উন্নয়নের গতিধারায় এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু একই মুদ্রাপিঠে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ন্যায্যতা ও বাকস্বাধীনতা। উদ্ভূত পরিবেশে তৈরি হয়েছে উন্নত দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা। এতে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক সম্মেলনে এসব বিষয় উঠে আসে। তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের আলোচনা পর্বে অংশ নিয়ে সার্বিকভাবে দেশের জনগণের স্বার্থ বিবেচনার আহ্বান জানান অর্থনীতিবিদরা।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বর্তমানে অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের অনিশ্চয়তা আছে। বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। তবে নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিআইডিএসের আন্তর্জাতিক সেমিনারে এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদরা। কভিড মহামারী বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির ধারাকে নেতিবাচক পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। সেই সঙ্গে এ বছর স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অর্ধেকের কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০টিরও বেশি উন্নয়নশীল দেশে, যা দারিদ্র্যের হারকে উসকে দিয়েছে। কভিডের প্রভাবে ২০২২ সালে বাংলাদেশে নতুন করে দারিদ্র্যসীমায় যুক্ত হয়েছে ২৮ লাখ মানুষ। বৈশ্বিক নিম্ন প্রবৃদ্ধি আরো ৫০ হাজার মানুষকে চলতি বছর দারিদ্র্যসীমায় ঠেলে দিতে পারে। এদিকে দেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে তা সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে দেশে উন্নয়নের প্রশ্নে ন্যায্যতা, বাকস্বাধীনতা ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিই বিআইডিএসের সম্মেলনে গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়নে জনগণের ভূমিকা মূল্যায়নের বিষয়ে জোর দেয়া হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকারের দায়িত্বের কথা উঠে আসে। অর্থনীতিতে আউটপুট বা প্রবৃদ্ধি তৈরিতে ব্যক্তি, ছোট ফার্ম বা কোম্পানিগুলোর অবদানের বিষয়টি বলা হয়। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘উন্নয়ন, ন্যায্যতা ও স্বাধীনতা’ সামনে রেখে কি নোট স্পিচ বা মূল বক্তব্যে উন্নয়ন, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার এ তিন জিনিস পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত এ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। 

যেকোনো দেশেই উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও ন্যায্যতাকে অস্বীকার করা যায় না। ন্যায্যতা ও স্বাধীনতা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে। এ কারণে উন্নয়ন চাইলে ন্যায্যতা ও স্বাধীনতাকে চাইতে হবে। এক্ষেত্রে একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি কাজ নাও করতে পারে বলে মূল বক্তব্যে ধারণা দেয়া হয়। অবকাঠামো, সড়ক যোগাযোগ ও সেতু পরিবহনের মতো বিষয় উন্নয়নে সহায়তা করে। তবে উন্নয়নকে প্রাধিকার দিয়ে ন্যায্যতা ও গণতন্ত্রকে গুরুত্ব না দিলে প্রকৃত উন্নয়ন না হওয়ার থিসিসটি সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।

উন্নয়নের প্রধান শক্তি প্রশ্নে ব্যক্তি খাতের মাধ্যমে জনগণই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করে। যেখানে সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সরকারি সম্পদ সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো সহায়ক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আর এ উন্নয়ন কার্যক্রমকে যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য সামাজিক ন্যায্যতা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। সরকার জাস্টিস ও ফ্রিডম নিশ্চিতের দায়িত্ব নিলে জনগণই উন্নয়নকে এগিয়ে নেবে। অর্থাৎ উন্নয়ন নিজেই এগিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কথা বলার স্বাধীনতা, বিতর্কের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য হয়। সম্মেলনের মূল বক্তব্যে এসব কথা বলা হয়।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে মাহাথির মোহাম্মদ ও সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউর বিষয়টি পরিকল্পনামন্ত্রী তুলে ধরেন। তবে বৈষম্য বাড়ার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেছেন। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) ‘২০১৯ থেকে বৈশ্বিক সংকট: বাংলাদেশের কৃষিজ খাদ্যপণ্যের প্রভাব’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়, বৈশ্বিক নিম্ন প্রবৃদ্ধির হার চলতি বছর বাংলাদেশে আরো ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে। নতুন করে অপুষ্টির শিকার হতে পারে দুই লাখ মানুষ। কভিড ও যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এর প্রভাবে ২০২২ সালে বাংলাদেশের নতুন করে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ কভিডে প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত দারিদ্র্যের হার বেড়েছিল। একই সময় নতুন করে অপুষ্টির শিকার হয়েছে ৩১ লাখ মানুষ, যা এ বছর ৩৩ লাখে পৌঁছে যেতে পারে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। সম্মেলনের তৃতীয় দিনে ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি অব অ্যাগ্রারিয়ান ফিউচারস ইন বাংলাদেশ: ইনসাইটস ফ্রম স্কপিং স্টাডি’ শীর্ষক প্রবন্ধে সেচ, নতুন নতুন ফসলের জাত, যান্ত্রিকীকরণসহ নানা ধরনের প্রযুক্তি আসার পর কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এতে ভূমিহীন কৃষকদের জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজ করতে পারার বিষয়টিকে সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ইতিবাচক হিসেবে গণ্য করা হয়। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। দেশের কৃষিকে সামনে এগিয়ে নিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরো বিস্তৃতভাবে ভাবতে হবে। কারণ যেকোনো সংকটে কৃষিই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে। এছাড়া সম্মেলনে বিআইডিএসের ‘কেয়ার ওয়ার্ক অ্যান্ড ডমেস্টিক ওয়ার্ক’ প্রতিবেদনে গৃহের অভ্যন্তরীণ অবৈতনিক কাজের মূল্য জিডিপিতে অন্তর্ভুক্তের বিষয়টি উঠে আসে। এভাবেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নানা দিক সম্মেলনে আলোচিত হয়। যার প্রভাব নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হলে দেশ উপকৃত হতে পারে বলে আশা করা যায়। আমরা প্রত্যাশা করব, বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক। সেই সঙ্গে উন্নয়নের পাশাপাশি ন্যায্যতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাও বজায় থাকা কাম্য।