রাসায়নিক দ্রব্যের উপকারী ভূমিকার পাশাপাশি বিধ্বংসী ভূমিকাও রয়েছে। বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি রাসায়নিক বিস্ফোরণের ঘটনা এখনো আমাদের স্মৃতিতে দগদগে ক্ষত রেখে গেছে। দেশে রাসায়নিক দ্রব্যের বাজার ধীরে ধীরে ব্যাপৃত হলেও এর ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তার বিষয়টি বেশির ভাগ সময়ই অবজ্ঞা করা হয়। রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য আলাদা জোন নির্ধারণ না করে আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্য রাখায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বহু প্রাণহানি হয়। এরপর প্রশাসনের টনক নড়ে, যে কারণে রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য আলাদা অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু এ প্রকল্পে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পুরান ঢাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রাসায়নিক গুদামগুলো নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ লক্ষ্যে রাজধানীর শ্যামপুরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) উদ্যোগে ‘অস্থায়ী ভিত্তিতে রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণে নির্মিত গুদাম’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ৬ দশমিক ১৭ একর জমির ওপর নির্মিত ৫৪টি অস্থায়ী রাসায়নিক গুদাম উদ্বোধন করা হয় গত ৪ জুন। সেখানে দুটি অফিস ভবন, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, মসজিদ, গভীর নলকূপ, পানির ট্যাংকিসহ আরো কিছু স্থাপনা রয়েছে। প্রতি তিনটি গুদামঘরের মাঝে রাখা হয়েছে একটি করে ফায়ার হাইড্রেন্ট। এছাড়া ৬০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে পুরো এলাকার ওপর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকল্পটি উদ্বোধনের পর এক মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী সেখানে গুদাম স্থানান্তর করেননি বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুদামের সংখ্যা কম এবং ভাড়া বেশি হওয়ার কারণে তারা রাসায়নিক গুদাম ব্যবহারে আগ্রহ পাচ্ছেন না।
সমাধানের বদলে এ রকম দৃশ্যপট তৈরি হওয়া দুঃখজনক। কারণ পুরান ঢাকায় রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম উচ্ছেদ অভিযানে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাধা দেয়া হয়। তখন ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল বিকল্প ব্যবস্থা না করে প্রশাসন এভাবে উচ্ছেদ করতে পারে না। তাহলে বর্তমানে যখন সরকারের পক্ষ থেকে গুদাম তৈরি করে দেয়া হলো, তখন কেন রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম স্থানান্তর করা গেল না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা অপর্যাপ্ত গুদাম ও বেশি ভাড়ার যে অভিযোগ করেছেন সেটি আমলে নেয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে গুদামের সংখ্যা কম থাকার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত, এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের একাংশকে বরাদ্দ দেয়া যেত। কিন্তু বেশি ভাড়ার বিষয়টি কি পর্যালোচনা করা যায় না? যেহেতু এ প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ হয় ৭১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড ৬২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় এটি বাস্তবায়ন করে। তাহলে যে টাকা সাশ্রয় হয়েছে, সে টাকা কি ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ করা যেত না?
একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, রাসায়নিক দ্রব্যের যে দাহ্যক্ষমতা সেটি বহুবার প্রমাণ হয়েছে। পুরান ঢাকা বোমার ওপর বাস করছে—ঢাকার নিমতলী, চুড়িহাট্টা, আরমানিটোলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এমন বাস্তবতাই তুলে ধরে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোয় আগুনের ঘটনাও রাসায়নিক দ্রব্যের ঝুঁকির বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছিল। তখন অনুমোদনহীন রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা স্থাপনকারীদের আইনের আওতায় এনে মানুষের জীবন রক্ষার্থে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন। যে কারণে তখন রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের বিষয়টি উঠে আসে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, তা কেন ফলপ্রসূ হচ্ছে না সেটি এখন বিবেচনার বিষয়।
এক্ষেত্রে প্রশাসনকেই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ পুরান ঢাকায় উচ্ছেদ অভিযানে গেলে বাড়ির মালিকরাও বাধা দিয়েছেন। অথচ সেখানে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো যেসব বাড়িতে রয়েছে, তার অধিকাংশই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও আদর্শগত মান অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে আবারো অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা সমাধান হিসেবে কেমিক্যাল শিল্প পার্কের কথা বললেও বর্তমান বাস্তবতায় সেটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় অস্থায়ীভাবে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটি এখন বাস্তবায়ন করা জরুরি।
এজন্য রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তাদের সুবিধা-অসুবিধার দিকটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গুদাম স্থানান্তরের জন্য যেহেতু বড় জায়গা প্রয়োজন, সেটিও পরিকল্পনায় রাখতে হবে। তার আগে শ্যামপুরে যে গুদাম করা হয়েছে সেখানে রাসায়নিক দ্রব্য রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য ব্যবসায়ীদের স্বার্থও দেখা দরকার।
আমরা আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে আর কোনো ট্র্যাজেডি দেখতে চাই না। এজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রশাসনের ফলপ্রসূ আলোচনার বিকল্প নেই। আমাদের জীবনধারণের জন্য অর্থের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে ব্যবসা পরিচালনা করা দীর্ঘমেয়াদে ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে না। এজন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্যামপুরে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম স্থানান্তরে পদক্ষেপ নেয়া হোক। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ভিত্তিতে গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি পুরান ঢাকার বাইরে টঙ্গী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম এসব শিল্প এলাকায় যে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম আছে, সেগুলোও স্থানান্তরের পদক্ষেপ নিতে হবে।










