দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ হাজার ১৬২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। তবে সম্প্রতি তীব্র তাপপ্রবাহে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৪৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড করা হয়। সর্বোচ্চ সক্ষমতার বিদ্যুৎ ব্যবহার ধরলেও প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্র বসে থাকছে। এ কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে সরকার। ফলে বসিয়ে রেখে নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আর বিদ্যুতের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে, যা মোটেই কাম্য নয়।
ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রতি বছর সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এ নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। তার পরও উৎপাদন বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে করা চুক্তি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বণ্টনের জন্য গ্রিড ব্যবস্থার উন্নয়ন না করা—এমন সব কারণ ছাড়াও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণে এ সমস্যার কোনো সমাধান আসছে না।
২০০৯-এর পর থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ৮২টি বেসরকারি এবং ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে, যা সরকারের আর্থিক অপচয়। সরকারের এ অপচয়ের ভার বহন করতে হচ্ছে জনগণকে যা অনুচিত।
প্রকল্প গ্রহণের আগে সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই বা নির্মিত প্লান্টগুলোয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার ছিল। তাহলে বর্তমানে কেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়ার প্রয়োজন হতো না।
২০১০ সালে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটি আইন করা হয়েছিল। এ আইন অনুসারে, বিদ্যুৎ খাতের ইউনিটপ্রতি দাম ও খরচের মডেল জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে ছিল। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি স্বল্পসময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনেও গুরুত্ব দেয়া হয়। মূলত বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্যই এ ধরনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে অনেক বেশি আগ্রহ লক্ষ করা গেলেও প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তোলা যায়নি। ফলে সর্বনিম্ন খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সে পথে সরকারের যাওয়া দরকার। প্রতিযোগিতা না থাকায় বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে একচেটিয়া পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে জনগণকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশন বা সরবরাহ লাইন উন্নয়নেও সরকারের পদক্ষেপ কাম্য। উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তাও কমে আসবে বলে আশা করা যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও কমবে।
সরকার শুরুর দিকে সরকারি উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নে মনোযোগ দেয়নি। এ সুযোগে বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সরকারের ওপর চাপ পড়ত না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি খাতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এভাবে বেসরকারি খাতকে উৎপাদনে আনা হয়েছে। এখন সেগুলোর পেছনে বাড়তি ক্যাপাসিটি তৈরি হয়েছে ও ব্যয় বেড়েছে।
তারা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ খাত একটি বড় গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে আছে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়ের দায় নিতে হচ্ছে ভোক্তাকে। এর উদাহরণ দেখা যায়, নির্বাহী আদেশে চলতি বছরের মার্চে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে চলতি বছরে আরো তিন দফা দাম বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর দুটো পদ্ধতি—উৎপাদন খরচ কমানো ও দাম বৃদ্ধি। সরকার বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এখন নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। এজন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিইআরসির শুনানির মাধ্যমে যদি দাম বৃদ্ধি করা হতো তাহলে সেখানে কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত। দেশের সাধারণ জনগণ উপকৃত হতো। কিন্তু সেই উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
ভুর্তকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে উদ্যোগ নিলেও উৎপাদন খরচ কমাতে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তা এখনো অজানা। মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচটা কীভাবে কমাবে সে ব্যাপারে সরকার পদক্ষেপ নিলে মানুষের মধ্যে আরো আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ত।
বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি, যা সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এ খাত প্রতিযোগিতামূলক হলে ক্যাপাসিটি চার্জের মতো খরচের পরিমাণ অনেক কমে আসত। বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকায় এর বিপরীতে ভোক্তার কাছ থেকে ভাড়া আদায় করাও বড় ধরনের অন্যায়। উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকার কারণে সরকারকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে উচ্চ উৎপাদন খরচ মেটাতে সরকারকে বারবার বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে।
ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ে। বিশ্বের নানা দেশে বিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা সর্বোচ্চ চাহিদার চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি রাখাই নিয়ম, যাকে রিজার্ভ মার্জিন বলা হয়, যা মূলত অব্যবহৃতই থাকে। ২০১৬ সালের মাস্টারপ্ল্যান বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে যখন সর্বোচ্চ চাহিদা ২১ হাজার ৯০৩ মেগাওয়াট হবে, তখন রিজার্ভ মার্জিন ২০ শতাংশ হিসেবে উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ হাজারের কিছু বেশি হবে। কিন্তু বিদ্যুতের ওই পরিমাণ চাহিদা না থাকায় বাস্তবে রিজার্ভ মার্জিন ৩৫ শতাংশের বেশি হয়েছে এবং সামনের দিনগুলোয় এ সংখ্যা আরো বাড়বে। ২০১৮ সালে একবার সংশোধন করা মাস্টারপ্ল্যানটি আরো বলছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ও শক্তিশালী করতে নির্দিষ্ট হারে রিজার্ভ মার্জিন থাকা জরুরি। তবে অপরিকল্পিত ও আগ্রাসী সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে রিজার্ভ মার্জিন বেড়ে গিয়ে দেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
আগের মাস্টারপ্ল্যানের ফলোআপ হিসেবে ২০২৩ সালে প্রণীত ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ২০৪০ সালের আগে রিজার্ভ ক্যাপাসিটি ২০ শতাংশের কাছাকাছিও নেমে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এতে বলা হয়েছে, ২০৩০-এর দশকে রিজার্ভ সক্ষমতা থাকবে ৩০ শতাংশের আশপাশে।
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি বিবেচনা না করেই সরকার সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা আনুপাতিক হারে বাড়লেও পরবর্তী সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা রেখা ও উৎপাদন সক্ষমতার রেখা বিপরীতমুখী। অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে সরকারকে প্রতিদিন বেশকিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। সরকারি কোষাগার থেকে তাদের জন্য গুনতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি আর সরকারের ভর্তুকি বাড়ানোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচ হচ্ছে পিডিবির। পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের ক্যাপাসিটি পেমেন্টের জন্যও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দিতে হচ্ছে। এ খরচ বৃদ্ধির পেছনে জনগণের কোনো দায় নেই। সেক্ষেত্রে সরকার কেন এ খাতের ভর্তুকি কমানোর নামে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত খরচের বোঝা জনগণের ওপর চাপাবে?
বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ার মূল কারণ ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, ভুল নীতি ও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সক্ষমতা। সরকার যখন বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের ব্যবসায় নিয়ে আসে, তখন তারা কোনো প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেনি। ফলে তারা কোথায় কত টাকা খরচ করেছে, কত লাভ করছে, কেউ জানে না। এ খাতে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থার বিকল্প নেই। ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, ভুল নীতি ও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সক্ষমতা—এজন্য জনগণ দায়ী নয়। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করা মোটেই কাম্য নয়।










