মোহাম্মদ এজাজ রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান। নদী, পরিবেশ এবং জলবায়ু ইস্যুতে কাজ করছেন। তিনি বাংলাদেশে কর্মরত ৫০টিরও বেশি নদীভিত্তিক সংরক্ষণসংশ্লিষ্ট সুশীল সমাজের জোট জিবিএম পিপলস নেটওয়ার্কের নির্বাহী সহসভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টা। এক দশক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর এখন তিনি প্রাকৃতিক সম্পদ, পানি, নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং অববাহিকার জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে গবেষণা করছেন। ওয়াসার পানি সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন
ঢাকায় পানি সরবরাহের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে পানির মূল্য বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। ভাটির দেশের মানুষকে বেশি দামে পানি কিনে খাওয়ার বিষয়টি আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
ঢাকাবাসীর কাছে পানি সরবরাহের জন্য ঢাকা ওয়াসার যে সেটআপ বর্তমানে আছে সেটি হলো, ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নগরবাসীকে সরবরাহ করা। প্রথম দিকে এটা অনেক সহজ ছিল। কোথাও পাম্প বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি টেনে নেটওয়ার্কে দিয়ে দেয়া সহজলভ্য হওয়ার পাশাপাশি খরচও কম ছিল। কিন্তু দিন দিন এর খরচ বাড়ছে। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি তুলে ফেলার কারণে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচে পানি তুলতে হচ্ছে এবং বাধ্য হয়েই ওয়াসাকে পানির মূল্য বাড়াতে হচ্ছে। প্রথমদিকে ঢাকায় যখন পানির পাম্প স্থাপন করে ওয়াসা, তখন ঢাকার চারপাশে চারটি বড় নদী ছিল। এসব নদীর পানি নদীপাড়ের মানুষজন খেত। আমার বাসা তুরাগপাড়ের কাছাকাছি। আমরা দেখেছি, আশির দশকের শেষ সময় পর্যন্ত মানুষ তুরাগের পানি পান করেছে। বালু-শীতলক্ষ্যা এমনকি বুড়িগঙ্গার পানিও নব্বই দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত মানুষ পান করেছে। বিভিন্ন কাজে ব্যবহারও করেছে। এ সময় পর্যন্ত ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর পানি ব্যবহারযোগ্য ও পানযোগ্য ছিল। এ সময়টাতেই ওয়াসা ভূপৃষ্ঠের পানি সরবরাহ না করে ভূগর্ভস্থ পানির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। পুরো দেশেই তখন একটা ট্রেন্ড লক্ষ করি, বিশেষ করে আশির দশকের পর থেকে মানুষ ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে ইরিগেশন করতে থাকে। ভূগর্ভস্থ পানি সহজলভ্য ছিল। সব পৌরসভাও নগরবাসীর পানি সরবরাহের জন্য ভূগর্ভস্থ পানিকেই বেছে নেয়। যদিও এটা একটা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে শুরু হয়েছিল, সেটাই এখন ৩০ বছর ধরে চলে আসছে।
তার মানে কি ওয়াসার পরিকল্পনা সঠিক ছিল না, নাকি ঢাকায় হঠাৎ করে মানুষ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সমীক্ষায় উঠে আসেনি?
ঢাকায় হঠাৎ করে মানুষ বেড়েছে কথাটি সঠিক নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই ঢাকায় ক্রমাগত মানুষ বাড়ছে। পাশাপাশি বেড়েছে নগরায়ণও। ২০-৩০ বছর আগে একটি প্রাক-সমীক্ষা করা হয়েছে, ঢাকায় কত সালে কত মানুষ হবে? এখন আমরা বলছি, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা পৃথিবীর জনবহুল শহরগুলোর মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে থাকবে। এ অনুমান তো আগেও ছিল। এখনো আছে। পরিকল্পনাবিদরা বা ওয়াসার কর্মকর্তারা বিষয়টি খুব ভালো করেই জানতেন এবং এখনো জানেন। আমার মনে হয়, এ বিষয়টি মাথায় না রেখে শুধু ভূগর্ভস্থ পানির দিকে মনোযোগ দেয়ার বিষয়টি ওয়াসার জন্য আনসাসটেইনেবল প্ল্যান ছিল। ঢাকার মানুষকে শুধু পানি খাওয়াতে গিয়েই যদি ভূগর্ভস্থ সব পানি তুলে ফেলি এবং ভূপৃষ্ঠকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিই, এটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি সারফেস ওয়াটার বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সেটা নিয়ে না ভেবে অনবরত গ্রাউন্ড ওয়াটার তুলে ফেলার প্ল্যান করেছি—এটা আরো বড় ভুল। আপনি চট্টগ্রামের দিকে যদি লক্ষ করেন, পুরো চট্টগ্রামের পানি কর্ণফুলী থেকে আসে। মাত্র একটি নদী থেকে চট্টগ্রামের পানি সোর্সিং করা হচ্ছে। তাহলে ঢাকার পাশের চার নদীর পানি নিয়ে কেন আগে চিন্তা করা হয়নি।
তাহলে কি ওয়াসা-সংশ্লিষ্টরা নগরবাসীর পানি সরবরাহের কাজটি ইচ্ছা করেই ভুল পদ্ধতিতে চালিয়ে গেছেন?
একটি ট্রেন্ড তখন ছিল, যেটি আমি আগেও বলেছি; সবুজ বিপ্লবের নামে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানিকে (গ্রাউন্ড ওয়াটারকে) বেশি ফোকাস করা হয়েছে। এ রকম একটা পক্ষপাতদুষ্টতা আমরা ঢাকার আরবান সার্ভিসে লক্ষ করি। এটাকে আমরা সরাসরি দোষারোপ না করে ওই সময়ের চলতি ট্রেন্ডের প্রতিফলন বলতে পারি। কোনো সন্দেহ নেই—এটা আনসাসটেইনেবল পদ্ধতি ছিল। বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নগরবাসীকে পানি খাওয়ানোর প্রয়োজন ছিল না। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই নদী আছে, জোয়ার-ভাটার প্রভাব আছে। বর্ষার মৌসুমে দেশের ৭০ শতাংশ জায়গায় বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে ডুবে যায়। আমাদের দেশে পানি সুলভ। এ বিষয় মাথায় না রেখে কিছু জায়গা শুকিয়ে ফেলে ভূগর্ভস্থ পানির দিকে চলে গেলাম, এখন আমরা বুঝতে পারছি এটা আমাদের জন্য আত্মঘাতী হয়েছে। দেশের অনেক জায়গায় কৃষিকাজও সম্ভব হচ্ছে না পানির অভাবে। ঢাকার মতো জায়গায় পানির জন্য আমাদের মেঘনায় যেতে হচ্ছে। কিছু দিন পর মেঘনা দূষণ হয়ে গেলে আমাদের ব্রহ্মপুত্র কিংবা যমুনায় যেতে হবে। আমাদের ভুল পরিকল্পনার কারণেই এ আত্মঘাতী পর্যায়ে চলে গেছি। আমরা আসলে ৫০-১০০ বছরের দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা করতে পারছি না। খুবই স্বল্প সময়ের কথা ভেবে আমরা পরিকল্পনা করছি কিংবা প্রাগম্যাটিক প্ল্যান করছি। এগুলো হয়তো পাঁচ বছরের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু ২০-৩০ বছরের জন্য ঠিক নয়। ঢাকা ওয়াসার ইউটিলিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে আমরা যতগুলো প্ল্যান দেখেছি, এগুলো ছিল তখনকার সময়ের এক ধরনের প্র্যাগম্যাটিক প্ল্যান। কিন্তু এ প্ল্যানগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানে রূপান্তর হয়ে গেছে।
আপনার কথার সূত্র ধরেই বলি, স্বাধীনতার পর পর তো ৫০-১০০ বছর মাথায় রেখে পরিকল্পনা করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। তখন পাঁচ-দশ বছরই আমাদের জন্য বড় সময় ছিল। আবার আমাদের সরকার ব্যবস্থাটাও এ রকম ছিল যে পাঁচ বছর পরপর নতুন সরকার এসে নতুন পরিকল্পনা করত। পুরনো কাজ আটকে যেত। ওয়াসাসহ নগর পরিকল্পনায় এ বিষয়গুলো কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন?
আসলে বিষয়টা এ রকম নয়। বিভিন্ন সরকারের সময় সরকারের কিছু ইশতেহারের কারণে হয়তো পাঁচ থেকে আট বছর মেয়াদের পরিকল্পনা আমরা করেছি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ইউটিলিটি সার্ভিস দেবে কিংবা মৌলিক যে সেবাগুলো দেবে, সেখানে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। সেখানে এক, দুই ও তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা কোনো কাজে দেয় না। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা মনে করি, ওয়াসার পরিকল্পনাগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করা হয়নি। চিন্তা করে দেখুন, এ মুহূর্তে যদি নতুন করে আবার কোনো পরিকল্পনা করা হয় এবং সেটা যদি পাঁচ-দশ বছর মেয়াদি হয়, তাহলে সেটা আমাদের জন্য টাকা নষ্ট হবে। কারণ সেটা বাস্তবায়ন করতেই তো দুই বছর লেগে যায়। তাহলে সেটা আপনি পাঁচ বছরের জন্য কেন করবেন?
সরকার এলাকাভিত্তিক পানির দাম নির্ধারণের পথে হাঁটছে। যুক্তি দিয়ে বলা হচ্ছে, ধনী-গরিব সমান দামে পানি পাওয়ার বিষয়টি অন্যায্য। বিষয়টি নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?
প্রথম কথা হচ্ছে, ধনীর জন্য এক রেট আর গরিবের জন্য অন্য রেট—এটি সাংঘর্ষিক কথা। ঢাকায় এরই মধ্যে গরিবরা ধনীদের চেয়ে পানির দাম বেশি দিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি ঢাকার বস্তিগুলোয় গিয়ে থাকেন তাহলে একদম রিটেইল লেভেলে দেখবেন যে এক গ্যালন পানির জন্য অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীরা বেশি খরচ করে, সেখানে গুলশান-বনানী-ধানমন্ডির বাসিন্দারা এক গ্যালন পানির যে কস্টিং ওয়াসাকে পরিশোধ করে, সেটা অনেক কম, যা প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। তাহলে বিদ্যমান রেটেই তো গরিব ধনীর চেয়ে বেশি মূল্য দিয়ে পানি কিনছে। তার বড় কারণ হচ্ছে আমি তাকে পানি সুবিধা দিতে পারছি না। এর কারণ হচ্ছে তার বিধিবহির্ভূত বাসস্থান। এ ধরনের বাসায় পানি সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে ওয়াসার পলিসিতেই অনেক বিধিনিষেধ রয়েছে। ধনী তার বাসায় পানি সুবিধা পাচ্ছে এবং একটা মিটারের ইউনিট হিসেবে পে (পরিশোধ) করে। অন্যদিকে গরিবরা গ্যালন হিসেবে, বালতি হিসেবে, কলস হিসেবে পে (পরিশোধ) করে। তার পেমেন্ট রেট তো এমনিতেই তিন-চার গুণ, কোথাও তা পাঁচ গুণ বেশি। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা যায়। ইনফরমাল সেটেলমেন্টে একটি বাল্ব বা ফ্যান হিসাব করে রিটেইল লেভেলে গরিবরা পেমেন্ট করছে। অথচ করপোরেট লেভেলে আমরা যে বিদ্যুতের রেট দেখি, সেটা তাদের চেয়ে অনেক কম। ঢাকায় গরিরবা মৌলিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে খরচ করে, তার চার ভাগের এক ভাগ করে ধনীরা। বৈষম্য তো এখানে উল্টোভাবে বিরাজ করছে।
ওয়াসা বলছে, কস্টিং (ব্যয়) বেড়ে যাওয়ায় পানির মূল্য বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
ওয়াসা এখানে খুবই ঠুনকো যুক্তি দেখাচ্ছে। কাছের বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-তুরাগ রেখে দূরের মেঘনা থেকে পানি আনলে ব্যয় তো বাড়বেই। আর ব্যয় বাড়লে দামও বেশি রাখতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওয়াসাকে মেঘনা থেকে পানি আনতে হলো কেন? ওয়াসা নিজেই ঢাকার পাশের চার নদীর পানি দূষিত করেছে। সুয়ারেজের নামে ওয়াসা যে পরিমাণ পানি দূষণ করছে, নদী ও খাল দূষণ করেছে, এটা যদি না করত তাহলে ঢাকার পাশ থেকেই ওয়াসা নগরবাসীকে পানি সরবরাহ করতে পারত। একদিকে ওয়াসা নগরবাসীর কাছ থেকে পানির জন্য উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করছে, আবার সুয়ারেজের জন্যও টাকা নিচ্ছে। কিন্তু সুয়ারেজ বা পয়ঃবর্জ্য ট্রিটমেন্ট না করে ওয়াসা সরাসরি নদীতে ফেলে নদী-খাল দূষণ করছে। তার মানে নগরবাসী সুয়ারেজের টাকা দিয়েও সেবা পায় না, আবার পানি দূষণের জন্যও উচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে। দুভাবেই নগরবাসী প্রতারিত হচ্ছে।










