টানা কয়েক বছর ধরেই সময়ে সময়ে পেঁয়াজের দামে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে দফায় দফায় বাড়ে পেঁয়াজের দাম। কয়েক বছর আগে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তখন থেকে মৌসুমি পেঁয়াজ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আলাপ সামনে আসে। সংকটের সমাধান হিসেবে উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিকল্প উৎস থেকে আমদানির কথা বলা হয়। তখন দেখা গেছে, তুরস্ক ও মিসর থেকে বড় আকারের পেঁয়াজ আমদানি করে সংকট সামাল দেয়া হয়েছিল। এবারো বর্ষা মৌসুমে পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। মাসখানেক ধরে পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে। এতে মাথাব্যথার কারণ হিসেবে হাজির রফতানিতে ভারতের শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পেঁয়াজ রফতানিতে ৪০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে ভারত। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকবে। অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতেই মূলত এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। ভারতের এ সিদ্ধান্তের প্রভাব এরই মধ্যে বাংলাদেশের বাজারেও লেগেছে। ভারতে শুল্কারোপের খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়।
পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় গত জুন থেকে আমদানির অনুমতি দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এরপর ভারতীয় পেঁয়াজ এলে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে নতুন করে পণ্যটি রফতানিতে ভারতের ৪০ শতাংশ শুল্কারোপ বাংলাদেশের বাজারে বেশ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা। অতীতেও পণ্য রফতানিতে প্রতিবেশী দেশটির বিভিন্ন পদক্ষেপ এ দেশের বাজারকে প্রভাবিত করতে দেখা গেছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজ রফতানির ন্যূনতম মূল্য ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার করেছিল ভারত। এরপর মাস শেষে পুরোপুরি পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় দেশটি। এতে এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের বাজারে ৫০ টাকা কেজির পেঁয়াজ ২৫০ টাকায় গিয়ে চড়ে।
বাংলাদেশে পেঁয়াজ ছাড়া রান্নাবান্না কল্পনাই করা যায় না। এজন্য যখনই দাম বাড়ে তখন বাজার ও ভোক্তা সাধারণের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। তদারকি সংস্থার বরাতে জানা যায়, শুধু যে বিশ্ববাজারে মূল্য বৃদ্ধি ও দেশীয় জোগান কম থাকায় দাম বাড়ে এমন নয়, কারসাজি করে বেশির ভাগ সময় পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে। কখনো কখনো আমদানি মূল্যের দ্বিগুণ দামে ভোক্তারা পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হয়েছেন। কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মজুদও গড়ে তোলেন। মাঝখানে কয়েকটি স্তরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
আগস্টে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। এর পর থেকে পেঁয়াজের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু ওই মাসের পর দাম আরো বাড়তে থাকে। তদন্তে উঠে এসেছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আগস্টে বেশি চালান আসার পর তা মজুদ করে ফেলেন ব্যবসায়ীরা। এরপর বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়। এর মধ্যে ভারতের রফতানি শুল্ক ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বলা হচ্ছে, বছরে দেশের চাহিদার সিংহভাগ পেঁয়াজ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হচ্ছে। দেশে প্রতি বছর ১৭-১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। বাকি চাহিদা আমদানিতে মিটছে। আমদানির প্রধান বাজার ভারত থেকে অধিকাংশ পেঁয়াজ আসে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপাত্তে বলা হয়, গত কয়েক বছরে ৭-১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
প্রতি বছরই পেঁয়াজ আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে, যার সিংহভাগই আসে ভারত থেকে। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৭ লাখ ৪৩ হাজার টন পেঁয়াজ। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয় ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৫৩ হাজার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ লাখ ৭ হাজার ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৮ লাখ ৬৩ হাজার টন পেঁয়াজ।
বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৮-৩০ লাখ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করা হয়। সংরক্ষণ দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর অনেক কৃষকের পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। এ মৌসুমে ৩৪ লাখ টন পেঁয়াজের ফলন হলেও সংরক্ষণ দুর্বলতা ও ভালো জাতের অভাব উৎপাদনের সাফল্যকে মলিন করে দিয়েছে।
পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সাত জেলায় মোট ৩০০টি ঘর নির্মাণ হওয়ার কথা। এসব ঘরে অন্তত পাঁচ-ছয় মাস পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘরগুলো নির্মাণ সম্পন্ন করে নিজস্ব সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
এবার পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও সংগ্রহ থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে বিভিন্ন ধাপে পণ্যটির ২৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে উৎপাদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা থাকলেও গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অর্থাৎ ভরা মৌসুমেই বাড়তে শুরু করে পেঁয়াজের দাম। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে তা প্রায় তিন গুণ হয়। বাজার স্থিতিশীল করতে তাই গত ৫ জুন থেকে কৃষি মন্ত্রণালয় আবার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৫ জুন থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮৪ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (আইপি) নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দেশে এসেছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৮৬ টন। অর্থাৎ আইপির বিপরীতে ২৬ শতাংশ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে।
ভারতের শুল্ক বৃদ্ধির কথা তুলে সিন্ডিকেট যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করে সেজন্য সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এমনিতেই চাল, তেল, গ্যাস ও ডিমের দামে নাভিশ্বাস উঠে গেছে সাধারণ মানুষের। এর মধ্যে পেঁয়াজের ঝাঁঝ বৃদ্ধি কাম্য নয়। প্রতি বছর পেঁয়াজ নিয়ে যে মৌসুমি সংকট দেখা দিচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। পেঁয়াজের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উচ্চফলনশীল ও বারো মাসি পেঁয়াজ নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে।
দেশে পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে হয় ভারতকে অনুরোধ করতে হবে শুল্ক প্রত্যাহার করতে কিংবা বিকল্প উৎস থেকে আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। পেঁয়াজের দাম যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায় এজন্য এখনই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে মিসর ও তুরস্ক কিংবা অন্য বিকল্প উৎস থেকে আমদানির।










