বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জাহাজ ভাড়ায় ধস নেমেছে। কাঙ্ক্ষিত পণ্য না পাওয়ায় প্রতিদিনই জাহাজের পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহন খরচ কমছে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর প্রায় প্রতিটির ভোক্তা মূল্যসূচকে এর প্রভাবও দৃশ্যমান। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। দেশের পণ্যবাজারের মূল্যে কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। সাধারণত জাহাজ বা কনটেইনারের ভাড়া বাড়লে দেশে পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া কম হলেও পণ্যের দামে কোনো প্রভাব নেই।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গত এক বছরে দেশে পণ্যের দাম ও ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বেড়েছে। বিভিন্ন সময় এর পেছনে পণ্যের পরিবহন খরচকে অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বারবার দায়ী করেছেন। যদিও চট্টগ্রাম বন্দর ও পরিবহন কোম্পানিগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে বিগত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়া ব্যাপক মাত্রায় কমেছে। এছাড়া কনটেইনারের মতো বাল্কেও পণ্য আমদানিতে জাহাজ ভাড়া কমেছে ব্যাপক হারে। তবে দেশের পণ্যবাজারে এর কোনো প্রভাব লক্ষণীয় নয়।
বিশ্বব্যাপী ভোগপ্রবণতা ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর চাহিদা হ্রাসের কারণে বিশ্বব্যাপী পণ্য জাহাজীকরণ কমেছে বলে ধারণা আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের। বর্তমানে জাহাজ ভাড়া কমার মূল কারণ বৈশ্বিক ভোগ হ্রাস পাওয়া। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতা দেশগুলো থেকে পণ্য কেনা কমে গেছে। বাইরের দেশে বর্তমানে অর্ডার স্লো হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে ইউরোপ-আমেরিকার বড় ক্রেতাদের কাছে যে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল সেটা না হয়ে মজুদ হয়ে আছে। অথচ পরিবহন ভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় মহামারীর পর প্রায় ১৮ মাস বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় জট লেগে পরিস্থিতি বেশ খারাপ হয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে জাহাজজট এবং খালি কনটেইনারের ঘাটতি তৈরি হয়। তখন দেশের বাজারে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যান্য পণ্যের মতো রফতানি খাতের প্রধান উপকরণ গার্মেন্টস শিল্পেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় জাহাজ ভাড়া কমার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বর্তমানে বিশ্বজুড়েই পণ্যবাহী জাহাজ এবং কনটেইনারের চাহিদা কমেছে। ফলে সব রুটে ভাড়া কমেছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের। তবে কনটেইনার পরিবহন ও জাহাজ ভাড়া কমলেও পণ্যের দাম কেন কমছে না? ভোক্তাসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্নের অবতারণা হয়েছে।
জাহাজ ভাড়া কমার পরও দেশের বাজারে প্রভাব না পড়ার পেছনে টাকার অবমূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকরা। এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে আমদানীকৃত পণ্যে আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের সুদহার বেড়েছে। বিদেশ থেকে ডেফার্ড পেমেন্টের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও একটি বড় কারণ বলে দায়ী ব্যবসায়ীদের। যেসব পণ্য আমদানি করা হয়, সংশ্লিষ্ট দেশে দাম বাড়লে এখানেও বাড়বে।
শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ডলারের বিনিময় মূল্যহার বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্য আমদানি খরচ কমার সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে। ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়াও এর বড় একটি কারণ। ডলারের বিনিময় হারে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচ বেড়েছে। এ বর্ধিত বিনিময় হারের ওপরই ভ্যাট, ট্যাক্স প্রদান করতে হয়। এছাড়া ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনিসহ অনেক পণ্যের দাম এখনো অনেক বেশি। পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রেও জটিলতা কাটেনি।
একদিকে ডলার সংকটে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখছে। অন্যদিকে মন্দার কারণে ইউরোপ-আমেরিকার বায়ার প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশ থেকে পণ্য নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। তাই নানা জটিলতায় জাহাজ ভাড়া কমে আসার কোনো সুবিধাই বাংলাদেশ নিতে পারছে না।
বস্তুত ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অনেক দিন ধরেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এটিকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পরামর্শও দেয়া হয়েছে। আবার বিনিময় হারে ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কারণ ক্রমশ রিজার্ভ ক্ষয়, রেমিট্যান্স আহরণ হ্রাস এবং বিশ্ববাজারে পণ্য পরিবহন খরচ কমার প্রভাব না পড়া সব একই সূত্রে গাঁথা। এজন্য বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সঠিক কর্মনীতি প্রণয়ন করে পথ চলতে হবে। পাশাপাশি পণ্য রফতানিতে জাহাজ ভাড়া কমার সুফল প্রাপ্তির সম্ভাব্যতা যাচাই করা উচিত। দেশের আমদানি-রফতানীকৃত পণ্যে পরিবহন খরচ কমার প্রভাব পড়ুক, আমরা সে প্রত্যাশাই করি।










