আলু আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য। সারা বছরই রান্নায় আলু ব্যবহার হয়। সময়ের পরিক্রমায় আলুর চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ছে না। ফলে আলুর বাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি গত বছর আলুর দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সরকার আমদানি করতে বাধ্য হয়েছিল।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দীর্ঘদিন ধরেই আলুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে কৃষিপণ্যটির মাথাপিছু ভোগ বেড়েছে। ব্যবহার বেড়েছে বিভিন্ন খাবার ও পশুখাদ্য শিল্পেও। তবে পণ্যটির চাহিদা যে গতিতে বেড়েছে, উৎপাদন বা সরবরাহ সে গতিতে বাড়েনি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকেই দেশে উদ্বৃত্ত আলুর পরিমাণ কমছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আলুতে নিট উদ্বৃত্ত অচিরেই নিট ঘাটতিতে রূপ নিতে পারে। এজন্য উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আলুর উৎপাদনশীলতা বাড়ানোয় দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় আলুতেও বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে।

বিএআরসির গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে আলুর নিট চাহিদা ছিল ৬২ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ লাখ ১৭ হাজার টনে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে দেশে আলু উদ্বৃত্ত ছিল ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টন। ২০২০ সালে তা নেমে আসে ৩ লাখ ৪০ হাজার টনে।

বস্তুত আলুর চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। না হলে ভবিষ্যতে আলু আমদানির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। এজন্য আলুর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এদিকে বাজারে আলুর দাম বাড়লেও কৃষক এর কোনো সুফল পাননি। বিএআরসির আরেক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে খুব অল্প দামেই ব্যবসায়ীরা আলু কিনে নেন। ২০২৩ সালেও মৌসুমের শুরুতে অর্থাৎ মার্চে কৃষক প্রতি কেজি আলু ১০-১২ টাকায় বিক্রি করেছিলেন।

বাজার মনিটরিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রতি বছর আলুর দাম নিয়ে মূলত হিমাগার পর্যায়ে কারসাজি হয়। এতে ফড়িয়া, হিমাগার মালিক (কোল্ড স্টোরেজ) ও আড়তদারদের বড় ভূমিকা থাকে। এ রকম পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোয় আলুর বাজার দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন পণ্যটির বিপণনসংশ্লিষ্টরা। মূলত আলু যেভাবে সংরক্ষণ সুবিধা পায় তাতে পণ্যটির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার কথা নয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন ৪১৪টি কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি আলু সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার হয়। আলু কোল্ড স্টোরেজে রেখে বছরজুড়ে সরবরাহ করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, শীতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত সবজি আলু। দেশে আলুর উৎপাদন এক কোটি টনের বেশি। এই এক কোটি টন কিন্তু শীতেই খাওয়া হয় না। এটা কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করে বছরজুড়ে বিক্রি করা হয়। যে কারণে উৎপাদন শীতে হলেও সারা বছরই বাজারে আলুর দেখা পাওয়া যায়। কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, এ দেশে ১৯৫০ সালের দিকে অল্প পরিসরে কোল্ড স্টোরেজ সিস্টেম ডেভেলপ হলেও এটা নব্বইয়ের দশকে এসে ব্যাপকতা পায়। এক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইনে কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠায় সারা বছর আলু সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে। সুবিধা শীতে উৎপাদিত অন্য কোনো কৃষিপণ্য পায় না। অবশ্য কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারে ৭-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আলুর স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা করা হয়। এতে অন্য সবজির চেয়ে খরচও কম লাগে। এক্ষেত্রে আলুর বাজারে যে কারসাজি হচ্ছে, এক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের অভিযুক্ত করার সুযোগ থাকে। তবে ভিন্নমত পোষণ করা হয়েছে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে এ তথ্যকে তারা ভুল বলে অভিহিত করছেন। এজন্য কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ জরিপ করার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশে আলুর মাথাপিছু ভোগ প্রতি বছরই বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আলুর উৎপাদন ও চাহিদা এখন প্রায় কাছাকাছি। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে নিট ঘাটতির দিকেই যাচ্ছে আলু এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এজন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রতি জোর দিচ্ছেন কৃষিবিদরা। এক্ষেত্রে জমির স্বল্পতা এবং আলুর চেয়ে লাভজনক সবজি চাষের বিষয়টিও সামনে উঠে এসেছে। তাছাড়া আলু উৎপাদনের সঠিক তথ্যটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ প্রকৃত তথ্য থাকলে সংকটের সমাধান সহজ হবে। এজন্য আলুর সম্ভাব্য ঘাটতি এড়াতে বছরে অন্তত দুই লাখ টন করে আলু উৎপাদন বাড়াতে হবে।

আলুর অনেক উচ্চফলনশীল নতুন জাত উদ্ভাবন হয়েছে। এগুলো যত দ্রুত সম্প্রসারণ করা যাবে তত দ্রুত ফলাফল পাওয়ার আশা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে আলুর দাম নিশ্চিতের পাশাপাশি সরকারিভাবেও প্রচুর আলু মজুদ করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর প্রোটিনের অন্যতম উৎস আলুর উৎপাদন সক্ষমতা যেন বজায় থাকে। এজন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সময়োপযোগী ভূমিকা কাম্য।