সমাজে বসবাসরত দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যক্রম থাকে। তারই আওতায় সুলভ মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রিসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। এতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের উপকার হলেও যারা সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতায় আসার উপযুক্ত নন, তাদেরও অনৈতিকভাবে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠে আসে। ফলে বঞ্চিত হয় প্রকৃত অসহায় মানুষ। আর ব্যাহত হয় সামাজিক সুরক্ষা খাতের মূল উদ্দেশ্য। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র, অনগ্রসর ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে নানা প্রকল্প। আর্থিক সহায়তা, অনুদান, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, কাজের বিনিময়ে টাকা, স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি, খাদ্য কর্মসূচিসহ ১১৫টি ভিন্ন   খাতে এসব সহায়তা দেয়া হয়। তবে প্রায় প্রতি খাতের জন্যই দেয়া হয় পৃথক কার্ড। তথ্য-উপাত্ত ও তালিকাও করা হয় আলাদাভাবে। সমন্বয় ছাড়া এসব কর্মযজ্ঞ করতে গিয়ে অপচয় হচ্ছে বাড়তি অর্থ। আবার অভিযোগ রয়েছে, অসদুপায়ে সরকারি সহায়তা নিচ্ছেন অযোগ্যরা। এমনকি কিছু ব্যক্তি অন্যায্যভাবে একাধিক খাত থেকেও সুবিধা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ ও চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারের যেকোনো সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেকার, বিধবা, প্রতিবন্ধী, জেলে, কুলি, দিনমজুরসহ সব পেশা ও সামাজিক-পারিবারিক অবস্থানের মানুষ; যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১১ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সরকারের খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) কার্যক্রমও এ খাতের অধীন, যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পাঁচ কেজি চাল ও পাঁচ কেজি আটা দেয়া হয় স্বল্পমূল্যে। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও তথ্যভাণ্ডারের অভাবে প্রকৃত দাবিদাররা এর সুবিধা পাচ্ছেন না। সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজের অভাবে যে কেউ স্বল্প মূল্যের এসব পণ্য কিনতে পারছেন। ফলে এ খাতে অপচয় এবং দুর্নীতি হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার সুযোগ থেকে যাচ্ছে। 

এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ড ব্যবহার করে সঠিক সুবিধাভোগীদের কাছে স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খুব সহজেই বিক্রি করা যাচ্ছে। মূলত জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় সরকারি এ সংস্থা নিম্ন আয়ের মানুষদের কার্ডের আওতায় নিয়ে এসেছে। ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় টিসিবির কাছে কোটি পরিবারের তথ্য রয়েছে। এসব কার্ড তৈরি ও বিতরণের আগে সুবিধাভোগীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), সেলফোন নম্বর, জন্মতারিখ, স্বামী-স্ত্রীর এনআইডি, বিশেষ ক্ষেত্রে (বিধবা, প্রতিবন্ধী) সংশ্লিষ্ট প্রত্যয়ন—সবকিছুই যাচাই-বাছাই করা হয় পরবর্তী সময়ে। ফলে একজন ব্যক্তির একাধিক কার্ড নেয়া বা ভুল তথ্য দেয়ার সুযোগ থাকে না। 

প্রতিবেশী দেশ ভারত নাগরিকদের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা, পেনশন স্কিম, পাসপোর্ট নিবন্ধন থেকে শুরু করে সামাজিক সুরক্ষাসহ সরকারি বিভিন্ন সুবিধা প্রাপ্তিতে এক আধার কার্ডের মাধ্যমে সেবা দেয়। আমাদের দেশে এসব সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও একটি কার্ডের অধীনে আনা যায় কিনা সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে টিসিবির স্মার্ট কার্ডকে বেছে নেয়া যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরাও এতে সায় দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান ১৮টিসহ সামাজিক সুরক্ষা খাতের সব ভাতা, সহায়তা অনুদান একটি ডাটাবেজের মাধ্যমে দেয়া উচিত। তাহলে কারো বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। এ খাতে শৃঙ্খলা আনা গেলে দেশের মোট ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের সবাইকে সরকার সহায়তা দিতে পারবে। এক্ষেত্রে খাদ্য অধিদপ্তর চাইলে টিসিবির ১ কোটি ডিজিটাল কার্ডের সুবিধাও নিতে পারে। বস্তুত সামাজিক সুরক্ষা খাতের একজন প্রকৃত সুবিধাভোগী একটি কার্ডের মাধ্যমেই সুবিধা পেতে পারেন। এতে কার্ডের ব্যাক সিস্টেমে পরিবারের অন্য সদস্যদের তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে। এছাড়া সুবিধাভোগীর কাছে একাধিক কার্ড থাকলে তার অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই টিসিবির সবচেয়ে বড় ডাটাবেজের আলোকে একটি কার্ডের প্রচলন হলে খাদ্য অধিদপ্তরের নতুন করে কার্ড তৈরির প্রয়োজনও পড়বে না। টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের সে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও রয়েছে। তাই সামাজিক সুরক্ষা খাতে অনিয়ম রোধে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, সরকারি সংস্থাগুলো এক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করবে।