জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আধার সুন্দরবন। এখানে জলজ, প্রাণিজ ও বনজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম লবণাক্ত বনাঞ্চল (ম্যানগ্রোভ বন) হওয়ার পাশাপাশি এ বনের রয়েছে বিশাল জলাকীর্ণ অঞ্চল, যার পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ সমগ্র বনের ৩১.১৫ শতাংশ জলাভূমি। প্রায় ৪৫০টি নদী-খাল জালের মতো ছড়িয়ে আছে এ বনে। বলা যায়, বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা সুন্দরবনকে বৈচিত্র্যময় করেছে উজানের জলপ্রবাহ, লবণাক্ত সামুদ্রিক স্রোতধারা ও কাদা চর। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি সেসব প্রাকৃতিক সম্পদ অবদান রাখে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে। ‘সুন্দরবন সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ বনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কমপক্ষে ৩৫ লাখ মানুষ নির্ভরশীল। এছাড়া সরকার প্রতি বছর এ বন থেকে মোট বনজ রাজস্বের ৪১ শতাংশ আহরণ করে এবং উপকূলীয় এলাকার মানুষের জ্বালানি কাঠ সরবরাহ করে। কিন্তু সম্প্রতি সুন্দরবন বিধৌত নদীগুলোর নাব্য সংকট, নদী ভরাট ও দখলদারত্ব, বিরূপ জলবায়ু এবং অসচেতনতার ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক সম্পদ সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, ভোলা, খড়মা ও আড়ুয়ারবেড় নদীর নাব্য সংকট সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি সংকট তৈরি করেছে অববাহিকার কৃষি উৎপাদনেও। এ থেকে আশঙ্কা করা যায় যে উদ্ভূত সংকটগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশ ও দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই শিগগিরই সুন্দরবন রক্ষার্থে উদ্যোগী হতে হবে।

সুন্দরবনের জলরাশিতে রয়েছে বিপুল মৎস্যসম্পদ। এখানে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া এবং প্রায় ৪২ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়। এছাড়া ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড রয়েছে। বাঘ, হরিণ, শূকরসহ ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল সুন্দরবন। একই সঙ্গে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, আট প্রজাতির উভচর প্রাণীও আছে। আর পাখি রয়েছে প্রায় ৩২০ প্রজাতির। বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের উপকার করে থাকে। দেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া উপকূলীয় বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা অর্জনের অন্যতম উৎস সুন্দরবন। সেই সঙ্গে সরকার প্রতি বছর সুন্দরবন থেকে রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। কেননা সুন্দরবন বিশাল সম্পদের আধার। এখান থেকে কাঠ ও বিভিন্ন ধরনের নন-ফরেস্ট সম্পদ যেমন: মধু, মেলে ঘাস, গোলপাতা, হেতাল, গোরান, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। আর উপকূলীয় এলাকার মাছ দেশের মাছের চাহিদা পূরণে বিশেষ অবদান রাখে।

তবে বনজ সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ আধার সুন্দরবন এখন হুমকির সম্মুখীন। এর পেছনে দায়ী বৈরী আবহাওয়া এবং মানুষের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড। সুন্দরবন গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় বদ্বীপ অঞ্চলে। ফলে বদ্বীপ অঞ্চলের গঠন প্রক্রিয়া প্রভাব বিস্তার করে সুন্দরবনের ওপর। দিনে দুইবার জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয় এ বনের নদী-খাল। জানা যায়, জোয়ারের চেয়ে চলমান সময়ে ভাটার স্থায়িত্ব দীর্ঘ সময় থাকে। পাশাপাশি জোয়ার-ভাটায় নদীর পাড়ও ভেঙে যায়। ফলে একদিকে যেমন বনের জলাশয়ে লবণাক্ততা বাড়ছে, তেমনি বনভূমির পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের ২০১৭ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে নদীভাঙনের কারণে বনের জমি কমার কারণটি। এছাড়া পলি জমে জায়গা ভরাট হওয়ায় জলাবদ্ধতা তৈরির পাশাপাশি মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। আবার সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, সুনামি এবং গাছের আগা মরা রোগ, দাবানল ইত্যাদি কারণেও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বর্তমানে হুমকীর সম্মুখীন।

প্রতিকূল জলবায়ু ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের কর্মকাণ্ডও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে চলেছে। বিশ্বব্যাপী বন উজাড় করা মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছে। সুন্দরবনও উজারকৃত বনের বাইরে নয়। এর অন্যতম কারণ হলো বনের চারপাশে মানুষের বসতি। একসময় বসতি আর বনের মাঝে মানুষ ও বনের সুরক্ষাকবচ হয়ে থাকত প্রবহমান নদী। সেসব নদীর বুকে নৌকা ভাসিয়ে মানুষ মাছ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু এখন মৃত নদী বনকে এনেছে মানুষের নাগালে। নগরায়ণ, বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, বন-সম্পদের (কাঠ, কাঁকড়া, ঝিনুক ইত্যাদি) অতি আহরণে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে সুন্দরবনকে। এছাড়া নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার ত্রুটি এ সংকট আরো গভীর করেছে। সুন্দরবনের পাশে বয়ে চলা নদীতে জাহাজ ডুবে তেল, ফার্নেস ওয়েল, ফ্লাই অ্যাশ, কয়লা, সারসহ রাসায়িক দ্রব্যে নদীর পানি দূষিত করে এবং বনের জলজ প্রাণীদের জীবন বিপন্ন করে। এছাড়া পলি জমে নদীর অববাহিকা ভরাট হলে সেখানে মানুষ দখলদারত্বের মাধ্যমে বসতিসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করছে। যার ফলে বনের পশুরা যেমন বসতিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে, তেমনি পোষ্য প্রাণীরা বনে গিয়ে আঘাতের শিকার হচ্ছে। আবার নদীর নাব্য সংকটে পানির লবণাক্ততা বাড়ছে, যা ‍কৃষিজমিতে সেচ প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে। কৃষকরা এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন। অবশ্য বিরূপ আবহাওয়ার পাশাপাশি নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে ভারতের ফারাক্কা বাঁধসহ নদীর আন্তঃসংযোগমূলক প্রকল্পগুলোর দায়কে অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশের ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত। সুতরাং আমরা যখনই নদীর নাব্য সংকট কাটিয়ে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রসঙ্গ আনব, আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে যেন পানি নীতিতে ভারতের আচরণ উদার হয়। ১৯৭১ সালের ওয়েট ল্যান্ড কনভেনশন অনুসারে যৌথ জলাভূমি ও এর প্রাণবৈচিত্র্য এবং ১৯৭২ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ কনভেনশন চুক্তি অনুসারে সুন্দরবনের ক্ষতি না করার দায় ভারত এড়াতে পারে না। যদি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় এটি সম্ভব না হয় তাহলে জাতিসংঘের নদী কনভেনশনের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পানিসংক্রান্ত সমস্যার নিষ্পত্তি করা যাবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সেই সঙ্গে দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সুন্দরবনের প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে স্পষ্ট করতে হবে।

সুন্দরবন থেকে দূরে-অদূরে অবস্থিত কারখানার বর্জ্য পশুর নদ হয়ে সুন্দরবনে পৌঁছায়। এছাড়া জাহাজ, নৌযান নিয়মিত যাতায়াত করে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে। এসব জলযান থেকে সৃষ্ট শব্দ ও নিঃসৃত আলো পশুপাখির বসবাসের সুষ্ঠু পরিবেশের ব্যাঘাত ঘটায়। এ বিষয়ে যানচালকদের সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া সুন্দরবনের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে।

সুন্দরবনের নদী অববাহিকায় যেসব জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হতে পারে সুন্দরবন রক্ষায় একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। সেসব জনগোষ্ঠীকে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে সুন্দরবনের বনজ ও মৎস্যসম্পদ আহরণের ওপর চাপ কমবে। এছাড়া নদীতে জাহাজডু্বি হলে যেন উপকূলের মানুষ এগিয়ে আসে সে বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে বন বিভাগ। যেকোনো বিপদ মোকাবেলায় ত্বরিত পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের প্রস্তুতি রাখতে হবে এ বিভাগের। নয়তো ২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে তেলের ট্যাঙ্কার ডুবে তেল নিঃসরণের বড় দুর্ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে অবশিষ্ট সুন্দরবনকে আর বাঁচানো যাবে না। আর সবচেয়ে জরুরি নদীগুলো নাব্য রাখা। সুন্দরবনকে সজীব রাখতে এর বিকল্প নেই।

জানা যায়, ভোলা, খড়মা, আড়ুয়ারবেড় নদীর নাব্য ফেরাতে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড খননকাজ পরিচালনা করবে। এরই মধ্যে সুন্দরবন রক্ষায় তিনটি প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। ওই তিনটি প্রকল্প হলো সুন্দরবনে পরিবেশবান্ধব সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, সুন্দরবন সুরক্ষা এবং সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প। এসব প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়।