লেনদেন ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) তিনটি উপাদান হলো চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট), মূলধন হিসাব (ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট) ও আর্থিক হিসাব (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট)। দেশের ডলার প্রবাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় বিওপিতে। গত মঙ্গলবারের বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি হিসাবের পাশাপাশি আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে দেশের সামগ্রিক লেনদেন ঘাটতিও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক চলতি হিসাবে প্রায় দুই বছর পর আগস্টে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছিল। কিন্তু চলতি হিসাবের ভারসাম্য আবারো ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। আমদানি-রফতানির ব্যবধানের কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি হচ্ছে। বর্তমানে রফতানির তুলনায় আমদানি প্রায় দেড় গুণ। আমদানি বিল মেটাতে ডলারের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চলতি হিসাবের সূচক ইতিবাচক ধারায় ফেরানো অত্যন্ত জরুরি। এ কারণে আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। এ ব্যবধান কমানো সম্ভব হলেই রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হবে এবং অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো হবে। বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনে দরকার অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। সরকারকে অর্থনীতির গতিশীলতা ফেরাতে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতিতে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে সব খাতেই কমবেশি টানাপড়েন চলছে। জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিও আছে চাপে। বিগত সরকার ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমেছে। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। এখনো বিনিয়োগ পরিবেশ সহায়ক না হওয়ায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। কিন্তু আমদানি ব্যয় ও রফতানি ব্যয়ের বড় ব্যবধানে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। বিওপির ঘাটতি মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পূরণ করা হয়। দেশের অর্থনীতিকে পুরোপুরি গতিশীল করে রফতানি আয় স্বাভাবিক করা দরকার।
২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয় ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু সেটা প্রকৃত আমদানি কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশ থেকে বেশির ভাগ টাকা পাচার হয় ব্যবসায়িক চ্যানেলে। বিগত সরকারের আমলে রিজার্ভে চাপ কমাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়া হলেও আমদানি-রফতানি ব্যয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা যায়নি। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাব্য উৎস সন্ধানে আরো সক্রিয় হতে হবে। সাধারণভাবে অর্থনীতিতে আমদানি বাড়াকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। বলা হয়, আমদানি বাড়লে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে। এতদিন বিশেষজ্ঞরাও সেটা বলে এসেছেন। এ কথা সত্য, শিল্প খাতের বিকাশ ঘটাতে হলে আমদানি বাড়াতে হবে। আমদানি বাড়লে রফতানিও বাড়াতে হবে। এমনকি আমদানির বিকল্প শিল্পপণ্যের উৎপাদনও যে খুব বেশি বাড়ছে তা বলা যাবে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। ডলারের যে সংকট এর নেপথ্যেও বাণিজ্য ঘাটতির ভূমিকা রয়েছে। নেপাল, থাইল্যান্ডে ঘাটতি বেশি হলেও ওইসব দেশ রেমিট্যান্স ও পর্যটন খাত দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলে। কিন্তু বাংলাদেশ আগে রেমিট্যান্স দিয়ে ঘাটতি মেটাতে পেরেছে। ফলে ডলারের বড় সংকট হয়নি, কিন্তু এখন পারছে না। আর পর্যটন বা অন্য খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে খুবই কম। সব মিলিয়ে টাকা পাচার রোধ, বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো ও পর্যটন খাতকে সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানি-রফতানির ব্যবধান কমানো যাবে।
বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সীমিতসংখ্যক দেশ ও সামান্য কিছু পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর হয়ে রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০০ পণ্য বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি পণ্য থেকে আসে মোট রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি। তৈরি পোশাক শিল্প পুরোপুরি আমদানীকৃত কাঁচামালনির্ভর। ফলে এ খাত জাতীয় অর্থনীতিতে মাত্র ৬০-৬৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন করে। অথচ তৈরি পোশাকের পাশাপাশি স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর পণ্য বেশি পরিমাণে রফতানি করা গেলে এ খাতের আয় যেমন বাড়ত, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে অধিক মূল্য সংযোজন হতে পারত।
বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানি বাজারগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, জাপান, চীন, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, সুইডেন, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত রফতানি। এক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলে দেশের সার্বিক কর্মসংস্থানসহ সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে রফতানি আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে করণীয় নির্ধারণসহ পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধান ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান রফতানি পণ্যের দিকেও নজর দিতে হবে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে প্রায় সময়ই। অনেক বাধা-বিপত্তির কারণে মাঝেমধ্যে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য হোঁচট খাচ্ছে। তেমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে যেসব দেশের সঙ্গে রফতানি বাণিজ্য চালু রয়েছে তার বাইরে আরো নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরালো করতে হবে। রফতানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে দেশে উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
চীন ও ভারত বড় বাজার হলেও উভয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েই চলছে এবং সহসাই এটি কমার সম্ভাবনাও নেই। উভয় দেশই নিজ বাজারে বাংলাদেশী পণ্য আমদানিতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। কিন্তু সে সুবিধা ব্যবহার করে দেশ দুটিতে রফতানি কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়াতে পারছে না বাংলাদেশ। এর অন্যতম কারণ চীন ও ভারতে যে ধরনের পণ্য আমদানির চাহিদা রয়েছে, তার অধিকাংশই বাংলাদেশে উৎপাদন হয় না। আবার কিছু পণ্য উৎপাদন হলেও সেগুলোর দাম ও মান বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারেনি। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা বর্তমান সময়ে বড় কোনো ইস্যু নয়। কারণ বাংলাদেশ যেমন চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে, ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে উদ্বৃত্তে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভারত ও চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে কিনা। অবশ্যই আছে। সেক্ষেত্রে দেশ দুটির মানুষের চাহিদা সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণাপূর্বক পণ্য উৎপাদন ও তা সরবরাহ করতে হবে। তাছাড়া ভারত ও চীন শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বেশকিছু অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে, যা দূরীকরণে কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের রফতানি আয় বাড়াতে গুটিকয়েক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। রফতানির বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। রফতানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সে সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।










