জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এর অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ। যা দেশ-বিদেশের পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আকর্ষণ করছে পক্ষীকুলকে। গাছ-পাখি, লতা-পাতা, ফুল ও জলাধারের কারণে ক্যাম্পাসটিকে অনেকে ‘জীবন্ত ল্যাবরেটরি’ও বলে থাকেন। সাধারণত কোকিল, দোয়েল, শ্যামা, ঘুঘু, বক ও শালিকের মতো দেশীয় পাখিগুলো সারা বছর ক্যাম্পাসে বিচরণ করে। তবে শীত আসার আগেই ক্যাম্পাসে আনাগোনা শুরু হয় পরিযায়ী পাখির। এসব পাখির মধ্যে রয়েছে সরালি, গার্গেনি, পিচার্ড, মানিকজোড়, মুরগ্যাধি, জলপিপি, নাকতা, কলাই, ফ্লাইপেচার, পাতারি, চিতা টুপি, খুনতে হাঁস, জিরিয়া হাঁস, ভূতি হাঁস, লেঞ্জা হাঁস, আফ্রিকান কম্ব ডাক, গ্রেটার স্টর্ক, ফুলুরি হাঁস, ইউরেশীয় সিঁথি হাঁস, লাল গুরগুটিসহ নানান প্রজাতি। জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৮৬ সাল থেকে এখানকার জলাশয়গুলোতে পরিযায়ী পাখি আসছে। এখন পর্যন্ত দেশী-বিদেশী ২০৪ প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে ক্যাম্পাসে। এর মধ্যে দেশী প্রজাতি রয়েছে ১২৬টি ও বিদেশী ৭৮টি।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উঁচু উঁচু ইট-কাঠের স্থাপনা নির্মাণের কারণে পাখিদের অভয়ারণ্য হিসেবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বণিক বার্তায় প্রকাশ, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায় ২০১৮ সালে। প্রকল্পে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২১টি অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সাল পর্যন্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে এর মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত করা হয়। প্রকল্পটির আওতায় প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবনের সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য হল, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন ও খেলার কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এটি প্রণয়নের আগে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সমীক্ষায় পাওয়া ফলাফল ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে পাখিদের অবাধ চলাচল নিশ্চিতের জন্য ২০ মিটার বা ছয়তলার অতিরিক্ত উচ্চতার ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সড়ক থেকে ন্যূনতম ১০০ মিটার দূরত্বে নির্মাণ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষকদের জন্য নির্মাণাধীন টাওয়ার, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের টাওয়ার এবং গেস্ট হাউজ কাম রিসার্চার টাওয়ার নির্মাণের ক্ষেত্রে এ সুপারিশ মানা হয়নি। ভবনগুলোর উচ্চতা ১০-১১ তলা হলেও তা উল্লিখিত স্থানের মধ্যেই নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় হাজার গাছ কেটে ফেলার প্রয়োজন দেখা দেয়। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহের পর নির্মাণকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে একটি প্রতিবেদনও জমা দেয়া হয়। ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর অনুমোদন পায় প্রতিবেদনটি। অনুমোদনপত্রে বন অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিতে বলা হয়। কিন্তু বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ না নিয়েই প্রায় দেড় হাজার গাছ কাটা হয়। আবার এখন পর্যন্ত বন অধিদপ্তরের সঙ্গেও এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এভাবে অবাধে গাছ কাটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত হয়ে আসছে পাখির আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রায় সারা বছরই পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ২০৫ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এছাড়া প্রতি বছর শীতে আগমন ঘটে তিন থেকে সাত হাজার পরিযায়ী পাখির। কিন্তু গত কয়েক বছরের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ সংখ্যা এখন ক্রমাগত কমছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত হাজার পাখি এসেছিল। এরপর ২০২১ সালের শীত মৌসুমে পাখির সংখ্যা কমে হয় সাড়ে চার হাজার। সর্বশেষ ২০২২ সালে মাত্র আড়াই-তিন হাজার পরিযায়ী পাখি এসেছিল। এজন্য পরিবেশ দূষণ, উন্নয়ন প্রকল্পে পাখিদের অবাধ চলাচলের বিষয় বিবেচনা না করা ও অবাধে গাছ কাটাকে পাখির সংখ্যা হ্রাসের জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপদ বিচরণস্থলের অভাবে ধীরে ধীরে আমাদের চিরচেনা এ পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত পাখি। জাবিসহ দেশের অল্প কিছু জায়গায় অতিথি পাখির আগমন ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানতীর্থে পাখিদের প্রতি ঔদাসীন্য কাম্য নয়। পরিযায়ীসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশী পাখির অবাধ বিচরণের কারণে একসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘোষণা করা হয়েছিল পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে। প্রতিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এ ধরনের এলাকায় গাছ কাটা ও নতুন স্থাপনা নির্মাণে সমীক্ষা চালানোসহ বেশকিছু নিয়মকানুন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১টি অবকাঠামো নির্মাণে চালু হওয়া প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশকিছু উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় সুপারিশের বড় একটি অংশ পরিপালন করা হয়নি।
বাস্তুসংস্থানের প্রতি অবহেলায় সবুজ ক্যাম্পাসও এখন ধীরে ধীরে ইট-পাথরের ক্যাম্পাসে পরিণত হচ্ছে বলে জানান বিশ্লেষকরা। গত কয়েক বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাখিদের সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ এ অপরিকল্পিত উন্নয়ন। পাখিরা এখন ওপর থেকে সবুজের পরিবর্তে ভবন দেখতে পাচ্ছে। ফলে তারা এ এলাকাকে এড়িয়ে চলছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নমূলক অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের পরামর্শ নেয়া জরুরি হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রতি তোয়াক্কা না করে কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ হলে পাখিদের কাছে আকর্ষণ হারাবে সবুজ ক্যাম্পাসটি। দেশের শীর্ষস্থানীয় এ বিদ্যাপীঠে প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি অবজ্ঞা দুঃখজনক।










