিয়া ও লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া। অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য পদ্ধতির (প্রসিডিউর) সময় রোগীর ব্যথা প্রতিরোধ করার জন্য ওষুধের ব্যবহার করে অ্যানেস্থেসিয়া দেয়া হয়। এগুলো সাধারণত ইনজেকশন, ইনহেলেশন, টপিক্যাল লোশন, স্প্রে, চোখের ড্রপ। এর মাধ্যমে রোগীকে অচেতন করা হয়। অস্ত্রোপচারের ধরন অনুযায়ী কখনো রোগীকে পুরোপুরি ঘুমের মধ্যে অচেতন করা হয়, আবার কখনো কখনো যে অংশে অস্ত্রোপচার হয় শুধু সেই অংশের ব্যথার অনুভূতি না হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এ চার ধরনের অ্যানেস্থেসিয়ার মধ্যে সাধারণ অ্যানেস্থেসিয়ার মাধ্যমে রোগীকে পরিপূর্ণভাবে অচেতন করা হয়। এতে রোগী ঘুমিয়ে থাকে। সাধারণ অ্যানেস্থেসিয়ার জন্য হ্যালোথেন ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এটি বাংলাদেশে সহজলভ্য ও তুলনামূলক দাম কম।
বাংলাদেশে হ্যালোথেন ওষুধ উৎপাদন করত শুধু অ্যাডভান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) ফার্মাসিউটিক্যালস। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) নিবন্ধনকৃত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের তালিকায় ওই প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতকৃত ওষুধই রয়েছে। সম্প্রতি ডিজিডিএর ওয়েবসাইটে অ্যালোপ্যাথিক নিবন্ধনকৃত ওষুধের তালিকায় হ্যালোথেন জেনেরিকে একটি মাত্র ওষুধের নাম দেখা যায়। হ্যালোসিন ব্র্যান্ড নামে ওষুধটি এসিআই বাজারজাত করে। মানবশরীরে প্রয়োগ করা ১৮৭এমজি/১০০ এমএল মোড়কের এ ওষুধের দাম ১ হাজার ৫০৪ টাকা বলে সরকারের ওষুধ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান চীন থেকে এ ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করত। বর্তমানে কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রতিষ্ঠানটি ওষুধ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। এদিকে এ ওষুধের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে বা উৎপাদন বন্ধের কোনো নির্দেশনা ডিজিডিএ দেয়নি।
হাসপাতালগুলোর সূত্রমতে, রোগীকে একই গোত্রের বিকল্প ওষুধের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। বস্তুত সারা দেশের সব হাসপাতালেই হ্যালোথেনের সংকট দেখা দিয়েছে। অন্য ওষুধের দাম বেশি এবং সহজপ্রাপ্য নয়। আবার অন্য ওষুধ ব্যবহারে অপারেশন থিয়েটারে বিদ্যমান ভ্যাপোরাইজার মেশিন পরিবর্তন করতে হয়। বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হ্যালোথেনের বিকল্প ওষুধ রোগীদের বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোয় ভ্যাপোরাইজার মেশিন পরিবর্তন ও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বিকল্প ওষুধের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আমরা এ আশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। কেননা অতীতেও দেখা গেছে যে সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ হাসপাতালের বাইরে বিক্রি হচ্ছে। রোগীদের স্বার্থ বিবেচনায় এক্ষেত্রে যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটিই আমাদের কাম্য।










