করোনা অতিমারী এবং চলতি বছরের ডেঙ্গু মহামারীতে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আমাদের স্বাস্থ্য খাত বড় আকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম নয়। রাজধানী ঢাকায় যে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে তা নগরের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবায় যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গু ঢাকা ছাড়িয়ে দেশব্যাপী ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত আগস্টে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০২২ সালের মৃত্যুর অংক ছাড়িয়ে গেছে। এর আগের বছরগুলোয় ডেঙ্গু ঢাকা বা চট্টগ্রামকেন্দ্রিক থাকলেও এবার পুরো দেশেই ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা বিস্তৃত হয়েছে। থানা ও জেলা পর্যায়ে আস্থা রাখার মতো হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা না থাকায় বড় একটি অংশই ঢাকামুখী হচ্ছে। এতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় চাপ বাড়ছে। অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে প্রকাশ, ঢাকার বাইরে‌ও প্রত্যন্ত এলাকায় হাজারো রোগী শনাক্ত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোয় প্রতিদিনই লাফিয়ে বাড়ছে জ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তির সংখ্যা। রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সিট ফাঁকা নেই ঢাকার সরকারি কোনো হাসপাতালেই। মেঝেতে রোগী ভর্তি রেখে কোনোমতে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা চলছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না মেলায় মৃত্যুহারও বাড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ডেঙ্গুকে প্রাধান্য দেয়ায় ব্যাহত হচ্ছে অন্যান্য রোগীর স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রমও। সব মিলিয়ে মারাত্মক চাপে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, যেমনটা দেখা গিয়েছিল কভিডকালে। 

উল্লেখ্য, গত শনিবার একদিনে সর্বোচ্চ ২১ রোগীর মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে ৬৩৪ জনের মৃত্যু হলো। আর হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৩০২ জন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয় ৬০ হাজার ৪৮৪ ও ঢাকার বাইরে ৬৯ হাজার ৮১৮ জন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৮৯২ ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয় ১ হাজার ৭১৬ জন।

ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে শয্যা পেতে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন অনেক রোগীর স্বজন। বেসরকারি অনেক হাসপাতাল ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী রাখতে চাচ্ছে না বা ভালো চিকিৎসাসেবা দিতে পাচ্ছে না। এতে চাপ বাড়ছে ঢাকা মেডিকেল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মতো সরকারি হাসপাতালে। আবার সরকারি হাসপাতালেও সব ডেঙ্গু রোগী শয্যা পাচ্ছে না। ত্রিশঙ্কু দশার মধ্যে আছে যেন রোগী ও রোগীর আত্মীয়-স্বজন! 

ডেঙ্গুর এ প্রবণতার মধ্যে হাসপাতালের সার্বিক সেবা কার্যক্রম নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হকের সঙ্গে কথা হয়। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আমাদের হাসপাতালে এখন প্রতিদিন ৩০০-৩৫০ রোগী ভর্তি হচ্ছে। অন্য রোগীদের বাদ দিয়ে তাদের ভর্তি করাতে হচ্ছে। তবে জটিল রোগীদেরও ভর্তি নিচ্ছি। সম্ভব হলে বাসায় থেকেও চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে ডেঙ্গুর কারণে অন্য রোগীদের ক্ষেত্রে কিছুটা কম্প্রোমাইজ করা হচ্ছে।’ 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে এখন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে মোট ৯ হাজার ১২৭ জন। ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮ হাজার ৭৩৮ জন, মৃত্যু হয়েছে ১০৩ ডেঙ্গু রোগীর। নতুন করে ভর্তি হওয়া ৮৩ জনসহ বর্তমানে ২৮৬ রোগী হাসপাতালটির ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে। 

বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোয় পা ফেলার জায়গা নেই। ফাঁকা নেই রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা। অনেকে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। বেশির ভাগ রোগীই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এক লাফে রোগী ভর্তির সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়ালেও বাড়েনি চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম শর্তই হচ্ছে তাদের মশারির ভেতর রাখতে হবে। কিন্তু রোগীর চাপের কারণে সেটি করা যাচ্ছে না। চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত গাইডলাইন অনুযায়ী ২ ঘণ্টা পরপর তাদের ফলোআপ করতে হয়। কিন্তু যে পরিমাণ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে প্রতিদিন, সে অনুযায়ী চিকিৎসক ও নার্স নেই। ফলে তাদের পক্ষে এ গাইডলাইন মেনে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণেই বাড়ছে মৃত্যুর হার। কভিডকালেও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে হাসপাতালগুলোকে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় ঢামেক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী, কুর্মিটোলাসহ ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোয় আরো দেড় হাজার শয্যা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। তবে সে ঘোষণা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবকে স্থানিক মহামারী (এনডেমিক) ঘোষণা দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা মৃত্যুহার কমানো, জনজীবনে স্বস্তি নিয়ে আসার জন্য সরকারের আন্তরিক প্রয়াস কাম্য। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ায় ভয়াল রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু। একই পরিবারে একাধিক সদস্যের মৃত্যুর মতো বেশ কয়েকটি ট্র্যাজিক ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের কর্তাব্যক্তিদের ঘুম কি ভাঙবে না? বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনতিবিলম্বে ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় শয্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য রোগীও যেন স্বাভাবিক চিকিৎসা পেতে পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে। থানা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা রাখলে ঢাকায় এত চাপ পড়ত না। এখনো সময় আছে স্থানীয় হাসপাতালগুলোকে সক্ষম করে তোলার। করোনা মহামারী ও ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিচ্ছে জেলা ও থানা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাসেবা উন্নত করা কত জরুরি।