কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে চাহিদার চেয়েও বেশি উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদনের এ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আলু-পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ শতাংশ ও টমেটোর ক্ষেত্রে প্রায় ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন বা সংগ্রহ-পরবর্তী সময়ে এ ক্ষতি হচ্ছে। এর নেপথ্যে অনুন্নত হিমাগার ও যথাযথ প্রক্রিয়াকরণের অভাব দায়ী বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে জলবায়ুসহিষ্ণু জাতের বীজ উদ্ভাবনের প্রতিও জোর দিচ্ছেন তারা।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্যতম বড় সংকট ফসল উৎপাদন বা সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি। দেশে উৎপাদিত আলু ও পেঁয়াজের প্রায় ২৫ শতাংশই সংগ্রহ-পরবর্তী সময়ে নানা কারণে নষ্ট হয়ে যায়। আর টমেটোর ক্ষেত্রে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলে চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হলেও প্রায় প্রতি বছরই এসব পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানিতে খরচ হয় বিপুল অর্থ। তবে হিমাগার ও প্রক্রিয়াকরণে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জলবায়ুসহিষ্ণু জাতের বীজ উদ্ভাবনে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির বড় একটি অংশই কমানো সম্ভব। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় নির্ধারিত কিছু ফসলের উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমানো ও সংরক্ষণের জন্য এফএওর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমিয়ে আনতে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা তৈরি করেছে এফএও। সংস্থাটির ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যানস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ; এইচআইএইচ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম ২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদন-পরবর্তী সময়ে ফসল নষ্ট হয়। পাশাপাশি হিমাগারের অবকাঠামোগত অভাব রয়েছে। হিমাগার ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করলে এসব ফসলের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতির ৪৫-৫৫ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে সংস্থাটি পরামর্শ দিয়েছে। উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমাতে ফসলভেদে কোন খাতে কত বিনিয়োগ প্রয়োজন তা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য এফএওর কাছে কৃষি মন্ত্রণালয় আবেদন জানায়। তার পরিপ্রেক্ষিতেই এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। 

আলু-পেঁয়াজের পর ফসলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি হয় টমেটোর। উৎপাদনের পর প্রায় ৪০ শতাংশই সংগ্রহ-পরবর্তী সময়ে নষ্ট হয়ে যায় বলে এফএওর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি টমেটোর পেস্ট প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দেশে আলু ও পেঁয়াজ চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হয়। তবুও চলতি বছর কয়েক দফায় এ দুই পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হতে দেখা গেছে। গত বছরের চেয়ে আলু ও পেঁয়াজ বর্তমানে প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আলুর বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে দীর্ঘদিন পর এবার আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এদিকে উৎপাদন বেশি হলেও প্রতি বছরই প্রায় ছয়-সাত লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। মূলত উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়া ও পরিসংখ্যানগত দুর্বলতার কারণে বাজার অস্থিতিশীল হয় বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বস্তুত উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমানো গেলে বাড়তি আমদানির প্রয়োজন হয় না। আবার বাজারেও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। সেই সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সার্বিকভাবে উৎপাদনের পরিসংখ্যান আরো নির্ভুল করতে হবে। 

বর্তমানে এক্স-রে প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা যৌথভাবে কাজ করছে। সংস্থা দুটির তথ্যমতে, এক্স-রে প্রযুক্তির মাধ্যমে পচনশীল বিভিন্ন ফসলের সংরক্ষণকাল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব। সব মিলিয়ে উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষতির ফলেই আমাদের অনেক ফসল আমদানি করতে হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আলু, পেঁয়াজ, আম, টমেটোসহ কয়েকটি পণ্যের উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমিয়ে আনার বিষয়ে কাজ করছে বলে আশ্বাস দিয়েছে। এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ক্ষতি কমে আসবে বলে আমরা আশাবাদী। কৃষিপণ্যের ক্ষতি কমে এলে তখন উদ্বৃত্ত পণ্য রফতানিও করা যাবে। এজন্য এফএওর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তার সফলতা কাম্য। পাশাপাশি অর্থায়নসহ যেসব জটিলতা রয়েছে, তা দূরীভূত করতে কৃষি মন্ত্রণালয় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।