একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থ লেনদেনের ধরন ও মাধ্যম সম্পর্কে অবগত থাকা জরুরি। নগদ লেনদেন স্বল্প মাত্রায় হলে অর্থের অপব্যয় বা অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকি কম থাকে। ডিজিটাল বা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন হলে গ্রাহকদের বিস্তারিত নথি পাওয়া যায়, যা অবৈধ লেনদেন প্রতিহত করতে সহায়ক হয় এবং বেআইনি পথে অর্থ উপার্জনের প্রবণতাও কমে আসে। বিপরীতে নগদ অর্থের লেনদেনে কেবল অর্থ পাচার হয় না। অপরাধলব্ধ অর্থের প্রবাহ বেড়ে যায়। সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যাংকে নগদ লেনদেনের ধরন আরো মারাত্মক আকার ধারণ করে। বেশির ভাগ অর্থের উৎস সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড, যেমন মাদক ও মানব পাচার, পণ্য ও অস্ত্র চোরাচালান ইত্যাদি। এতে যেমন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যাহত হয়, একই সঙ্গে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় হয়। সম্প্রতি বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যাংকে নগদ লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ২০ শতাংশ। শক্ত হাতে এ লেনদেন প্রতিহত করা দরকার।
দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্যানুসারে, সীমান্তবর্তী ২১ জেলায় বেড়েছে বড় অংকের নগদ অর্থ লেনদেন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব জেলার ব্যাংকগুলোয় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭ কোটি টাকা নগদ লেনদেন হয়েছে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ওই জেলাগুলোয় নগদ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় নগদ লেনদেন বেড়েছে ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। যেখানে সারা দেশে সামগ্রিকভাবে নগদ লেনদেন বেড়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
জানা যায়, কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে দিনে ১০ লাখ টাকা বা এর বেশি নগদ জমা অথবা উত্তোলন করলে বিএফআইইউতে এ ধরনের লেনদেনের তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ১০ লাখ টাকা নগদ জমা বা উত্তোলনকে বলা হয় ক্যাশ ট্রানজেকশন (সিটিআর) বা নগদ লেনদেন হিসেবে। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও অপরাধ শনাক্ত করতে সিটিআরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বিএফআইইউ।
বিএফআইইউর মতে, এসব জেলায় নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ার কারণ সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ। একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধের অন্তরায়। সীমান্ত এলাকাগুলো মাদক ও মানব পাচার, চোরাচালানের মতো অপরাধগুলোর উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তাই এসব এলাকায় বেআইনি কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া নগদ লেনদেনে হিসাবের স্বচ্ছতা কম থাকে। নগদ ব্যবসার টাকা সরিয়ে ফেলা যায়। আয়-ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এবং অধিকাংশ সময় নগদ লেনদেনের নথি থাকে না। এতে সংশ্লিষ্ট সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নগদ লেনদেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা পায় উচ্চবিত্তরা, কর ফাঁকি দেয়ার কাজে। এসব প্রতিরোধে ক্যাশবিহীন লেনদেনের মাত্রা বাড়ানো জরুরি। সীমান্ত এলাকাসহ সারা দেশে অপরাধলব্ধ অর্থের লেনদেন রুখতে যথাযথ ব্যাংক লেনদেনের তদারকি ও প্রয়োজনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
অবৈধ কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিশ্বের অনেক দেশ নগদ অর্থ লেনদেনের পরিমাণ কমিয়েছে। তারা ডিজিটাল লেনদেনকে বেশি উৎসাহিত করছে। বর্তমান বিশ্বে নগদ অর্থের সবচেয়ে কম লেনদেন হয় সুইডেনে। সুইডেনের প্রাপ্তবয়স্ক ৯৯ ভাগ মানুষ লেনদেনের জন্য প্রিপেইড কার্ড বা ডিজিটাল অন্য মাধ্যম ব্যবহার করে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রায় ৬০ ভাগ নিষ্পন্ন হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে। সুইডেনের পর নগদ অর্থ লেনদেনে শীর্ষ চারের তালিকায় আছে ফিনল্যান্ড, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য। আন্তর্জাতিকভাবে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম তদারককারী সংস্থাগুলোও এ নীতি গ্রহণ করতে সদস্যদেশগুলোকে উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশেও নগদ অর্থের লেনদেন কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। যদিও কোনো বাস্তবায়নের দেখা মিলছে না। অবশ্য এরই মধ্যে বাংলাদেশে ক্যাশবিহীন লেনদেন শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছর জানুয়ারির তুলনায় গত ডিসেম্বরে দেশের ভেতরে ও বাইরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে মোট ৩ হাজার ২৫৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা কিনা এ-যাবৎকালে সর্বোচ্চ। গত নভেম্বরে ৩ হাজার ২৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা খরচ করেন ক্রেডিট কার্ডধারীরা। সে হিসাবে গত বছরের শেষ মাসটিতে বাংলাদেশীরা ২২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি খরচ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নির্দিষ্ট একটি অংকের বেশি লেনদেন হলেই তা অনলাইন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে করতে হবে। ওই অংকের নিচে হলে নগদ আকারে করা যাবে। জানা যায়, নির্দিষ্ট অংকটি ঠিক করার ব্যাপারে একটি কমিটি কাজ করছে। ওই অংক নির্ধারিত হলে এর বেশি অর্থ অনলাইনের মাধ্যমে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট, এটিএম বুথ, মোবাইল ব্যাংকিংসহ অনুমোদিত বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে স্থানান্তর করা যাবে। তবে এক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে চলা আবশ্যক।
নগদ লেনদেন কমানো গেলে কর ফাঁকি, অর্থ পাচার বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যেমন প্রতিহত করা সম্ভব হবে, তেমনি বেড়ে যেতে পারে সাইবার ক্রাইম। তবুও তুলনামূলকভাবে ক্যাশবিহীন লেনদেনের ঝুঁকি কম বিধায় সেদিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। নগদ লেনদেন কমিয়ে আনা গেলে অপরাধলব্ধ অর্থের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।










