যানজট কমাতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনা করা হয়। ঢাকার ভেতরে কয়েকটি ফ্লাইওভার থাকলেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এটিই প্রথম। কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা-টঙ্গীর মধ্যে বিদ্যমান রেললাইন দুটির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অবকাঠামো। এতে রেলপথ ও এর ওপর দিয়ে চলাচলকারী ট্রেনগুলো ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। এরই মধ্যে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে বিমানবন্দর-কমলাপুর অংশের রেলপথে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা রয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ঢাকা বিমানবন্দরসংলগ্ন কাওলা এলাকা থেকে শুরু হয়ে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পর্যন্ত দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ চলছে। এর ফার্মগেট পর্যন্ত অংশ এরই মধ্যে চালু হয়েছে। অবশিষ্ট অংশের নির্মাণ শেষ হতে সময় লেগে যেতে পারে আগামী বছর পর্যন্ত। উড়ালপথটির সিংহভাগই নির্মাণ হচ্ছে রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের বিমানবন্দর-কমলাপুর অংশের রেলপথের ওপর। পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে দেশের ব্যস্ততম রেল সেকশনের ওপর নির্মীয়মাণ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফলে রেলপথের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।
প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ের বেশির ভাগ অংশই বিদ্যমান ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে পড়েছে। এ অংশকে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম রেলপথ বলা হয়। নারায়ণগঞ্জগামী ট্রেন ও খুলনা-যশোরের সুন্দরবন-বেনাপোল এক্সপ্রেস বাদে দেশের ঢাকাকেন্দ্রিক সব ট্রেনই এ রেলপথ ব্যবহার করে। সম্প্রতি তেজগাঁও এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ের কাজে ব্যবহৃত একটি ক্রেনের সঙ্গে দুর্ঘটনায় পড়ে আখাউড়া-ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীবাহী ট্রেন তিতাস কমিউটার। ট্রেনটি ঢাকা স্টেশনের (কমলাপুর) দিকে যাচ্ছিল। এ ঘটনার পর এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় ২০০১ সালে প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়। এটি মালয়েশিয়ার প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়ালসড়ক দেশটির সেলাঙ্গর রাজ্যের আমপাংয়ের সঙ্গে রাজধানী কুয়ালালামপুরকে যুক্ত করেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
বস্তুত আমাদের দেশে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই শুরু হয়েছে বলা যায়। যে কারণে প্রকল্পের মধ্যে রেলপথ থাকায় এর নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। কিন্তু এ রকম ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলাচল কাম্য নয়। আবার এর যেন প্রতিকারেরও সুযোগ নেই। বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলে এমন অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত আড়ালেই থেকে যাবে। দুর্ঘটনা কেউ প্রত্যাশা করে না। তবে ন্যূনতম সুরক্ষা নিশ্চিত করে এক্সপ্রেসওয়ের কাজ করা হলে তা সবার আস্থা তৈরি করতে পারত। আর এ রকম উদাহরণ যেন আর কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
এছাড়া সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাকে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্মকর্তারা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন, যা খুব দুঃখজনক। কারণ নিরাপত্তা ইস্যুকে অবহেলা করলে এ রকম কোনো ঘটনাই বড় দুর্ঘটনায় রূপান্তরিত হতে পারে। তাই রেলপথ ও রেলগাড়ি চলাচলের বিষয়টিকে অবহেলার চোখে দেখলে হবে না। প্রথমবার ঘটলেও আর যেন না ঘটে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমানে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত দুই পাশে মোট ৩২ দশমিক ৫ কিলোমিটার রেলপথসংলগ্ন এলাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ এসব জায়গা সংযোগ রাস্তা হিসেবে মালপত্র এবং নির্মাণ উপকরণ বা নির্মাণ যন্ত্র পরিবহন ও নির্মাণসামগ্রী রাখার জন্য ব্যবহার করছে। রেললাইনের দুই পাশে দুটি পিলার তুলে সেগুলোর ওপর আড়াআড়িভাবে গার্ডার বসিয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
রেলপথের দুই পাশের জায়গা ব্যবহার করে শ্রমিক-প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। ওপরে শ্রমিকরা নির্মাণকাজ করছেন, আর নিচ দিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। আবার লাইনে ট্রেনের অনুপস্থিতিতে রেলপথের এক পাশ থেকে অন্য পাশে বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণ ও ভারী নির্মাণ যন্ত্র নেয়া হচ্ছে। রেলপথটিতে কিছুক্ষণ পরপর ট্রেন যাতায়াত করে। এজন্য খুব অল্প সময়ে নির্মাণ উপকরণ ও ভারী যন্ত্র স্থানান্তর করা হয়। এতে কিছুটা নিরাপত্তা ঝুঁকিও থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্সপ্রেসওয়ে অনেকটা ছিদ্রহীন পাইপের মতো। একদিক থেকে উঠলে স্বল্প সময়ে অন্যপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। এ ধরনের সড়কে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই উচ্চগতিতে উল্লেখযোগ্য অংশ পার হওয়া যায়। আর তাই সড়কের মধ্যে এটি সবচেয়ে উচ্চ মানের। এক্সপ্রেসওয়েকে ফ্রিওয়ে বা সুপার হাইওয়ে নামেও ডাকা হয়। সড়কে কোনো মোড় থাকে না, ক্রস মুভমেন্ট, পার্কিং অ্যাকটিভিটি বা পথচারী চলাচল না করার অর্থ হচ্ছে ভালো মানের রাস্তা।
আমরা এক্সপ্রেসওয়ের সুফল পেতে চাই। কিন্তু প্রকল্পের মধ্যে থাকা রেলপথের নিরাপত্তায় অবহেলা করলে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে সক্ষম হবে না। এছাড়া রেললাইনের ওপর এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করায় ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে রেললাইন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এমনকি ভবিষ্যতে এ রেলপথে যদি কোনো ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে, তাহলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে উদ্ধার কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে। এমনকি রেলের আধুনিকায়ন, সংস্কার, দ্বিতল বা উঁচু ট্রেন চলাচলেও এ এক্সপ্রেসওয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। যা-ই হোক, প্রকল্প যেহেতু নেয়া হয়েছে, এখন এ প্রকল্প যথাযথভাবে শেষ করতে হবে। কিন্তু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করতে গিয়ে রেলপথ ঝুঁকির মুখে পড়াটা কাম্য নয়। এজন্য রেলপথ ও চলাচলরত রেলগাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এক্সপ্রেসওয়ের বাকি কাজ শেষ করা হবে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।










