হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর যে জীবাণু রয়ে যায়, তা সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপসারণ করা জরুরি। এছাড়া রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতিও উপযুক্ত পদ্ধতিতে ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। এ ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে পার্শ্ববর্তী দীর্ঘ সময়ের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল, রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে এ সময়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিকিরণ (রেডিয়েশন) ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। এতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের পার্শ্ববর্তী এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বসবাসকারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। ক্যান্সার, হৃদরোগ, প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি, সংক্রামক রোগের বিস্তারসহ বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের বাইরেই থেকে যাচ্ছে বলে জনস্বাস্থ্যবিদরা জানিয়েছেন।

বস্তুত চিকিৎসা ও হাসপাতাল শব্দ দুটি একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হাসপাতালে রোগীরা সুচিকিৎসার আশায় যান। যথাযথ চিকিৎসার ফলে রোগ থেকে মুক্ত হন। আবার রোগমুক্তির পর পুনরায় রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও কিন্তু তৈরি হয় হাসপাতাল থেকে। এক্ষেত্রে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকেই দায়ী করা হয়। আবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পাশাপাশি হাসপাতালের কাছে যারা বাস করে, তারাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। এক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত বিকিরণেরও ভূমিকা রয়েছে। দেশের হাসপাতালগুলোয় বিকিরণের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। এর অত্যধিক ব্যবহারে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আজীবনের ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সম্প্রতি এক গবেষণায় তথ্য উঠে এসেছে। এজন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের বিকিরণ সুরক্ষা এবং এ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে।

চিকিৎসা বর্জ্য বলতে বোঝায় যেকোনো কঠিন বা তরল বর্জ্য পদার্থ যা মানুষ অথবা পশুর রোগ নির্ণয়, সেবা প্রদান কিংবা টিকা প্রদানের সময়ে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে উৎপন্ন হয়। এছাড়া গবেষণা কেন্দ্র থেকেও এসব বর্জ্য উৎপন্ন হতে পারে। জানা যায়, হাসপাতালে উৎপাদিত বর্জ্যের ৮০ শতাংশ সাধারণ এবং ২০ শতাংশ ক্ষতিকারক। তবে ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবই ক্ষতিকারক বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে, যা থেকে বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা বর্জ্যের সঙ্গে যেসব রাসায়নিক পদার্থ ও হেভি মেটাল থাকে, তা থেকে অসংক্রামক রোগও ছড়ায়। এমনকি অবহেলার কারণে এক্ষেত্রে ক্যান্সারের মতো রোগ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। দেশের চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বর্জ্যকে ১১ শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী তা সংরক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। রোগীর বিছানার পাশের পর্দার স্ট্যান্ড ও অন্যান্য সরঞ্জাম কীভাবে পরিষ্কার করতে হবে তারও নীতিমালা রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বহু হাসপাতালে বর্জ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই; এমনকি বহু হাসপাতালে নেই বর্জ্য শোধনাগার। এসব বর্জ্য হাসপাতালের পাশে বসবাসরত নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে পর্যাপ্ত কর্মী নেই। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ৪০ শতাংশের বেশি বর্জ্যকর্মীর প্রশিক্ষণ নেই; ৬০ শতাংশের বেশি বর্জ্যকর্মী নিজের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বহু তথ্য জানেন না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অরাজক পরিস্থিতির অবসানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ) বিধিমালা, ২০০৮ সংশোধন করা দরকার। 

চিকিৎসা বর্জ্যের অনিরাপদ নিষ্কাশনের কারণে অনেক রোগ ছড়াতে পারে। এজন্য মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দিলে এ খাতে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা কঠিন হবে। পাশাপাশি বর্জ্যকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বর্জ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। চিকিৎসাসেবায় যেটুকু বরাদ্দ দেয়া হয়, সে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ‘কভিড-১৯ মহামারীকালে কার্যকর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে চিকিৎসা বর্জ্যের ৯৩ ভাগই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়েছে। করোনাকালীন এ গবেষণা জরিপে উঠে আসে অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক অপসারণ সম্পর্কে সচেতন নয় এবং বাসাবাড়ির বর্জ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী মেশানো উচিত নয় বলে তারা মত দেয়। অর্থাৎ চিকিৎসা বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় এবং এটিকে সেভাবেই ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

‘মেডিকেল বর্জ্য বিধি ২০০৮’-এ বলা আছে—চিকিৎসা বর্জ্যগুলো উৎসেই পৃথক্‌করণ, পরিবহনের জন্য চিকিৎসা বর্জ্য প্যাকেটের ওপর প্রতীক ব্যবহার, উপযুক্ত দহনযন্ত্র ব্যবহার, পচনশীল দ্রব্য মাটিতে পুঁতে ফেলাসহ বর্জ্য ফেলার জন্য বিশেষ কালারের রঙ দেয়া পাত্র ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া ওই নীতিমালায় হাসপাতাল বর্জ্য পৃথক্‌করণের জন্য পাত্রের বৈশিষ্ট্য, যন্ত্র চালানোর জন্য মান, নির্গমন ও নিঃসরণ মান সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। দুঃখের বিষয়, নীতিমালা অনুযায়ী দেশের কয়েকটি হাসপাতাল ব্যতীত কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয় না। উপযুক্ত তত্ত্বাবধান ও মনিটরিংয়ের অভাবে হাসপাতালগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে। এ রকম অসচেতনতার ফলে হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকার নাগরিকরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে, যা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। হাসপাতাল রোগ নির্মূলের কেন্দ্র হবে। চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নতুন করে রোগ ছড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলো ভূমিকা রাখবে না, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।