দেশের স্থিতিশীল অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জ্বালানি নিরাপত্তা। বর্তমানে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপায় থাকলেও সে পথে হাঁটেনি দেশের জ্বালানি খাত ও পেট্রোবাংলা। নিজস্ব তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে জ্বালানি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে সরকার। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। রফতানি আয় ও রিজার্ভ শক্তিশালী থাকায় শুরুতে তেমন সমস্যায় পড়তে হয়নি। কিন্তু ২০২২ সালে প্রথম বড় ধাক্কা খায় আমাদের আমদানিনির্ভর এ পলিসি। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সরবরাহ চেইন সংকটে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি গগনচুম্বী হয় এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। বড় অংকের আমদানি দায় মেটাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। নিরাপদ জ্বালানির অভাবে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।
পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের বরাতে বণিক বার্তায় প্রকাশ, বঙ্গোপসাগরের ২৪টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র ডেকেছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। এ দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ৫৫টি তেল-গ্যাস কোম্পানিকে। আমন্ত্রণ জানিয়ে এসব কোম্পানিকে মেইলও পাঠানো হয়েছে। দরপত্র ডাকা ২৪টি ব্লকের মধ্যে গভীর সমুদ্রে পড়েছে ১৫টি, অগভীর সমুদ্রে নয়টি। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়, এবারের দরপত্রে কোনো কোম্পানি এক বা একাধিক ব্লকে অংশ নিতে পারবে। নতুন পিএসসিতে (প্রডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট বা উৎপাদন বণ্টন চুক্তি) বিনিয়োগের খরচ বছরে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত তুলে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ঠিকাদার কোম্পানি দ্রুত বিনিয়োগ তুলে নিতে পারলে পেট্রোবাংলার লভ্যাংশ বাড়বে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন ও দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এলএনজি, জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল। এর দাম দ্রুত ওঠানামা করে। কোনো কারণে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাস সরবরাহ। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান আসায় স্বল্প মূল্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে এটি দেয়া গেছে। এতে স্বল্প মূল্যে পণ্য উৎপাদন করা গেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি তেলের সঙ্গে এলএনজির দামও বাড়ছে। আগামীতে আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্ধারিত সময়ে চালু করা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একক জ্বালানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে।
২০১২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয় মিয়ানমারের। এরপর ২০১৩ সালে এখান থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দেশটি। এরপর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হয় ২০১৪ সালে। জলসীমার আইনি মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তারা এক্ষেত্রে সফলতাও পেয়েছে। এরই মধ্যে এ নিষ্পত্তিরও ১০ বছর পেরিয়েছে। দীর্ঘ এ সময়ের মধ্যে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলন ও অনুসন্ধানে কোনো সাফল্যেরই দেখা পায়নি বাংলাদেশ। অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া ঠিক নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত জ্বালানি ব্যয়সাশ্রয়ী হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সবকিছুকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তি, খানা, ব্যবসা, কৃষি সব খাতেই জ্বালানির দামের প্রভাব পড়ে। জ্বালানির মূল্যই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। প্রথমত, আমদানি করা, তারপর এখানে আসার পর দাম বাড়ানো হচ্ছে দফায় দফায়। বহিঃস্থ কারণে শুরু, কিন্তু অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বারবার বাড়ানোর ফলে এটা মূল্যস্ফীতির চাপকে আরো বাড়িয়েছে। প্রাপ্যতা সংকট সবসময়ই সমস্যা ছিল, এখন তা আরো বেড়েছে। এটা নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন সময় দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করেছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়নি। জ্বালানি খাতে বিভিন্ন সময়ে উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এসব প্রক্ষেপণ ও পরিকল্পনার বড় অংশজুড়েই ছিল আমদানিনির্ভর জ্বালানি। প্রাইমারি এনার্জি সরবরাহ নিয়ে একটা পরিপূর্ণ সমাধানে আসা যায়নি। অথচ এর সমাধানও রয়েছে। কিন্তু গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য দিতে গিয়ে জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানের পথগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি, যার খেসারত জনগণকে দিতে হচ্ছে।
ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জ্বালানি জোগানোতেই বেশি দৃষ্টি দিয়েছে। ভিয়েতনাম বর্তমানে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে মোট বিদ্যুতের যথাক্রমে ৩১ ও ২৬ শতাংশ উৎপাদন করছে। দেশটিতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুতের অবদান ৪১ শতাংশ। বাকি ২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুব সামান্য পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে। এখন দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারে আরো বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একইভাবে কম্বোডিয়াও গতানুগতিক দেশীয় জ্বালানি উৎসের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায়ও সমরূপ অবস্থা। দেশটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার প্রাধান্য থাকলেও ধীরে ধীরে জলবিদ্যুৎ ও জিওথার্মালের ব্যবহার বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে তারা দেশীয় উৎসনির্ভর। ফলে সেসব দেশে জ্বালানি ব্যয় আপেক্ষিকভাবে কম। এসব দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে আমাদেরও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ দিতে হবে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কেমন, তা নিয়ে তেমন কোনো সমীক্ষা হয়নি, গবেষণা হয়নি। এ ধরনের গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা সংশোধনপূর্বক দেশীয় উৎসনির্ভর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লাসহ অন্যান্য সম্পদ ব্যবহারে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উত্তোলন, উদ্ভাবনের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগী হবে—এমনটাই কাম্য।










