এ দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের মধ্যে ধান অন্যতম। মূলত তিনটি মৌসুমে ধান উৎপাদিত হয়—আউশ, আমন ও বোরো। মৌসুমগুলোয় সরকার কৃষকদের থেকে ধান ও চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এবং কৃষকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রতি বছরই সরকারের ধান সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হতে দেখা যায়। চলতি বোরো মৌসুমেও ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাংলাদেশ কৃষক মজুর সংহতির সাম্প্রতিক এক জরিপ জানাচ্ছে, লাভজনক দাম পাওয়ার আশায় সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে চাইলেও নানা শর্ত ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতায় নিরুৎসাহিত বোধ করছেন প্রান্তিক কৃষকরা।

বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন থেকেও সরকারের কাছে কৃষকদের ধান বিক্রির ক্ষেত্রে অনীহার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নীলফামারী সদর উপজেলার চরাইখোলা ইউনিয়নের আব্দুর রহিম বসুনিয়া আমন মৌসুমে ৩০ বিঘা জমিতে ব্রি-৯৩ জাতের ধান আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় ধান পেয়েছেন গড়ে ১৮ মণ। বিঘাপ্রতি জমিতে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা করে। প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৪৪০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি ধানের দাম পড়ে ৩৬ টাকা। অথচ সরকার প্রতি কেজি ধানের দাম বেঁধে দিয়েছে ৩৩ টাকা। গুদামে ধান নিয়ে গেলে বলা হয় আর্দ্রতা ঠিক নেই। আবার গুদামের শ্রমিকরা টাকা ছাড়া বস্তায় হাত দেন না। এছাড়া কৃষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে গুদাম থেকে খাদ্য অফিসে যেতে হয়। পরে কাগজপত্র ঠিক করে ব্যাংকে যেতে হয়। যদি কোনো কারণে আর্দ্রতা শতকরা ১৪ ভাগের একটু বেশি থাকে, তাহলে ওই ধান নিজের খরচে বাড়ি নিয়ে যেতে হয়।

এ চিত্র কেবল একজন আব্দুর রহিম বসুনিয়ার নয়। একই পরিস্থিতিতে আছেন দেশের প্রায় সব প্রান্তিক কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে হলে কৃষকদের যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা একজন দরিদ্র কৃষকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হলে তা নিজের খরচে ফেরত নেয়াসহ আরো বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রিতে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না। কোনো কোনো সময় ব্যবসায়ীরা কৃষকের বাড়ি এসে নিয়ে যান। এতে কৃষকের পরিবহন খরচ বেঁচে যায়। অন্যদিকে সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে অনেক সময় দুই দফা পরিবহন ব্যয় হয়। উপরন্তু কৃষক পরিচয়পত্র না থাকায় নিবন্ধন করা যায় না। অন্যদিকে কৃষকদের থেকে ধান সংগ্রহে নিযুক্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। এসব শর্ত ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির দরুন বাড়তি উৎপাদন খরচ ও ঋণ পরিশোধ। ফলে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ এসব কৃষকের জন্য উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে না। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারের বরং উচিত কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে ধান সংগ্রহ।

আবার সরকার এবার মাত্র সাড়ে তিন লাখ টন ধান ও ১৪ লাখ টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এটি দেশের মোট উৎপাদনের তুলনায় যৎসামান্যই। প্রশ্ন জাগে, এ সীমিত পরিমাণ কেনার মাধ্যমে কীভাবে মৌসুম শেষে ধানের বাজারদরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে বা কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা যাবে? যদিও সরকার ধান-চালের দাম গতবারের চেয়ে কেজিতে ৪ টাকা বাড়িয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মূল্যবৃদ্ধির সুফল পাবেন মিলাররা। বাস্তবে সরকার যাদের কাছ থেকে ধান কিনছে, তাদের বড় অংশই মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রভাবশালী চাতাল-মিল মালিক। ফলে প্রান্তিক কৃষকের স্বার্থ অরক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি নীতিকাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। বর্তমানে সেচ যন্ত্রের জ্বালানি ডিজেল ও বিদ্যুতের দামের পাশাপাশি বেড়েছে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি। এতে বোরো ধান চাষে খরচও বাড়ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) হিসাবে, বোরো ধানের উৎপাদন খরচ ১০ শতাংশ বেড়েছে। যে কারণে কৃষকের ধান ও চালের ভালো দাম পাওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। সরকারের উচিত এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পুনর্বিন্যাস করা, শর্ত ও পদ্ধতি সরল করা। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো কৃষকের কাছে পৌঁছানো। সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যাতে কৃষকের ধান পরিবহন ব্যয় একেবারে কমে আসে। সেই সঙ্গে কৃষক নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা আবশ্যক।

ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর না হলে বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবেন উৎপাদনকারীরাই। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ও কৃষকের সার্বিক সুরক্ষায় এ-সংক্রান্ত নীতি হতে হবে কৃষকবান্ধব। বিশেষত ধান সংগ্রহে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত ও কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না হলে সরকারের ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

কৃষক বাঁচলে তবেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। অথচ এ সত্য উপেক্ষা করে দেশের কৃষিনীতি বাস্তবতাবিমুখ হয়ে উঠছে। বর্তমানে প্রয়োজন সরকারি ধান কেনার নামের এ আনুষ্ঠানিকতার খোলস ভেঙে বাস্তবমুখী ও কৃষকবান্ধব নীতি গ্রহণের। কৃষক সরকারের কাছে ধান বিক্রি করবেন না। বরং সরকারকে তা কিনতে হবে এবং সে অনুযায়ী নীতি-কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে।

দেশের অনেক কৃষকই এখনো বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বা দোকান থেকে সার-ডিজেল বাকি নিয়ে কৃষিকাজ পরিচালনা করেন। কৃষকের এ ঋণ পরিশোধে নানা চাপ থাকে। ফলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের অনেক কম দামে কৃষক ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করে দেন। সারা বছর যে পরিশ্রম করে কৃষক ফসল ফলান, সেই শ্রমের ন্যায্যমূল্য তারা পান না। এছাড়া উপজেলা শহরের খাদ্যগুদামে গিয়ে তারা ধান বিক্রির ধকল পোহাতে চান না। এক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তনীয় আর্দ্রতায় পরিবর্তনশীল মূল্যে কৃষকের খামার প্রান্ত থেকে ধান সংগ্রহ করতে পারে।

দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ও চালের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সরকারি মজুদ বৃদ্ধি জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছর স্থানীয় বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করে। উদ্দেশ্য থাকে সরাসরি কৃষকের পাশে দাঁড়ানো এবং ভোক্তাকে স্বস্তি দেয়া। কিন্তু যথাযথভাবে ধান সংগ্রহ করতে না পারায় প্রতি বছর ভোগান্তিতে পড়েন কৃষক ও ভোক্তারা। জানা যায়, বাজারদরের চেয়ে সরকার নির্ধারিত সংগ্রহ মূল্য কম হওয়ায় বিভিন্ন মৌসুমে খাদ্য অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ ঘাটতি পূরণে সরকার চাল আমদানি করে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার আট লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্য ঠিক করেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৫ দশমিক ১৮ লাখ টন চাল আমদানির দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, যার বেশির ভাগ এরই মধ্যে দেশে পৌঁছেছে। অথচ ব্রির এক গবেষণায় বলা হয়, দেশে বছরে চাহিদার চেয়ে প্রায় ৪২ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকে। উদ্বৃত্ত থাকার পরও চাল আমদানির অন্যতম কারণ হিসেবে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহে ব্যর্থতা, পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে শুধু শতভাগ ধান-চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে সরকার। এছাড়া ২০১৯ সালে ২১ শতাংশ, ২০২০ সালে ৩৩ ও ২০২১ সালে ৫৪ শতাংশ ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারকে কৃষকের কাছে যাওয়ার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন বলেই প্রতীয়মান হয়।